পরিবারে হারাম উপার্জন থাকলে কি করনীয়?

Family Life · Hanafi

Question No: 5642
Questioner: Md Abid Hasan
Question Asked: 18 Sep 2026, 11:44 AM
Reviewed & Published: 18 Sep 2026, 01:05 PM
Views: 6
Tokens: 4,037
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

পরিবারে হারাম উপার্জন থাকলে কি করনীয়?

Answer

পরিবারে হারাম উপার্জন থাকলে করণীয়

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

পরিবারের কোনো সদস্যের উপার্জন যদি হারাম (সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, চুরি, মিথ্যা সাক্ষ্য, নিষিদ্ধ ব্যবসা ইত্যাদি) হয়, তাহলে পরিবারের অন্য সদস্যদের করণীয় কী?


ভূমিকা: ইসলামে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব

আল্লাহ তা'আলা কুরআনে ইরশাদ করেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ

"হে মানুষ! পৃথিবীতে যা হালাল ও পবিত্র, তা থেকে আহার করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।" — সূরা আল-বাকারা: ১৬৮

আরও ইরশাদ হয়েছে:

يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا ۖ إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ

"হে রাসূলগণ! পবিত্র বস্তু আহার করো এবং সৎকর্ম করো।" — সূরা আল-মুমিনুন: ৫১

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا

"নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি কেবল পবিত্র (হালাল) বস্তুই কবুল করেন।" — সহীহ মুসলিম: ১০১৫

হাদিসে আরও এসেছে, এক ব্যক্তি দীর্ঘ সফর করে হাত প্রসারিত করে বলে: "হে আমার রব! হে আমার রব!" অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম, আর হারাম দিয়ে তার পুষ্টি গঠিত — এমন ব্যক্তির দুআ কীভাবে কবুল হবে? (সহীহ মুসলিম: ১০১৫)


মূল আলোচনা: পরিবারে হারাম উপার্জন থাকলে করণীয়

১. হারাম উপার্জনকারী নিজে যদি পরিবারের কর্তা হয়

যদি পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী হারাম পন্থায় উপার্জন করে, তাহলে তার উপর প্রথম দায়িত্ব হলো তাওবা করা এবং হারাম পন্থা ত্যাগ করা। আল্লাহ বলেন:

وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

"হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" — সূরা আন-নূর: ৩১

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে উল্লেখ করেন — হারাম মালের হুকুম হলো, তা ফেরত দেওয়া সম্ভব হলে মালিককে ফেরত দিতে হবে, অন্যথায় সদকা করতে হবে এবং তাওবা করতে হবে। (রাদ্দুল মুহতার: ৫/২৪৭)

২. পরিবারের অন্য সদস্যদের করণীয়

(ক) উপার্জনকারীকে হিকমতের সাথে বোঝানো

পরিবারের সদস্যদের উচিত — ভালোবাসা ও হিকমতের সাথে তাকে হারাম উপার্জনের ভয়াবহতা বোঝানো। কঠোরতা বা অপমান নয়; বরং নম্র ভাষায় কুরআন-হাদিসের দলিল পেশ করা।

(খ) নিজের খরচে সতর্কতা অবলম্বন

যদি পরিবারে হারাম ও হালাল মিশ্রিত উপার্জন থাকে, তাহলে যতটা সম্ভব হালাল অংশ থেকে খাওয়া এবং হারাম অংশ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা। তবে সম্পূর্ণ পৃথক করা কঠিন হলে — ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, মিশ্রিত মালে হারামের পরিমাণ যদি সংখ্যালঘু হয়, তবে সাধারণভাবে খাওয়ার অনুমতি আছে; তবে সন্দেহজনক বিষয় এড়ানো উত্তম।

ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, সন্দেহ থাকলে পরহেজ করা আফযাল। (আল-হিদায়া: ৪/৩৫৫; ফাতাওয়া আলমগিরি: ৫/৩৪২)

