মৃত শিশুর জন্য লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ খতম পড়ানো বা বিশেষ দোয়া করানোর বিধান কী?
Family Life · Hanafi
Question
ওস্তাদ আমার এক ভাবির ২টা ছোট বাচ্চা ৭মাসে সমস্যার কারনে ডেলিভারি হয়ে যায়।।জীবিত হয়।।কিন্তু পরে একজন সেই দিনই মারা যায়।।আরেক জন্য তিন দিন পর মারা যায়।।ওরা মায়ের বুকের দুধও খেতে পারে নাই।।এখন ভাবি চাচ্ছেন উনার বাচ্চাদের জন্য লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর খতম পড়াতে।।এটা কি পড়ানো যাবে???কিংবা অন্য কোন দোয়া করানো যাবে???
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নে উল্লিখিত বিষয়টি অর্থাৎ মৃত শিশুদের জন্য ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর খতম পড়ানো বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট দোয়া করানোর বিষয়ে ফিকহের মূলনীতি হলো:
১. মৃত শিশুর জন্য দোয়া করা:
শিশু মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করলে এবং মৃত্যুবরণ করলে সে জান্নাতি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ»
(সহীহ বুখারী, হাদিস: ১৩৮৫)
অন্য হাদিসে এসেছে,
«كُلُّ مُسْلِمٍ يَمُوتُ فَهُوَ فِي الْجَنَّةِ»
(সহীহ মুসলিম)
সুতরাং মৃত শিশুর জন্য দোয়া করা, আল্লাহর কাছে তার মাগফিরাত কামনা করা জায়েজ। তবে শিশু নাবালেগ হওয়ায় তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার বিশেষ প্রয়োজন নেই; বরং তার জন্য জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা কামনা করা যায়।
২. ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ খতম পড়ানো:
কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যায় ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ খতম পড়ানো বা পড়ানোর বিধান ইসলামে নেই। এটি বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বিশেষ করে মৃত ব্যক্তির জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যায় খতম পড়ানোর প্রচলন হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’ গ্রন্থে বলেন,
«وَلَا يَجُوزُ الْتِزَامُ عَدَدٍ مُعَيَّنٍ فِي الذِّكْرِ إِلَّا بِدَلِيلٍ»
(রাদ্দুল মুহতার, ২/৪৩৯)
অর্থাৎ দলিল ছাড়া যিকিরে নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা জায়েজ নয়।
- জানাজার নামাজ পড়া (যদি জন্মের পর জীবিত থাকে এবং মৃত্যুবরণ করে)।
- তার জন্য দোয়া করা:
«اللَّهُمَّ اجْعَلْهُ لَنَا سَلَفًا وَفَرَطًا وَذُخْرًا وَشَفِيعًا مُجَابًا»
(আল্লাহুম্মাজআলহু লানা সালাফান ওয়া ফারাতান ওয়া যুখরান ওয়া শাফিঈয়ান মুজাবান)
অর্থ: হে আল্লাহ! তাকে আমাদের জন্য অগ্রগামী, পুরস্কার, সঞ্চয় এবং কবুলকৃত সুপারিশকারী বানাও।
(এই দোয়াটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, দেখুন: মিশকাত, হাদিস: ১৭১৭) - সন্তানের মৃত্যুতে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে প্রতিদান কামনা করা।
৪. খতম বা বিশেষ দোয়া করানোর বিধান:
মৃত শিশুর জন্য কুরআন খতম করানো, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ নির্দিষ্ট সংখ্যায় পড়ানো বা বিশেষ মজলিস করা শরিয়তে প্রমাণিত নয়। তবে সাধারণভাবে কুরআন তিলাওয়াত করে তার সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছানোর বিশ্বাস রাখা অনেক ফকিহের মতে জায়েজ, তবে শিশুর ক্ষেত্রে এর বিশেষ প্রয়োজন নেই।
আর যদি কেউ নফল ইবাদত করে সওয়াব মৃত শিশুর রুহের কাছে পৌঁছানোর নিয়ত করে, তবে তা আল্লাহর কাছে দোয়া করা হিসেবে গণ্য হবে; কিন্তু নির্দিষ্ট খতম বা মজলিসের আয়োজন করা বিদআত।
৫. সান্ত্বনা ও পরামর্শ:
ভাবিকে বোঝানো উচিত যে, তার শিশুরা জান্নাতে তার জন্য সুপারিশকারী হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُتَوَفَّى لَهُ ثَلَاثَةٌ مِنَ الْوَلَدِ لَمْ يَبْلُغُوا الْحِنْثَ إِلَّا أَدْخَلَهُ اللهُ الْجَنَّةَ بِفَضْلِ رَحْمَتِهِ»
(সহীহ বুখারী, হাদিস: ১২৪৮)
অর্থ: যে মুসলিমের তিনটি নাবালেগ সন্তান মারা যায়, আল্লাহ তার প্রতি রহমতের কারণে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
তিনি ধৈর্য ধারণ করলে এবং আল্লাহর কাছে প্রতিদান কামনা করলে তার জন্য মহাপুরস্কার রয়েছে।
উপসংহার:
মৃত শিশুর জন্য ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ খতম পড়ানো বা নির্দিষ্ট কোনো দোয়া করানোর বিধান ইসলামে নেই। বরং হাদিসে বর্ণিত দোয়া পড়া, জানাজার নামাজ পড়া (যদি প্রযোজ্য হয়) এবং ধৈর্য ধারণ করা কর্তব্য। ভাবিকে সান্ত্বনা দিয়ে বোঝানো উচিত যে তার শিশুরা জান্নাতি এবং তার জন্য সুপারিশকারী হবে।
والله أعلم بالصواب