মৃত ভাইয়ের সন্তানের উত্তরাধিকার, মায়ের হেবা, ফারায়েজ অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন এবং ভাতিজাকে বঞ্চিত করার বিধান সম্পর্কে জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
গ্রামে আমার বাবার 12 শতক সম্পত্তি আছে। সেখানে তো আমার মা, আমি আমার বড় বোন এবং আমার ভাই অংশীদার আছে। এখন এই 12 শতক সম্পত্তির মধ্যে থেকে আমাদের দুই বোনের অংশ এবং আমার মা অংশ যদি ছেড়ে দেওয়া হয়, আমার ভাতিজার নামে এক বছরের বাচ্চার জন্য, তাহলে কি সমতা ঠিক হবে?যেহেতু গ্রামের বাড়ির সম্পত্তির দাম কম সেজন্য।
Answer
উত্তর: ইসলামী আইন অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন ও মৃত ভাইয়ের সন্তানের অধিকার
সংক্ষিপ্ত উত্তর: আপনার মা তার নিজের সম্পত্তি (যা তার মালিকানায় আছে) জীবিত থাকাকালীন যে কাউকে হেবা (দান) করতে পারেন, তবে মৃত ভাইয়ের এক বছরের ছেলে তার বাবার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হিসেবে অধিকার রাখে। আপনার মা যদি তার নিজের সম্পত্তি আপনার ও বোনকে দান করেন, তাহলে ভাতিজা বঞ্চিত হবে না — কারণ সে তার বাবার সম্পত্তিতে (যা আপনার ভাই মারা যাওয়ার পর তার ছেলের কাছে যাবে) অধিকার রাখে। কিন্তু যদি আপনার মা মৃত ভাইয়ের রেখে যাওয়া সম্পত্তি নিজের ইচ্ছায় বণ্টন করেন, তাহলে সেটা শরীয়তসম্মত হবে না।
১. মূল বিষয়গুলো আলাদা করা জরুরি
আপনার প্রশ্নে তিন ধরনের সম্পত্তি জড়িত:
| সম্পত্তি | মালিক কে? | শরীয়তের বিধান | |---|---|---| | বাবার ১২ শতক গ্রামের জমি | বাবা মারা গেছেন, এখন উত্তরাধিকারীরা মালিক | ফারায়েজ অনুযায়ী বণ্টন হবে | | ভাইয়ের ৫ শতক বাড়ির অংশ | ভাই মারা গেছেন, তার ছেলে উত্তরাধিকারী | ছেলের হক্ব, মা বা ফুফু নিতে পারবে না | | মায়ের নামে ৩ শতক বাড়ি | মা জীবিত, মালিক | মা ইচ্ছা করলে হেবা করতে পারেন |
২. মৃত ভাইয়ের ছেলের অধিকার (ফারায়েজ)
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে নির্দেশ দিচ্ছেন — পুত্রের জন্য কন্যার দ্বিগুণ..." — সূরা আন-নিসা: ১১
আরও বলেন:
"তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করে এবং স্ত্রী রেখে যায়, তারা যেন নিজেদের জন্য এক বছরের খোরাক ও বাসস্থানের অসিয়ত করে যায়..." — সূরা আল-বাকারা: ২৪০ (এটি ইদ্দতকালীন বিধান)
মৃত ভাইয়ের সম্পত্তিতে তার ছেলে একমাত্র সন্তান হলে:
- ছেলে আসাবা (অবশিষ্টাংশ গ্রহণকারী) হিসেবে সম্পূর্ণ সম্পত্তির মালিক হবে।
- ভাইয়ের মা (আপনার মা) ১/৬ অংশ পাবেন (যদি মৃতের সন্তান থাকে)।
- ভাইয়ের স্ত্রী ১/৮ অংশ পাবেন (সন্তান থাকলে)।
- ভাইয়ের বোন (আপনি ও আপনার বড় বোন) বঞ্চিত হবেন, কারণ ছেলে থাকলে বোন আসাবা হিসেবে কিছু পায় না — তবে ছেলে থাকলে বোন সম্পূর্ণ বঞ্চিত।
দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমরা ফারায়েজ (উত্তরাধিকার) আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী বণ্টন করো।" — সহীহ বুখারী: ৬৭৩২, সহীহ মুসলিম: ১৬১৫
অতএব: আপনার মৃত ভাইয়ের ৫ শতক সম্পত্তি তার ছেলের হক্ব। আপনার মা বা আপনি এই সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। যদি আপনার মা এই সম্পত্তি আপনার নামে লিখে দেন, তাহলে সেটা হারাম ও জুলুম হবে।
৩. আপনার মায়ের নিজের সম্পত্তি (৩ শতক বাড়ি)
আপনার মা তার নিজের মালিকানাধীন সম্পত্তি জীবিত থাকাকালীন যে কাউকে হেবা করতে পারেন। তবে শর্ত হলো:
-
সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষা করা — রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমরা তোমাদের সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষা করো।" — সহীহ বুখারী: ২৫৮৬, সহীহ মুসলিম: ১৬২৩
-
মৃত্যুশয্যায় (মারাদুল মাউত) থাকলে — তখন হেবা নয়, অসিয়ত হিসেবে গণ্য হবে, যা এক-তৃতীয়াংশের বেশি নয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "এক-তৃতীয়াংশ, আর এক-তৃতীয়াংশও অনেক বেশি।" — সহীহ বুখারী: ২৭৪৮, সহীহ মুসলিম: ১৬২৮
আপনার মা যদি জীবিত ও সুস্থ থাকেন এবং তার ৩ শতক বাড়ি থেকে আপনাকে ও বোনকে দেড় শতক করে দেন — এটি জায়েয, কারণ এটি তার নিজের সম্পত্তি। তবে সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষা করা উত্তম। আপনার ভাই মৃত, তাই তার ছেলে তার পিতার প্রতিনিধি হিসেবে বাবার অংশ পাবে — কিন্তু দাদীর হেবায় সে সরাসরি অংশ পাবে না, যদি না দাদী তাকে দেন।
৪. বাবার ১২ শতক সম্পত্তি
আপনার বাবা মারা গেছেন। এখন তার সম্পত্তি ফারায়েজ অনুযায়ী বণ্টন হবে:
উত্তরাধিকারীরা:
- স্ত্রী (আপনার মা): ১/৮ (সন্তান থাকলে)
- ছেলে (আপনার ভাই): আসাবা — দ্বিগুণ
- মেয়ে (আপনি ও বড় বোন): ১/২ ছেলের অংশ
কিন্তু আপনার ভাই বাবার মৃত্যুর পর মারা গেছেন, তাই তার অংশ তার ছেলের কাছে যাবে।
হিসাব:
- মা: ১২ × ১/৮ = ১.৫ শতক
- বাকি ১০.৫ শতক সন্তানদের মধ্যে: ছেলে ২ ভাগ, দুই মেয়ে ১ ভাগ করে = মোট ৪ ভাগ
- ছেলের অংশ: ১০.৫ × ২/৪ = ৫.২৫ শতক → তার ছেলের কাছে যাবে
- আপনার অংশ: ১০.৫ × ১/৪ = ২.৬২৫ শতক
- বড় বোনের অংশ: ১০.৫ × ১/৪ = ২.৬২৫ শতক
অতএব: আপনার ভাতিজা (মৃত ভাইয়ের ছেলে) বাবার ১২ শতক সম্পত্তিতে তার বাবার অংশ (প্রায় ৫.২৫ শতক) পাবে। তাকে বঞ্চিত করা হারাম।
৫. আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর
প্রশ্ন ১: ভাতিজাকে বঞ্চিত করা হচ্ছে কি?
হ্যাঁ, যদি আপনার মা মৃত ভাইয়ের সম্পত্তি (৫ শতক) আপনার নামে লিখে দেন — তাহলে ভাতিজা বঞ্চিত হবে, যা হারাম। কারণ সেই সম্পত্তির মালিক এখন আপনার ভাইয়ের ছেলে, আপনার মা নন।
কিন্তু যদি আপনার মা তার নিজের ৩ শতক বাড়ি থেকে দেন — তাহলে ভাতিজা বঞ্চিত হবে না, কারণ সেটা মায়ের নিজের সম্পত্তি।
প্রশ্ন ২: ১২ শতক থেকে দুই বোন ও মায়ের অংশ ছেড়ে দিলে সমতা ঠিক হবে?
