তালাকনামা তারিখবিহীন ও সাক্ষীবিহীন হলে এবং শুধু ভয় দেখানোর নিয়তে মোবাইলে পাঠালে শরয়ীভাবে তালাক পতিত হয় কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
প্রশন:
সামী যদি কোন তালাক নামায় স্বামীর স্বাক্ষর বিহীন ও তারিখ বিহীন। শুধু মাএ ভয় দেখানোর নিয়তে (তালাকনামা) স্ত্রীকে মোবাইলে পাঠাই এবং তালাকনামার উপরে লেখে দিচিলো সামী সএীকে একটু ওয়েট কর এর দারা আইনি ও শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে কি নাহ?তালাক নামায় লেখা আছে আমরা দুজনে আজ থেকে বিবাহ বিচছেদ করলাম। কিনতু আমি সএীকে তালাক দিলাম এমন কথা বলা নাই।সেই তালাক নামা স্বামীর স্বাক্ষর বিহীন ও তারিখ বিহীন ছিল। তার মধ্যে কোন সাক্ষী সই চিলো নাহ।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
الجواب وبالله التوفيق
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে (স্বাক্ষরবিহীন, তারিখবিহীন, সাক্ষীবিহীন তালাকনামা মোবাইলে পাঠানো এবং তার উপর "সামী সইকে একটু ওয়েট কর" লেখা) শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে তালাক সংঘটিত হয়নি। কারণ তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য স্বামীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট তালাকের ইচ্ছা ও ঘোষণা (لفظ الطلاق أو ما يقوم مقامه) শর্ত। শুধু ভয় দেখানোর নিয়তে কাগজে "বিবাহ বিচ্ছেদ করলাম" লেখা এবং তা পাঠানো—এতে তালাকের ইচ্ছা না থাকলে তালাক পতিত হয় না। তবে আইনি দৃষ্টিকোণ ভিন্ন হতে পারে; শরয়ী ফতোয়ার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই মুসলিমের কর্তব্য।
বিস্তারিত উত্তর:
১. তালাকের শরয়ী সংজ্ঞা ও শর্ত:
তালাক হলো স্বামীর পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট শব্দ বা ইঙ্গিত দ্বারা বিবাহ বন্ধন ছিন্ন করার ঘোষণা। হানাফী মাযহাবে তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য দুটি মূল উপাদান আবশ্যক:
- তালাকের ইচ্ছা (قصد الطلاق) অথবা তালাকের শব্দ উচ্চারণ।
- স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট শব্দ (صريح) অথবা ইঙ্গিতবাহী শব্দ (كناية) যা তালাকের অর্থে ব্যবহৃত হয়।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ
"আর তালাকপ্রাপ্তা নারীরা তিন হায়েয পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।"
(সূরা আল-বাকারা: ২২৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى
"নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যা সে নিয়ত করেছে।"
(সহীহ বুখারী: ১; সহীহ মুসলিম: ১৯০৭)
২. হানাফী ফিকহের মূলনীতি:
ইমাম আবু হানীফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর ঐকমত্য হলো—তালাকের ইচ্ছা ব্যতীত শুধু লেখা বা পাঠানো দ্বারা তালাক পতিত হয় না, যদি না তা স্পষ্ট তালাকের শব্দ হয় এবং স্বামী তা ইচ্ছাকৃতভাবে উচ্চারণ বা লিখে।
আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) লিখেন:
وَلَا يَقَعُ الطَّلَاقُ بِالْكِتَابَةِ إِلَّا إِذَا كَانَتْ مُسْتَبِينَةً مَعَ نِيَّةِ الطَّلَاقِ
"তালাক লেখার দ্বারা পতিত হয় না, তবে যদি তা স্পষ্ট হয় এবং তালাকের নিয়ত থাকে।"
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৪৭)
৩. প্রশ্নের বিশ্লেষণ:
- স্বাক্ষরবিহীন ও তারিখবিহীন: তালাকনামায় স্বামীর স্বাক্ষর ও তারিখ না থাকলে তা প্রমাণযোগ্য দলিল নয়। শরয়ীতে তালাকের জন্য সাক্ষী শর্ত নয়, তবে তালাকের ইচ্ছা ও ঘোষণা শর্ত।
- সাক্ষীবিহীন: তালাকের জন্য সাক্ষী রাখা সুন্নত, কিন্তু শর্ত নয়। তবে সাক্ষী না থাকলে ভবিষ্যতে প্রমাণে সমস্যা হয়।
- "ভয় দেখানোর নিয়ত": স্বামী যদি স্পষ্টভাবে বলে যে সে তালাক দেয়নি, শুধু ভয় দেখানোর জন্য কাগজ পাঠিয়েছে—তাহলে তালাক পতিত হয় না। কারণ তালাকের ইচ্ছা ছিল না।
- "আমরা দুজনে আজ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ করলাম" লেখা: এটি তালাকের স্পষ্ট শব্দ নয়; বরং এটি একটি ঘোষণা। যদি স্বামী তা লিখে পাঠায় এবং তালাকের নিয়ত করে, তবে তালাক পতিত হতে পারে। কিন্তু প্রশ্নে বলা হয়েছে—"আমি সএীকে তালাক দিলাম এমন কথা বলা নাই" এবং "ভয় দেখানোর নিয়ত" ছিল। তাই তালাক পতিত হয়নি।
- "সামী সইকে একটু ওয়েট কর" লেখা: এটি তালাকের কোনো শব্দ নয়; বরং এটি একটি নির্দেশ। এর দ্বারা তালাক পতিত হয় না।
৪. ফতোয়া:
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে তালাক সংঘটিত হয়নি।
তবে আপনি যদি নিজে থেকে "তালাক দিলাম" বলে থাকেন বা তালাকের নিয়ত করে তালাকনামা পাঠিয়ে থাকেন, তাহলে তালাক পতিত হবে।
আর যদি শুধু ভয় দেখানোর নিয়ত থাকে এবং তালাকের ইচ্ছা না থাকে, তাহলে তালাক পতিত হয়নি।
৫. করণীয়:
- শরয়ী সমাধান: আপনি যদি নিশ্চিত হন যে তালাকের ইচ্ছা ছিল না, তাহলে বিবাহ বহাল আছে। তবে উভয়কে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।
- আইনি দলিল: আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে তালাকনামা স্বাক্ষরবিহীন ও তারিখবিহীন হওয়ায় তা আদালতে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। তবে আইনি পরামর্শের জন্য একজন মুসলিম আইনজীবীর শরণাপন্ন হোন।
- সতর্কতা: তালাক একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ভয় দেখানোর জন্য তালাকনামা পাঠানো বা "বিবাহ বিচ্ছেদ" লেখা—এটি গুনাহের কাজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللَّهِ الطَّلَاقُ
"আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত হালাল বিষয় হলো তালাক।"
(সুনানে আবু দাউদ: ২১৭৮; ইবনে মাজাহ: ২০১৮)
৬. উপসংহার:
- তালাক পতিত হয়নি যদি না তালাকের ইচ্ছা ও স্পষ্ট ঘোষণা থাকে।
- তালাকনামা স্বাক্ষরবিহীন, তারিখবিহীন ও সাক্ষীবিহীন হওয়ায় শরয়ীভাবে তা তালাকের দলিল নয়।
- ভয় দেখানোর নিয়ত থাকলে তালাক পতিত হয় না।
- তবে সতর্কতা: যদি স্বামী নিজে "তালাক দিলাম" বলে বা তালাকের নিয়ত করে তালাকনামা পাঠায়, তাহলে তালাক পতিত হবে।
والله أعلم بالصواب