(গ) উপার্জনকারীকে বিকল্প হালাল পথ দেখানো

তাকে হালাল রুজির ব্যবস্থা করে দেওয়া — যেমন হালাল ব্যবসা, চাকরি, কৃষি ইত্যাদির পরামর্শ দেওয়া। রাসূল ﷺ বলেছেন:

مَنْ أَصَابَ مِنْكُمْ مَالًا فَلْيَسْتَعْفِفْ

"তোমাদের মধ্যে যে সম্পদ পায়, সে যেন তা দিয়ে সম্মান রক্ষা করে।" — সুনানে আবু দাউদ: ১৬৭০

(ঘ) দুআ করা

পরিবারের সদস্যের হিদায়াতের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করা।

(ঙ) নিজের উপার্জন হালাল রাখা

নিজের উপার্জন অবশ্যই হালাল রাখা, যাতে পরিবারে হালালের পরিমাণ বাড়ে এবং বরকত নাযিল হয়।

৩. যদি পরিবারের সদস্য হারাম উপার্জনে বাধ্য হয়

কেউ যদি বাধ্য হয়ে (যেমন চাকরিতে সুদ লেনদেন করা ছাড়া উপায় নেই) হারাম কাজ করে, তবে তার জন্য করণীয়:

  • সম্ভব হলে চাকরি পরিবর্তন করা
  • সম্ভব না হলে অন্তত সুদের লেনদেনে সরাসরি অংশ না নেওয়া
  • তাওবা করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা

৪. হারাম মালের হুকুম

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন — হারাম মাল তিন প্রকার:

  1. যা মালিককে ফেরত দেওয়া সম্ভব — ফেরত দেওয়া ওয়াজিব
  2. যা ফেরত দেওয়া সম্ভব নয় — সদকা করা ওয়াজিব (নেকির নিয়তে নয়, বরং মালিকের পক্ষ থেকে)
  3. যা মিশ্রিত — হালাল ও হারামের অনুপাত বিবেচনা করে ব্যবস্থা নিতে হবে

(রাদ্দুল মুহতার: ৫/২৪৭-২৪৮)


ব্যবহারিক করণীয় (ধাপে ধাপে)

| ধাপ | করণীয় | |-----|--------| | ১ | উপার্জনকারীকে হিকমতের সাথে বোঝানো | | ২ | তার জন্য হালাল উপার্জনের বিকল্প খোঁজা | | ৩ | নিজের উপার্জন হালাল রাখা | | ৪ | সম্ভব হলে হালাল অংশ থেকে খাওয়া | | ৫ | হারাম মাল ফেরত দেওয়া বা সদকা করা | | ৬ | তাওবা ও ইস্তিগফার করা | | ৭ | দুআ করা ও ধৈর্য ধারণ করা | | ৮ | প্রয়োজনে বিজ্ঞ মুফতির পরামর্শ নেওয়া |


উপসংহার

পরিবারে হারাম উপার্জন থাকলে নীরব থাকা বা সহযোগিতা করা — কোনোটিই সমাধান নয়। বরং হিকমতের সাথে সংশোধন, নিজের হালাল উপার্জন, দুআ, এবং সম্ভব হলে হারাম থেকে বেঁচে থাকা — এগুলোই ইসলামের নির্দেশনা। আল্লাহ তা'আলা সবাইকে হালাল উপার্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

তথ্যসূত্র:

  • কুরআন: সূরা আল-বাকারা ১৬৮, সূরা আল-মুমিনুন ৫১, সূরা আন-নূর ৩১
  • সহীহ মুসলিম: ১০১৫
  • সুনানে আবু দাউদ: ১৬৭০
  • রাদ্দুল মুহতার: ৫/২৪৭-২৪৮
  • আল-হিদায়া: ৪/৩৫৫
  • ফাতাওয়া আলমগিরি: ৫/৩৪২
  • ফাতাওয়া উসমানি: ২/৪০৫
  • মাআরিফুল কুরআন: ১/৪২৩
  • বেহেশতী জেওর: ৭ম অংশ

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.