আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমতুল্লাহ উস্তাদ। আমার বিয়ে হয়েছে ৪ বছর চলতেছে আমাদের এখনো কোন সন্তান ন
Family Life · Hanafi
Question
আমার বিয়ে হয়েছে ৪ বছর চলতেছে আমাদের এখনো কোন সন্তান নেই। আলহামদুলিল্লাহ একবার আল্লাহ দিয়েছে ২ মাসে নষ্ট হয়ে গেছে।
আমার হাসবেন্ড বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চিন্তা করে বলেছে আরো ১ বছর পর ইং শা আল্লাহ। কিন্তু এখন আমার মা- বাবা পাড়া প্রতিবেশি সবাই শুধু বলে কি হইছে আমার কেন বাচ্চা হয় সবার শুধু একি কথা। কিন্তু আমার মা জানে আমরা এখন নিচ্ছি না তারপরে ও শুধু বলে। আমার মা এই বিষয় টা নিয়ে অনেক চিন্তা করে। আমাকে অনেক বকাবকি করে অনেক সময় আমার অনেক রাগ হয়। আমার সাথে ঠিক করে কথা বলে না। আবার আমি হাসবেন্ড কে ও এই বিষয়ে কিছু বলতে পারি না উনি যেটা একবার বলেছে ঐ টা এ হবে ঐ কথার আর নড়চড় হবে। এখন আমি আমার হাসবেন্ড কে ও বলতে পারছি না আমার মা কে ও বুঝতে পারছি না । তখন আমার অনেক কান্না আসে। কিছুই ভালো লাগে। সব কিছু চিন্তা করলে আমার মা এর সাথে ও কথা বলতে মন চায় না আমার হাসবেন্ড এর সাথে ও কথা বলতে মন চায় না। অনেক ডিপ্রেশন এ আছি।
উস্তাদ আমাকে একটু বলবে আমি এখন কি করতে পারি।
(২)আমার আম্মুরা ৩ বোন আমার মেজো আংকেল আর ছোট আংকেল মধ্যে টাকা নিয়ে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। এখন কেউ কারো সাথে কথা বলে না। ঐখানে ছোট আন্টি দের এ বেশি দোষ ছিল। এমন কি আমার আন্টিরা একজন একজনের সাথে কথা বলে না। আমরা কত বুঝাইছি কথা বলার জন্য প্রায় ৩ বছরের মতো হবে। এখন ছোট আন্টি রা কথা বলতে চায় কল দেয় ওনারা ধরে না।
উস্তাদ এখন আমার ওনাদের কিভাবে বুঝতে পারি একটু বলবেন।
আশা করচি উওর টা পাব ইং শা আল্লাহ।
জাজাকাল্লাহু খাইরান।
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য জাযাকাল্লাহু খাইরান। আপনার কষ্ট ও মানসিক চাপের কথা পড়ে আমরা দুঃখিত। নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের আলোকে ধাপে ধাপে উত্তর দিচ্ছি।
প্রথম সমস্যা: সন্তান না হওয়া ও পারিবারিক চাপ
১. সন্তান আল্লাহর হাতে — এটি পরীক্ষা, শাস্তি নয়
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ ۚ يَهَبُ لِمَن يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَن يَشَاءُ الذُّكُورَ • أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَإِنَاثًا ۖ وَيَجْعَلُ مَن يَشَاءُ عَقِيمًا ۚ إِنَّهُ عَلِيمٌ قَدِيرٌ
"আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে চান কন্যা-সন্তান দান করেন, যাকে চান পুত্র-সন্তান দান করেন। অথবা তিনি তাদের পুত্র-কন্যায় মিলিত করেন এবং যাকে চান বন্ধ্যা করেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।" — সূরা আশ-শূরা: ৪৯-৫০
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট: সন্তান দেওয়া বা না দেওয়া সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছা। এটি আপনার বা আপনার স্বামীর কোনো দোষ নয়, বরং এটি একটি পরীক্ষা।
২. ধৈর্য ও তাওয়াক্কুলের নির্দেশ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
"হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" — সূরা আল-বাকারা: ১৫৩
৩. আপনার স্বামীর সিদ্ধান্তকে সম্মান করুন
আপনার স্বামী বলেছেন আরও ১ বছর অপেক্ষা করবেন ইনশাআল্লাহ। ইসলামে স্বামীর সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান রাখা স্ত্রীর দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا
"যদি আমি কাউকে অন্য কারো জন্য সিজদা করার আদেশ দিতাম, তবে স্ত্রীকে তার স্বামীর জন্য সিজদা করার আদেশ দিতাম।" — সুনানে তিরমিযী: ১১৫৯ (হাসান সহীহ)
আপনার স্বামী চিকিৎসা বা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সময় নিচ্ছেন — এটি তার অধিকার। আপনি তাকে চাপ দেবেন না।
৪. মা-বাবা ও প্রতিবেশীদের কথার জবাব
ইসলামে কেউ আপনার ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাখে না। আপনি ভদ্রভাবে বলতে পারেন:
- "আল্লাহর ইচ্ছা হলে হবে, আমরা চিকিৎসা করাচ্ছি।"
- "দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন দ্রুত দান করেন।"
রাগ নিয়ন্ত্রণ: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا تَغْضَبْ
"রাগ করো না।" — সহীহ বুখারী: ৬১১৪
আপনার মা যখন বকাবকি করেন, তখন আপনি চুপ থাকুন, ধৈর্য ধরুন, এবং মনে মনে দোয়া করুন। আল্লাহ বলেন:
وَاصْبِرْ عَلَىٰ مَا يَقُولُونَ وَاهْجُرْهُمْ هَجْرًا جَمِيلًا
"তারা যা বলে তাতে ধৈর্য ধরো এবং সুন্দরভাবে তাদের এড়িয়ে চলো।" — সূরা আল-মুযযাম্মিল: ১০
৫. আপনার করণীয় (অবিলম্বে)
