আম্মার রেখে যাওয়া তারকাহ প্রসঙ্গে

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 5681
Questioner: MD AL IMRAN
Question Asked: 19 Sep 2026, 02:39 PM
Reviewed & Published: 19 Sep 2026, 04:02 PM
Views: 27
Tokens: 7,660
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আস্সালামুয়ালাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেব।

আমার আম্মা ইন্তেকালের দুই বছর পার হলো।

তার উত্তরাধিকারী আমরা যারা জীবিত আছিঃ
আব্বা ও আমরা তিন ভাই। আমাদের কোনো বোন নেই বা মৃত আম্মার আরো কোনো উত্তরাধিকার নেই আমরা চার জন বাদে।

তিনার ইন্তেকালের পরে আমরা কিছু সম্পদ ফারায়েজ অনুযায়ী সুন্দর ভাবে বন্টন করেছি আলহামদুলিল্লাহ।

এখন আমার আম্মার আরেটা সম্পদ (জমি ও বাড়ি একই সাথে) আছে। যেই বাসাটা আমরা ভাড়া দিয়েছি যেখান থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার টাকা আসে।

আমি আব্বাকে বলেছি যে আম্মা ইন্তেকালের পর থেকে আজ পর্যন্ত দুই বছরে যতো টাকা ভাড়া আয় হয়েছে সেটা আমাদের চার ওয়ারিসের মধ্যে ফারায়েজ অনুযায়ী বন্টন করতে।

এখানে মুলত আমার প্রশ্ন হলো যেহেতু এখনই এই জমি এবং বাড়ি বিক্রি করছি না তাহলে এই আয়কৃত প্রতি মাসের ভাড়া আমরা কিভাবে বন্টন করতে পারি?

দিতীয়ত, জমি আম্মার একার মালিকানায় ছিলো। কিন্তু সেই জসির উপর যখন বাসা নির্মাণ করে তখন আমার টাকার সাথে আব্বারো বেশ কিছু টাকা ইনভেস্ট করেছিলো সেই বাসার নির্মাণ কাজে। তাই আব্বা বলতেছেন যেহেতু আমার এখানে ইনভেস্ট আছে টাকা তাই আমি যদি ভাড়ার টাকা তোমাদের না দিয়ে আগে সেই পরিমাণ টাকা (যেটা তিনি বিল্ডিং তুলতে খরচ করেছেন) তুলে নেই তাহলে হবে কি না?

এমতাবস্থায় আমরা ইলমে ফারায়েজ অনুযায়ী কিভাবে ইনসাফ ভিত্তিক ভাবে এটার বন্টন করতে পারি?

দয়া করে সবিস্তারে জানালে খবই খুশি হবো ইনশাআল্লাহ।

Answer

উত্তর: আম্মার রেখে যাওয়া তরকাহ ও ভাড়া আয়ের বণ্টন প্রসঙ্গে

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সূক্ষ্ম। আমি ধাপে ধাপে ফারায়েজ ও ফিকহে হানাফীর আলোকে উত্তর দিচ্ছি।


প্রথমে: মৃত আম্মার ওয়ারিস কারা?

আপনার আম্মার ইন্তেকালের সময় জীবিত ছিলেন:

  • স্বামী (আপনার আব্বা)
  • তিন ছেলে (আপনারা তিন ভাই)

কোনো কন্যা, পিতা-মাতা বা অন্য কোনো ওয়ারিস নেই।

ফারায়েজ অনুযায়ী অংশ বণ্টন:

| ওয়ারিস | অংশ | অনুপাত | |---------|------|--------| | স্বামী (আব্বা) | ১/৪ | ২৫% | | তিন ছেলে (বাকি ৩/৪ সমান ভাগে) | ৩/৪ | ৭৫% (প্রত্যেকে ২৫%) |

দলিল: আল্লাহ তা'আলা বলেন—

"আর তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীদের রেখে যাওয়া সম্পদের অর্ধেক, যদি তাদের সন্তান না থাকে। কিন্তু যদি তাদের সন্তান থাকে, তবে তোমাদের জন্য তাদের রেখে যাওয়া সম্পদের এক-চতুর্থাংশ..." (সূরা নিসা: ১২)

"সন্তানদের ব্যাপারে আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন—পুত্রের জন্য কন্যার দ্বিগুণ..." (সূরা নিসা: ১১)

