ভ্যাট দেয়া প্রসঙ্গে।
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমি একটা শোরুমে ম্যানেজার হিসেবে জয়েন করতে চাচ্ছি। এখন প্রতিমাসে সরকারকে শোরুমের সেলসের উপর ভিত্তি করে ভ্যাট দিতে হয়। এখন কোম্পানির নিয়ম হচ্ছে ফেইক সেল দেখিয়ে ভ্যাট দেয়া যাতে অনেক কম ভ্যাট দেয়া যায়। আবার ভ্যাট অফিসারদের কিছু ঘুষও দিতে হয়। এখন একজন ম্যানেজার হিসেবে উক্ত কাজগুলো করলে কি তার ইনকাম হারাম হয়ে যাবে?
Answer
উত্তর (সংক্ষিপ্ত):
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নে উল্লিখিত কাজগুলো—অর্থাৎ ফেইক (মিথ্যা) সেল দেখিয়ে সরকারি ভ্যাট কম দেওয়া এবং ভ্যাট অফিসারদের ঘুষ দেওয়া—উভয়ই শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম ও কবীরা গুনাহ। এ ধরনের কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ বা সহযোগিতা করা জায়েয নয়। তবে এ কাজে লিপ্ত থাকার কারণে ম্যানেজারের সম্পূর্ণ বেতন/ইনকাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে হারাম হয়ে যায় না; বরং হারাম হয় ঐ কাজের অংশ, যার মাধ্যমে সে মিথ্যা ও ঘুষে সহায়তা করে। কিন্তু যেহেতু চাকরির মূল দায়িত্বের মধ্যেই অবৈধ কাজ শর্ত হিসেবে রয়েছে, তাই এমন চাকরি গ্রহণ করা জায়েয নয়; এবং এতে লিপ্ত থাকলে তার উপার্জনে হারামের অংশ প্রবেশ করবে, যা পরিহার করা আবশ্যক। সরকারি খাজনা ভ্যাট এর ব্যয় খাত যদি নির্দিষ্ট থাকে, এবং খাজনাটি সহনীয় পর্যায়ের হয়, তাহলে তখন খাজনা দেওয়া জনগণের উপর অত্যাবশ্যক।
বিস্তারিত:
১. মিথ্যা সেল দেখানো (ভ্যাট ফাঁকি):
- সরকারকে প্রদেয় ভ্যাট হলো রাষ্ট্রের হক (অর্থাৎ জনগণের আমানত)। মিথ্যা তথ্য দিয়ে কম ভ্যাট দেওয়া প্রতারণা ও আমানতদারিতা লঙ্ঘন।
- কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে।” (সূরা নিসা: ৫৮)
- হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا “যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” (সহীহ মুসলিম: ১০১)
- ফেইক সেল দেখানো সরাসরি মিথ্যা ও প্রতারণা; আর মিথ্যা বলা ও প্রতারণা সুস্পষ্ট হারাম।
২. ঘুষ দেওয়া:
- ঘুষ (রিশওয়াত) ইসলামে স্পষ্টভাবে হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِّنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ “তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না এবং জেনে-বুঝে অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদের কিছু অংশ খাওয়ার জন্য তা বিচারকদের কাছে পেশ করো না।” (সূরা বাকারা: ১৮৮)
- রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতাকে অভিসম্পাত করেছেন:
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ الرَّاشِيَ وَالْمُرْتَشِيَ “রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতাকে লানত করেছেন।” (সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৮০; তিরমিজি: ১৩৩৭)
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফিকহী নীতি অনুযায়ী, ঘুষ সর্বাবস্থায় হারাম—চাই তা হক আদায়ের জন্যই হোক বা বাতিল কাজের জন্য। (রাদ্দুল মুহতার: ৫/৩৬২; ফাতাওয়া আলমগিরি: ৩/১৭০)
৩. ইনকাম হারাম হবে কি না?
- মূলনীতি হলো: যে কাজ হারাম, তার বিনিময়ও হারাম। কিন্তু যদি চাকরির মধ্যে হালাল ও হারাম কাজ মিশ্রিত থাকে, তবে পুরো বেতন হারাম হয় না; বরং হারাম কাজের অনুপাত পরিমাণ অংশ হারাম হয়।
- এখানে যেহেতু ম্যানেজারের দায়িত্বের মধ্যেই ফেইক সেল তৈরি করা ও ঘুষ দেওয়া শর্ত হিসেবে রয়েছে, তাই এমন চাকরি গ্রহণ করা জায়েয নয়। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
وَالْإِعَانَةُ عَلَى الْحَرَامِ حَرَامٌ “হারাম কাজে সহযোগিতা করাও হারাম।” (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৯১)
- ফাতাওয়া উসমানিতে এসেছে:
کسی حرام کام میں بطورِ معاون کے شریک ہونا جائز نہیں، اور اس پر جو اجرت ملے وہ بھی حلال نہیں۔ (ফাতাওয়া উসমানি: ৩/৪২১, মাকতাবা মাআরিফ)
- তবে যদি ম্যানেজার শুধু বৈধ ব্যবস্থাপনার কাজ করে এবং ফেইক সেল বা ঘুষে সরাসরি অংশ না নেয়, বরং কোম্পানির মালিক/উচ্চপদস্থরা তা করে, তাহলে তার নিজের বৈধ কাজের বেতন হালাল থাকবে; কিন্তু তাকে অবশ্যই অবৈধ কাজে সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং সম্ভব হলে নসিহত করতে হবে।
৪. করণীয়:
- সম্ভব হলে এমন কোম্পানি/চাকরি পরিহার করুন, যেখানে হারাম কাজ শর্ত হিসেবে রয়েছে।
- যদি চাকরি ছাড়া উপায় না থাকে, তবে অন্তত ফেইক সেল তৈরি ও ঘুষ প্রদানে সরাসরি অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকুন; এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ/নসিহত করুন।
- হারাম কাজে সহযোগিতার কারণে যে পরিমাণ সম্পদ অর্জিত হবে, তা সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব (তওবার সাথে)।
- আল্লাহর উপর ভরসা রেখে হালাল উপার্জনের চেষ্টা করুন; তিনি রিযিকের ব্যবস্থা করবেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا ۞ وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ “যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।” (সূরা তালাক: ২-৩)
والله أعلم بالصواب