| করণীয় | বিবরণ | |--------|--------| | ধৈর্য ও দোয়া | নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যা দোয়া করুন, বিশেষত রাতের শেষ প্রহরে | | ইস্তিগফার | বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন — আল্লাহ ইস্তিগফারের বরকতে সন্তান দান করেন (সূরা নূহ: ১০-১২) | | চিকিৎসা | স্বামী-স্ত্রী উভয়ে ডাক্তারি পরীক্ষা করান — এটি শরীয়তসম্মত | | মা-বাবার সাথে | রাগ না করে ভদ্রভাবে বিষয়টি বুঝান, অথবা আপনার স্বামীকে দিয়ে বলান | | স্বামীর সাথে | তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করুন, চাপ দেবেন না | | ডিপ্রেশন | নামায, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির বাড়ান; প্রয়োজনে বিশ্বস্ত আলেমা বা পরামর্শদাতার সাথে কথা বলুন |
বিশেষ দোয়া:
رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ "হে আমার রব! আমাকে সৎকর্মপরায়ণ সন্তান দান করুন।" — সূরা আস-সাফফাত: ১০০
رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ "হে আমার রব! আমাকে একা রেখো না, তুমি তো শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকারী।" — সূরা আল-আম্বিয়া: ৮৯
দ্বিতীয় সমস্যা: আত্মীয়দের মধ্যে টাকা নিয়ে ঝগড়া ও সম্পর্ক ছিন্ন
১. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ফরজ
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
"আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে চাও, এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষণকারী।" — সূরা আন-নিসা: ১
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ، وَيُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ، فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ
"যে ব্যক্তি চায় তার রিযিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বাড়ুক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।" — সহীহ বুখারী: ৫৯৮৬
২. সম্পর্ক ছিন্ন করা কঠিন গুনাহ
وَالَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ ۙ أُولَٰئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ
"যারা আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ যে সম্পর্ক রক্ষার আদেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে, তাদের জন্যই রয়েছে লা'নত এবং তাদের জন্যই রয়েছে মন্দ পরিণাম।" — সূরা আর-রা'দ: ২৫
৩. টাকা-পয়সার বিষয়ে ইসলামের নির্দেশ
- ঋণ থাকলে তা ফেরত দেওয়া ফরজ।
- যদি কেউ কারো হক নষ্ট করে থাকে, তবে তা ফেরত দেওয়া বা ক্ষমা চাওয়া আবশ্যক।
- যদি উভয় পক্ষেরই দাবি থাকে, তবে নিরপেক্ষভাবে সমাধান করতে হবে।
আল্লাহ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দেন আমানত তার হকদারের কাছে ফিরিয়ে দিতে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করো, তখন ন্যায়বিচার করো।" — সূরা আন-নিসা: ৫৮
৪. আপনি কী করতে পারেন
| করণীয় | বিবরণ | |--------|--------| | নিরপেক্ষ থাকুন | কারো পক্ষ নিয়ে কথা বলবেন না, বিশেষত ছোট আন্টির পক্ষে বা বিপক্ষে | | ভালো কাজ করুন | সালাম দিন, খোঁজখবর নিন — সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যান | | বড়দের সাথে পরামর্শ | পরিবারের সম্মানিত বড় কেউ থাকলে তাকে মধ্যস্থতা করতে বলুন | | দোয়া করুন | তাদের হেদায়েতের জন্য দোয়া করুন | | গীবত থেকে বাঁচুন | কারো দোষ চর্চা করবেন না — এটি কবীরা গুনাহ |
وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا
"তোমরা একে অপরের গীবত করো না।" — সূরা আল-হুজুরাত: ১২
৫. সম্পর্ক জোড়া লাগানোর ফজিলত
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَيْسَ الْوَاصِلُ بِالْمُكَافِئِ، وَلَكِنِ الْوَاصِلُ الَّذِي إِذَا قُطِعَتْ رَحِمُهُ وَصَلَهَا
"সেই ব্যক্তি সম্পর্ক রক্ষাকারী নয় যে কেবল প্রতিদানস্বরূপ সম্পর্ক রক্ষা করে; বরং প্রকৃত সম্পর্ক রক্ষাকারী সে-ই, যে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পরও তা জোড়া লাগায়।" — সহীহ বুখারী: ৫৯৯১
সারসংক্ষেপ ও আপনার জন্য বিশেষ পরামর্শ
-
সন্তান না হওয়া নিয়ে: ধৈর্য ধরুন, দোয়া করুন, চিকিৎসা করান, স্বামীর সিদ্ধান্তকে সম্মান করুন। মা-বাবাকে ভদ্রভাবে বুঝান। রাগ নিয়ন্ত্রণ করুন।
-
পারিবারিক ঝগড়া নিয়ে: নিরপেক্ষ থাকুন, সালাম-সম্পর্ক চালু রাখুন, দোয়া করুন, গীবত থেকে বাঁচুন। বড়দের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করুন।
-
ডিপ্রেশনের জন্য: পাঁচ ওয়াক্ত নামায যথাযথভাবে আদায় করুন, কুরআন তিলাওয়াত করুন, "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" বেশি পড়ুন, এবং প্রয়োজনে একজন বিশ্বস্ত আলেমা বা পরামর্শদাতার সাথে কথা বলুন।
-
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। তিনি বলেন:
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
"যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" — সূরা আত-তালাক: ৩
আল্লাহ তা'আলা আপনার কষ্ট দূর করুন, আপনার ঘরে সন্তানের বরকত দান করুন, এবং আপনার পরিবারে শান্তি ও সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনুন। আমীন।
والله أعلم بالصواب