সুতরাং: আব্বা পাবেন ১/৪ অংশ, আর আপনারা তিন ভাই প্রত্যেকে পাবেন ১/৪ অংশ (অর্থাৎ সমান সমান)।


দ্বিতীয়ত: ভাড়ার আয়ের হুকুম

আপনার আম্মার মালিকানাধীন জমি ও বাড়ি থেকে যে ভাড়া আসছে, তা তরকাহর অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ:

  • আম্মা ইন্তেকালের পর থেকে যে ভাড়া আয় হয়েছে, তা মৃত আম্মার সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে।
  • এই ভাড়ার টাকা ফারায়েজ অনুযায়ী বণ্টন করতে হবে—অর্থাৎ আব্বা ১/৪, আপনারা তিন ভাই প্রত্যেকে ১/৪।
  • প্রতি মাসের ভাড়া আলাদা আলাদা হিসাব করে বণ্টন করা জায়েজ। অথবা বছরে একবার হিসাব করে বণ্টন করলেও হবে।

গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা:

যেহেতু জমি-বাড়ি এখনো বিক্রি হয়নি, তাই প্রতিটি ওয়ারিস সেই সম্পত্তিতে শুধু তার অংশের মালিক, পুরো সম্পত্তির মালিক নয়। সুতরাং:

  • ভাড়ার আয় প্রত্যেকের অংশ অনুযায়ী ভাগ হবে।
  • আব্বা পাবেন ২৫%, আপনারা প্রত্যেকে পাবেন ২৫% করে।

দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

"তোমরা ফারায়েজ (নির্ধারিত অংশ) অনুযায়ী সম্পদ বণ্টন করো।" (সহীহ বুখারী: ৬৭৩২, সহীহ মুসলিম: ১৬১৫)


তৃতীয়ত: আব্বার ইনভেস্টের দাবি—এটি কি বৈধ?

এখানে দুটি বিষয় আলাদা করতে হবে:

(ক) আব্বা যদি আম্মার অনুমতি নিয়ে বাড়ি নির্মাণে টাকা দিয়ে থাকেন:

তাহলে এটি আম্মার উপর ঋণ (দাইন) হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ আম্মা আব্বার কাছে ঋণী ছিলেন। এখন আম্মা মৃত, তাই তরকাহ থেকে প্রথমে এই ঋণ পরিশোধ করতে হবে, তারপর বাকি সম্পদ ওয়ারিসদের মধ্যে বণ্টন হবে।

দলিল: আল্লাহ তা'আলা বলেন—

"তোমাদের মধ্যে কেউ মৃত্যুমুখে পতিত হলে সে যদি সম্পদ রেখে যায়, তবে তার ওসিয়ত পূরণ করার পর এবং ঋণ পরিশোধের পর..." (সূরা নিসা: ১১-১২ এর ধারাবাহিকতায়)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

"মৃতের সম্পদ থেকে ঋণ পরিশোধ করা হবে, তারপর ওসিয়ত, তারপর میراث।" (সুনানে তিরমিজি: ২১২১)

সুতরাং: আব্বা যদি প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা আম্মার সম্পত্তিতে ইনভেস্ট করেছেন (আম্মার অনুমতিক্রমে), তবে প্রথমে সেই ঋণ পরিশোধ হবে, তারপর বাকি সম্পদ ফারায়েজ অনুযায়ী বণ্টন হবে।

(খ) আব্বা যদি আম্মার অনুমতি ছাড়া বা হেবা হিসেবে টাকা দিয়ে থাকেন:

তাহলে এটি হেবা (দান) হিসেবে গণ্য হবে এবং ফেরত পাওয়ার অধিকার নেই। সেক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সম্পদ ফারায়েজ অনুযায়ী বণ্টন হবে।

(গ) আব্বা যদি বলেন "আমি আমার ছেলেদের জন্য বাড়ি বানিয়েছি":

তাহলে এটি আব্বার পক্ষ থেকে ছেলেদের প্রতি হেবা হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু হেবায় দখল (কবজা) শর্ত। যেহেতু বাড়িটি আম্মার জমিতে এবং আম্মার নামে, তাই হেবা সম্পূর্ণ হয়নি। সুতরাং এটি আম্মার সম্পত্তিতেই থাকবে।


