স্বামী মাদকাসক্ত, জুয়াড়ি, পরকীয়াকারী, নির্যাতনকারী ও ভরণপোষণে অবহেলাকারী হলে স্ত্রীর জন্য করনীয় কি?
Family Life · Hanafi
Question
শায়েখ, আমার একজন পরিচিত বোনের বিয়ে হয়েছে ১বছর+।বাচ্চা নেই।ওর বিয়ের পর জানতে পারে যে ওর হাজবেন্ড ড্রাগ এডিক্টেট,অনলাইনে জুয়া খেলে,এবং মেয়ে ঘঠিত সমস্যা ও আছে,ইমোতে মেয়েদের সাথে কথা বলে।ওই বোনকে মানসিক অশান্তিতে রাখেন।দেশেও কয়েকবার গায়ে হাত তুলেছে। কাতারে থাকে ভাইদের সাথে।কিন্তু চাকরী করার ব্যাপারে উদাসীন।উলটো দেশ থেকে মাঝে মাঝে টাকা পাঠাতে হয়।ওই বোনের পরিবার চাচ্ছে তাকে নিয়ে আসার জন্য তার আগে কোন একজন দ্বীনি মুরব্বীর পরামর্শ নিতে চাচ্ছেন।সম্মানীত শায়েখ,এখন তারা এই বিষয়টা কীভাবে সমাধান করবেন?কোন দিকটা উত্তম হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
স্বামী যদি সত্যিই মাদকাসক্ত, জুয়াড়ি, পরকীয়ায় লিপ্ত, স্ত্রীর প্রতি নির্যাতনকারী এবং ভরণপোষণে অবহেলাকারী হয়—তাহলে ইসলামি দৃষ্টিতে এ অবস্থায় স্ত্রীর জন্য সবর করে একসাথে থাকা আবশ্যক নয়। প্রথমে মুরব্বী মাধ্যমে সালিশ ও সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। স্বামী সংশোধনের আশা না থাকলে, নির্যাতন ও অনৈতিকতা প্রমাণিত হলে খুলা বা তালাকের মাধ্যমে পৃথক হওয়া শরিয়তসম্মত পথ। তবে তালাকের সিদ্ধান্ত হঠাৎ একা না নিয়ে, পারিবারিক মুরব্বির পরামর্শে নিতে হবে।
১. প্রশ্নের সারমর্ম
আপনার পরিচিত বোনের স্বামী:
- ড্রাগ এডিক্টেড;
- অনলাইনে জুয়া খেলে;
- মেয়েদের সাথে অনৈতিক সম্পর্ক/কথাবার্তা রাখে;
- স্ত্রীকে মানসিক অশান্তিতে রাখে;
- কয়েকবার গায়ে হাত তুলেছে;
- চাকরির ব্যাপারে উদাসীন;
- দেশ থেকে টাকা পাঠাতে হয়;
- স্ত্রীর ভরণপোষণ ও দাম্পত্য অধিকার ঠিকভাবে আদায় করছে না।
পরিবার চায়, তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আগে একজন দ্বীনি মুরব্বীর পরামর্শ নিতে। প্রশ্ন: এ অবস্থায় কী করা উত্তম?
২. ইসলামি মূলনীতি
ক. স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকার
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।”
(সূরা নিসা: ১৯)
আরও বলেন:
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“নারীদের পুরুষদের উপর যেমন অধিকার আছে, পুরুষদেরও নারীদের উপর অধিকার আছে—সদ্ভাবের সাথে।”
(সূরা বাকারা: ২২৮)
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
فَاتَّقُوا اللَّهَ فِي النِّسَاءِ، فَإِنَّكُمْ أَخَذْتُمُوهُنَّ بِأَمَانِ اللَّهِ
“নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো; তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১৮; সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭৩৭)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।”
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫)
সুতরাং স্ত্রীকে মাদক-জুয়া-পরকীয়া-মারধর দিয়ে কষ্ট দেওয়া ইসলামে সম্পূর্ণ নিন্দনীয় ও গুনাহের কাজ।
খ. মাদক, জুয়া ও পরকীয়া—সবই হারাম
আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ
“হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজা ও ভাগ্য নির্ণয়ের তীর—এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং এগুলো থেকে দূরে থাকো।”
(সূরা মায়িদা: ৯০)
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ، وَلَا يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ
“ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে, তখন সে পূর্ণ মুমিন থাকে না; মদ্যপায়ী যখন মদ পান করে, তখন সে পূর্ণ মুমিন থাকে না।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৭৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৭)
ফতোয়ায়ে শামিতে আছে, মাদকতা ও জুয়া স্বামীর মারাত্মক দোষ; স্ত্রীর উপর এর কুপ্রভাব পড়লে শরিয়ত স্ত্রীকে রক্ষার ব্যবস্থা দিয়েছে।
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, কিতাবুন নিকাহ; খণ্ড ৪, কিতাবুল হুদুদ)
গ. নির্যাতন ও মারধর
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَجْلِدُ أَحَدُكُمْ امْرَأَتَهُ جَلْدَ الْعَبْدِ
“তোমাদের কেউ যেন তার স্ত্রীকে দাসীকে মারার মতো না মারে।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২০৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮৫১)