না, ঠিক হবে না। কারণ:
- ভাতিজার বাবার অংশ (প্রায় ৫.২৫ শতক) তার হক্ব।
- আপনি ও বোন নিজেদের অংশ (প্রত্যেকে ২.৬২৫ শতক) ছেড়ে দিতে পারেন — এটি আপনার ইচ্ছা।
- কিন্তু ভাতিজার অংশ তার অনুমতি ছাড়া ছেড়ে দেওয়া বা তাকে বঞ্চিত করা জুলুম।
যদি আপনি ও বোন নিজেদের অংশ ভাতিজাকে দান করতে চান — এটি জায়েয এবং সদকা হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু জোরপূর্বক বঞ্চিত করা জায়েয নয়।
৬. গুরুত্বপূর্ণ নসীহত
-
মৃতের সম্পত্তি — মৃতের সম্পত্তি প্রথমে ফারায়েজ অনুযায়ী বণ্টন করতে হবে, তারপর কেউ চাইলে নিজের অংশ দান করতে পারে।
-
মায়ের হেবা — মা জীবিত থাকলে তার নিজের সম্পত্তি হেবা করতে পারেন, তবে সন্তানদের মধ্যে সমতা রাখা উত্তম। ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: "পিতামাতার উচিত সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করা, যেমনটি রাসূল ﷺ নির্দেশ দিয়েছেন।" (মাজমুউল ফাতাওয়া: ৩১/৩০১)
-
মৃত্যুশয্যায় হেবা — যদি মা অসুস্থ হয়ে মৃত্যুশয্যায় থাকেন, তাহলে এক-তৃতীয়াংশের বেশি কোনো কিছু দেওয়া যাবে না।
-
ভাতিজার হক্ব — ভাতিজা ইয়াতিম, তার হক্ব রক্ষা করা ফরজ। আল্লাহ বলেন:
"আর ইয়াতিমদেরকে তাদের সম্পত্তি দিয়ে দাও, পবিত্র জিনিসের বদলে অপবিত্র জিনিস গ্রহণ করো না..." — সূরা আন-নিসা: ২
-
শায়খ ইবনে বায (রহ.) বলেন: "মৃতের সম্পত্তি বণ্টনে ফারায়েজের বিধান মানা ওয়াজিব। কেউ যদি তা পরিবর্তন করে, সে আল্লাহর বিধান পরিবর্তনকারী।" (ফাতাওয়া ইবনে বায: ২০/২৬)
৭. পরামর্শ
- একজন বিশ্বস্ত আলেম বা শরীয়ত আদালতের মাধ্যমে ফারায়েজ অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন করুন।
- মায়ের নিজের সম্পত্তি — তিনি চাইলে আপনাকে দিতে পারেন, তবে ভাতিজাকেও সদকা হিসেবে কিছু দিলে সাওয়াব পাবেন।
- ভাতিজার হক্ব — তার বাবার অংশ তাকে অবশ্যই দিতে হবে। এটি তার জন্মগত অধিকার।
- সমতা — যদি আপনি ও বোন নিজেদের অংশ ভাতিজাকে দান করতে চান, তবে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, কিন্তু জোরপূর্বক নয়।
উপসংহার: আপনার মা তার নিজের সম্পত্তি আপনাকে দিতে পারেন, কিন্তু মৃত ভাইয়ের সম্পত্তি (৫ শতক) তার ছেলের হক্ব — সেখানে হস্তক্ষেপ করা হারাম। ১২ শতক সম্পত্তিতে ভাতিজা তার বাবার অংশ অবশ্যই পাবে। আপনি ও বোন নিজেদের অংশ ছেড়ে দিলে সেটা আপনার ইচ্ছা, কিন্তু ভাতিজাকে বঞ্চিত করা ইসলামী আইনে নিষিদ্ধ।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিচ্ছেন যে, আমানতসমূহ তার মালিকদের কাছে প্রত্যর্পণ করবে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ইনসাফের সাথে বিচার করবে।" — সূরা আন-নিসা: ৫৮