চতুর্থত: ইনসাফ ভিত্তিক সমাধানের সঠিক পদ্ধতি

ধাপ ১: আম্মার তরকাহ নির্ধারণ

  • জমি ও বাড়ির বর্তমান মূল্য
  • ইন্তেকালের পর থেকে আজ পর্যন্ত সংগৃহীত ভাড়া
  • অন্যান্য সম্পদ (যদি থাকে)
  • বিয়োগ: আম্মার ঋণ (যদি থাকে, যেমন আব্বার ইনভেস্ট প্রমাণিত হলে)
  • বিয়োগ: ওসিয়ত (যদি থাকে, সর্বোচ্চ ১/৩)

ধাপ ২: ঋণ পরিশোধ

যদি আব্বা প্রমাণ করতে পারেন যে তিনি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা আম্মার অনুমতিক্রমে বাড়ি নির্মাণে দিয়েছেন, তবে প্রথমে সেই টাকা পরিশোধ হবে।

কিন্তু শর্ত:

  • আব্বাকে প্রমাণ দিতে হবে কত টাকা দিয়েছেন
  • আম্মার অনুমতি ছিল কি না
  • অথবা আম্মা জীবিত থাকলে স্বীকার করতেন কি না

ধাপ ৩: অবশিষ্ট সম্পদ ফারায়েজ অনুযায়ী বণ্টন

| ওয়ারিস | অংশ | |---------|------| | আব্বা | ১/৪ | | আপনি (ছেলে ১) | ১/৪ | | ভাই ২ | ১/৪ | | ভাই ৩ | ১/৪ |

ধাপ ৪: ভাড়ার আয়ের বণ্টন

  • প্রতি মাসের ভাড়া উপরের অনুপাতে বণ্টন করুন
  • অথবা একটি হিসাব খাতা রাখুন এবং বছরে একবার বণ্টন করুন
  • জমি-বাড়ি বিক্রি না হওয়া পর্যন্ত এই পদ্ধতিতে চলবে

বিশেষ পরামর্শ

১. আব্বার ইনভেস্টের দাবি: আব্বাকে বলুন, তিনি যেন সঠিক হিসাব দেন—কত টাকা, কখন, কীভাবে দিয়েছেন। যদি প্রমাণিত হয়, তবে তা ঋণ হিসেবে প্রথমে পরিশোধ হবে। কিন্তু যদি প্রমাণ না থাকে, তবে তা হেবা হিসেবে গণ্য হবে এবং ফেরতযোগ্য নয়।

২. ভাড়ার টাকা: আব্বা যদি বলেন "আমি আগে আমার ইনভেস্ট তুলে নেব", তবে এটি ততক্ষণ পর্যন্ত বৈধ নয় যতক্ষণ না প্রমাণিত হয় যে এটি ঋণ ছিল। যদি ঋণ প্রমাণিত হয়, তবে সবার সম্মতিতে প্রথমে তা পরিশোধ করা যাবে।

৩. লিখিত চুক্তি: সবাই মিলে একটি লিখিত চুক্তি করুন—কত অংশ কার, কীভাবে ভাড়া বণ্টন হবে। এটি ভবিষ্যতে বিরোধ এড়াবে।

৪. সালিশ: যদি আব্বা ও আপনাদের মধ্যে মতবিরোধ হয়, তবে একজন বিশ্বস্ত আলেম/মুফতিকে সালিশ নিয়োগ করুন।


সারসংক্ষেপ

| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | আম্মার ওয়ারিস | আব্বা ১/৪, তিন ছেলে প্রত্যেকে ১/৪ | | ভাড়ার আয় | ফারায়েজ অনুযায়ী বণ্টন (আব্বা ২৫%, আপনারা প্রত্যেকে ২৫%) | | আব্বার ইনভেস্ট | যদি ঋণ প্রমাণিত হয়—প্রথমে পরিশোধ, তারপর বণ্টন | | আব্বার ইনভেস্ট | যদি হেবা হয়—ফেরতযোগ্য নয়, সম্পূর্ণ সম্পদ বণ্টন হবে | | জমি-বাড়ি বিক্রি | বিক্রি হলে মূল্য ফারায়েজ অনুযায়ী বণ্টন হবে |


মূল দলিল:

  • সূরা নিসা: ১১, ১২
  • সহীহ বুখারী: ৬৭৩২
  • সহীহ মুসলিম: ১৬১৫
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): কিতাবুল ফারায়েজ
  • ফাতাওয়া উসমানি: ফারায়েজ অধ্যায়
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া: ফারায়েজ ও میراث

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে ফারায়েজ বণ্টন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.