অন্য হাদিসে:
أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا، وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِهِمْ
“ঈমানের দিক থেকে পূর্ণ মুমিন সেই, যার চরিত্র সর্বোত্তম; আর তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।”
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১১৬২)
ইসলামে স্ত্রীকে অকারণে মারধর করা, মানসিক নির্যাতন করা, অপমান করা—সবই নিষিদ্ধ। হানাফি ফিকহে স্ত্রীর উপর জুলুম স্বামীর নিকৃষ্টতার প্রমাণ।
(ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ১, কিতাবুন নিকাহ; ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ২)
৩. এখন করণীয়—ধাপে ধাপে
সালিশ ও সংশোধনের চেষ্টা
কুরআনের নির্দেশ:
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا
“যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো, তবে এক বিচারক স্বামীর পরিবার থেকে এবং এক বিচারক স্ত্রীর পরিবার থেকে পাঠাও।”
(সূরা নিসা: ৩৫)
তাই প্রথমে:
- স্বামীর পরিবারের দ্বীনদার লোক;
- স্ত্রীর পরিবারের দ্বীনদার লোক;
- একজন নিরপেক্ষ আলিম/মুফতী;
এদের সমন্বয়ে সালিশ বসানো উচিত।
সালিশে স্পষ্টভাবে বলা হবে:
- মাদক ছাড়তে হবে;
- জুয়া ছাড়তে হবে;
- পরকীয়া/অনৈতিক সম্পর্ক ছাড়তে হবে;
- স্ত্রীকে মারধর করা যাবে না;
- স্ত্রীর ভরণপোষণ ও অধিকার দিতে হবে;
- চাকরি/উপার্জনের ব্যবস্থা করতে হবে;
- দ্বীনি পরিবেশে থাকতে হবে।
স্বামী যদি লিখিতভাবে বা স্পষ্টভাবে সংশোধনের অঙ্গীকার করে এবং বাস্তবে তা করে, তাহলে সংসার চালিয়ে যাওয়া যায়।
ধাপ ৩: স্বামী সংশোধনে অক্ষম হলে
যদি স্বামী:
- মাদক ছাড়তে না চায়;
- জুয়া ছাড়তে না চায়;
- পরকীয়া ছাড়তে না চায়;
- মারধর ও নির্যাতন চালিয়ে যায়;
- ভরণপোষণ না দেয়;
- দ্বীনি সালিশকে অস্বীকার করে;
তাহলে স্ত্রীর জন্য সবর করে এমন স্বামীর সাথে থাকা আবশ্যক নয়। এ অবস্থায় শরিয়ত স্ত্রীকে সম্মান ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা দিয়েছে।
৪. স্ত্রীর করণীয়—শরিয়তসম্মত পথ
ক. খুলা (স্বামীর সম্মতিতে বিচ্ছেদ)
স্ত্রী যদি স্বামীর সাথে থাকতে না চায়, তাহলে খুলা নিতে পারে। খুলার মাধ্যমে স্ত্রী কিছু মাল/মোহর ছেড়ে দিয়ে বিচ্ছেদ চায়।
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, কিতাবুত তালাক; ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ২, কিতাবুত তালাক)
তবে স্বামী যদি খুলাতেও রাজি না হয়, তাহলে ইসলামি আদালত/শরিয়া প্যানেলের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হবে।
খ. তালাক
স্বামী নিজে তালাক দিলে বা শরিয়া আদালত তালাকের রায় দিলে স্ত্রী পৃথক হতে পারে। হানাফি ফিকহে স্বামীর মাদকতা, জুয়া, পরকীয়া, নির্যাতন—এসব তালাকের বৈধ কারণ হিসেবে বিবেচিত।
(আল-হিদায়া, কিতাবুত তালাক; ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ১; ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ২)
গ. ফাসখ/আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ
হানাফি ফিকহে সাধারণত স্ত্রী নিজে একতরফা তালাক দিতে পারে না, তবে কিছু ক্ষেত্রে আদালতের মাধ্যমে ফাসখ করাতে পারে। মাদকতা, জুয়া, পরকীয়া, নির্যাতন, ভরণপোষণ না দেওয়া—এসব কারণ দেখিয়ে শরিয়া আদালত/দারুল ইফতার মাধ্যমে ফাসখের আবেদন করা যেতে পারে।
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩; ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ২; ফতোয়ায়ে শামি, কিতাবুন নিকাহ)
৫. দেশে ফেরার বিষয়ে পরামর্শ
পরিবার চাচ্ছে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে। এখানে কয়েকটি দিক বিবেচ্য:
যদি স্বামী সংশোধনের আশা থাকে:
- দেশে ফিরিয়ে এনে পারিবারিক পরিবেশে রাখা;
- দ্বীনি মাহফিল/সালিশে বসানো;
- চিকিৎসা/কাউন্সেলিং করানো;
- মাদক থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করা;
- চাকরির ব্যবস্থা করা;
- স্ত্রীর সাথে সদ্ভাবের অঙ্গীকার নেওয়া।
যদি সংশোধনের আশা না থাকে:
- জোর করে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা ঠিক হবে না;
- বরং স্ত্রীর নিরাপত্তা, ইজ্জত ও দ্বীন রক্ষা অগ্রাধিকার;
- প্রয়োজনে স্ত্রী আলাদা থাকবে, খুলা/তালাক/ফাসখের প্রক্রিয়া চলবে;
- স্ত্রীকে জুলুমের মধ্যে ফেলে রাখা যাবে না।
৬. কোন দিকটি উত্তম?
