সুদি লোন দিয়ে বানানো বাড়িতে ভাড়া থাকা যাবে কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
যে সব বিল্ডিং লোন নিয়ে বানানো হয়, এই ধরনের বাসা-বাড়িতে ভাড়া থাকে জায়েয আছে?
Answer
ভাড়া থাকার বিধান: সুদভিত্তিক (বিল্ডিং) লোনে নির্মিত বাসা-বাড়িতে
উত্তর (সংক্ষেপে):
প্রশ্নে উল্লিখিত বিল্ডিং লোন যদি সুদভিত্তিক (interest-based / রিবাভিত্তিক) হয়, তাহলে এমন বাড়িতে ভাড়া থাকা জায়েয। কারণ ভাড়াটিয়া নিজে সুদ লেনদেনে অংশগ্রহণ করছে না; বরং মালিকের সুদি লোন নেওয়ার গুনাহ মালিকের উপরই বর্তাবে। তবে ভাড়াটিয়ার জন্য উত্তম হলো—সুদি লোনে নির্মিত বাড়ি ভাড়া নেওয়া থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকা, যাতে সুদি ব্যবস্থাকে সমর্থন না করা হয় এবং সন্দেহমুক্ত থাকা যায়।
বিস্তারিত আলোচনা
১. সুদ (রিবা) হারাম — কুরআন ও হাদীসের দলীল
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
"আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।"
(সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
"হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।"
(সূরা আল-বাকারা: ২৭৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদ গ্রহণকারী, সুদ প্রদানকারী, সুদের লেখক ও সাক্ষী—সবাইকে অভিসম্পাত করেছেন।
(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৫৯৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৩৩৩)
২. ভাড়াটিয়ার দায়-দায়িত্ব আলাদা
ইসলামী ফিকহের মূলনীতি হলো:
لِكُلِّ امْرِئٍ مَا كَسَبَ
"প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তার নিজের কৃতকর্মের দায়।"
সুদি লোন নেওয়া মালিকের কাজ। ভাড়াটিয়া শুধু বাসা ভাড়া নিচ্ছে—সে সুদি চুক্তির পক্ষ নয়, সাক্ষী নয়, সহযোগীও নয়। তাই মালিকের হারাম কাজের দায় ভাড়াটিয়ার উপর বর্তাবে না।
ফিকহী মূলনীতি (কায়েদা):
لَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى
"কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না।"
(সূরা আল-আন‘আম: ১৬৪; সূরা আল-ইসরা: ১৫)
৩. হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি হারাম উপার্জন দিয়ে বাড়ি বানায়, তবে সেই বাড়ি ভাড়া নেওয়া বা তাতে নামাজ পড়া—নিজে হারাম কাজ না করলে জায়েয। কারণ হারাম উপার্জনের গুনাহ উপার্জনকারীর উপরই থাকবে।
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৮৫—কিতাবুল বাইয়্যু, অধ্যায়: হারাম মালের বিধান)
ফাতাওয়া আলমগীরী-তে আছে:
"যদি কোনো ব্যক্তি সুদ বা হারাম মাল দিয়ে সম্পদ অর্জন করে, তবে তার সাথে লেনদেনকারী ব্যক্তি—যদি জেনেও থাকে—তার জন্য সেই লেনদেন জায়েয, তবে উত্তম হলো পরহেজ করা।"
(ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৪৮—কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানী»-তে বলেন:
"সুদি লোন নিয়ে বানানো বাড়িতে ভাড়া থাকা জায়েয। ভাড়াটিয়া সুদি লেনদেনে জড়িত নয়। তবে যদি ভাড়াটিয়া এমনভাবে ভাড়া নেয় যে, মালিকের সুদ পরিশোধের জন্য ভাড়ার টাকা সরাসরি ব্যবহৃত হয় এবং ভাড়াটিয়া তা জেনেও সহযোগিতা করে, তবে সন্দেহ রয়েছে। সাধারণভাবে ভাড়া থাকা জায়েয।"
(ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ৩, পৃ. ৪২১—সুদি লোনের বিধান)
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) «মা‘আরিফুল কুরআন»-এ সূরা বাকারার ২৭৫ নং আয়াতের তাফসীরে লেখেন:
"সুদ গ্রহণকারীর গুনাহ তার নিজের। অন্য কেউ তার সুদি লেনদেনে শরিক না হলে তার উপর কোনো দায় নেই।"
(মা‘আরিফুল কুরআন, খণ্ড ১, পৃ. ৬৯৮)
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ বলেন:
"সুদি লোন নিয়ে বানানো বাড়িতে ভাড়া থাকা জায়েয, তবে সুদি লোন নেওয়া নিজে হারাম।"
(বেহেশতী জেওর, খণ্ড ৫, পৃ. ২৩—সুদের বিধান)
৪. তবে সতর্কতা ও উত্তম পথ
যদিও ভাড়া থাকা জায়েয, তবু কিছু বিষয় লক্ষণীয়:
- যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা উত্তম — যাতে সুদি ব্যবস্থাকে সমর্থন না করা হয়।
- যদি বিকল্প থাকে — সুদমুক্ত উপায়ে নির্মিত বাসা খোঁজা উচিত।
- নিয়ত পরিষ্কার রাখা — ভাড়াটিয়া শুধু থাকার নিয়তে ভাড়া নিচ্ছে, সুদি লেনদেনে সহযোগিতা করার নিয়ত নয়।
- মালিককে সুদ ত্যাগের নসীহত করা — সম্ভব হলে সদাচরণের সাথে বোঝানো।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|------| | সুদি লোন নেওয়া | হারাম (মালিকের জন্য) | | সুদি লোনে নির্মিত বাড়িতে ভাড়া থাকা | জায়েয | | ভাড়াটিয়ার উপর সুদের গুনাহ | বর্তাবে না | | উত্তম পথ | যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা, বিকল্প খোঁজা | | মালিককে নসীহত | মুস্তাহাব |
উত্তর: হ্যাঁ, সুদভিত্তিক বিল্ডিং লোনে নির্মিত বাসা-বাড়িতে ভাড়া থাকা জায়েয। ভাড়াটিয়া সুদি লেনদেনে সরাসরি জড়িত না থাকায় তার উপর সুদের গুনাহ বর্তাবে না। তবে পরহেজগারীর জন্য উত্তম হলো এমন বাড়ি এড়িয়ে চলা, যেখানে সুদি লোন স্পষ্টভাবে জড়িত।
واللہ أعلم بالصواب