উত্তম দিক হলো:
- প্রথমে সালিশ ও সংশোধনের চেষ্টা—দ্বীনি মুরব্বী, মুফতী, দুই পরিবারের দ্বীনদার লোকদের মাধ্যমে।
- স্বামী যদি সত্যিই সংশোধিত হয়—তাহলে সংসার চালিয়ে যাওয়া উত্তম, বিশেষ করে যদি সে মাদক-জুয়া-পরকীয়া ছেড়ে দ্বীনদার হয়।
- স্বামী যদি সংশোধিত না হয়—তাহলে স্ত্রীর জন্য পৃথক হওয়া জায়েজ, বরং অনেক ক্ষেত্রে উত্তম; কারণ দ্বীন ও ইজ্জত রক্ষা করা ফরজ।
- হঠাৎ একা সিদ্ধান্ত না নেওয়া—তালাক/খুলা/ফাসখের সিদ্ধান্ত অবশ্যই মুফতীর পরামর্শে হতে হবে।
- স্ত্রীর মানসিক ও শারীরিক নিরাপত্তা—সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
৭. বিশেষ সতর্কতা
- স্বামী যদি মাদকাসক্ত ও জুয়াড়ি হয়, তার সাথে থাকলে স্ত্রীর দ্বীন, ইজ্জত, সম্পদ ও জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
- পরকীয়া প্রমাণিত হলে তা তালাকের বড় কারণ।
- মারধর প্রমাণিত হলে স্ত্রী থানায় অভিযোগ করতে পারে, তবে আগে দ্বীনি সালিশের চেষ্টা করা উত্তম।
- তালাকের সিদ্ধান্তে আবেগ নয়, বরং শরিয়ত ও মুফতীর পরামর্শ প্রধান।
- স্ত্রী যদি গর্ভবতী না হয়, তালাকের ইদ্দত হবে তিন মাসিক; গর্ভবতী হলে সন্তান জন্ম পর্যন্ত।
(রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুত তালাক)
৮. চূড়ান্ত পরামর্শ
আপনার পরিচিত বোনের পরিবার এখন যা করবেন:
স্বামীর পরিবারের দ্বীনদার লোকদের সাথে বসে সালিশ করুন। স্বামীকে সংশোধনের সুযোগ দিন—কিন্তু নির্দিষ্ট সময়সীমা ও শর্তে। সংশোধন না হলে খুলা/তালাক/ফাসখের শরিয়তসম্মত প্রক্রিয়া শুরু করুন। স্ত্রীকে জুলুমের মধ্যে ফেলে রাখবেন না; তার দ্বীন ও ইজ্জত রক্ষা করুন। দেশে ফেরানোর সিদ্ধান্ত সংশোধনের অঙ্গীকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তার উপর নির্ভর করে নিন।
আল্লাহ তাআলা সেই বোনকে হেফাজত করুন, তার স্বামীকে হেদায়েত দিন, এবং উভয়ের জন্য কল্যাণময় সমাধান দান করুন। আমিন।
৯. সংক্ষিপ্ত ফতোয়া
স্বামী মাদকাসক্ত, জুয়াড়ি, পরকীয়াকারী, নির্যাতনকারী ও ভরণপোষণে অবহেলাকারী হলে স্ত্রীর জন্য সবর করে তার সাথে থাকা আবশ্যক নয়। প্রথমে পারিবারিক মুরব্বিদের মাধ্যমে সালিশ ও সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। সংশোধনের আশা না থাকলে শরিয়তসম্মতভাবে খুলা, তালাক বা আদালতের মাধ্যমে ফাসখের ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। দেশে ফেরানোর আগে অবশ্যই মুফতীর পরামর্শ ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রয়োজন।
গ্রন্থপঞ্জি:
- সূরা নিসা: ১৯, ৩৫
- সূরা বাকারা: ২২৮
- সূরা মায়িদা: ৯০
- সহিহ বুখারি: ১৭৩৭, ২৪৭৫