দুধবোন বিয়ে করলে বংশের পবিত্রতা নষ্ট হবে কি না?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 5592
Questioner: Bukhari
Question Asked: 17 Sep 2026, 12:03 PM
Reviewed & Published: 17 Sep 2026, 12:42 PM
Views: 15
Tokens: 4,680
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি জন্মের পরবর্তী তিনদিন মামির দুধ, দিনের কিছু সময় করে পাত্রে তিনদিন অল্প অল্প করে ঘন ঘন পান করেছি,এখন মামাতো বোন বিয়ে করা জায়েজ?
যদি জেনে বুঝে দুধবোন বিয়ে করি,তবে বংশের পবিত্রতা নষ্ট হবে? এবং সন্তান কি জারজ হবে?
আমরা দুধভাই বোন যারা বিয়ে করেছে, তারা সন্তানের কাছে দায়ী হব?

Answer

দুধ সম্পর্ক (রাদা'আত) সংক্রান্ত মাসআলার বিস্তারিত উত্তর

উত্তর:

সংক্ষিপ্ত উত্তর

আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো—আপনি ওই মামাতো বোনকে বিয়ে করতে পারবেন না; এ বিয়ে হারাম ও নাজায়েজ। কারণ আপনি জন্মের পরবর্তী তিন দিন মামির দুধ পান করেছেন, আর ইসলামী শরীয়তে একবার দুধ পান করলেও (রাদা'আতে ওয়াহিদা) দুধ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় —এটি ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মত (যাহিরুর রিওয়ায়া)। সুতরাং আপনি ওই মামি দুধমা (রাদা'আতের মা) হয়ে যান, আর তার কন্যা আপনার দুধবোন হয়ে যান। দুধবোনের সাথে বিবাহ কুরআনের সুস্পষ্ট নস দ্বারা চিরতরে হারাম।


১. দুধ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার শর্ত ও পরিমাণ

কুরআনের দলিল

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَاتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ ... وَأُمَّهَاتُكُمُ اللَّاتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُم مِّنَ الرَّضَاعَةِ

"তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা, কন্যা, বোন... এবং তোমাদের সেই মায়েরা যারা তোমাদের দুধ পান করিয়েছে, এবং দুধের সম্পর্কে তোমাদের বোনেরা।" —(সূরা আন-নিসা: ২৩)

হাদিসের দলিল

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

يَحْرُمُ مِنَ الرَّضَاعِ مَا يَحْرُمُ مِنَ النَّسَبِ

"দুধের সম্পর্কে যা হারাম হয়, বংশের সম্পর্কেও তা হারাম হয়।" —(সহিহ বুখারি: ২৬৪৫; সহিহ মুসলিম: ১৪৪৪)

অন্য হাদিসে:

لَا تُحَرِّمُ الْمَصَّةُ وَلَا الْمَصَّتَانِ

"একবার বা দুইবার চুমুক দুধ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে না।" —(সহিহ মুসলিম: ১৪৫১)

হানাফি মাযহাবের মাসআলা

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, দুধের পরিমাণ যতই কম হোক, একবার পান করলেও দুধ সম্পর্ক (রাদা'আত) প্রতিষ্ঠিত হয়। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতে কমপক্ষে একবার পূর্ণ তৃপ্তি সহকারে পান করা শর্ত। তবে ফতোয়া ইমাম আবু হানিফার মতেই —অর্থাৎ অল্প পরিমাণেও সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।

রেফারেন্স:

  • আল-হিদায়া: "وَالْقَلِيلُ مِنَ الرَّضَاعِ يُحَرِّمُ عِنْدَ أَبِي حَنِيفَةَ رَحِمَهُ اللَّهُ"
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২১০-২১২
  • ফতোয়ায়ে আলমগিরি: খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৪২
  • বাদায়েউস সানায়ে: খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪০৭

আপনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ

আপনি জন্মের পরবর্তী তিন দিন মামির দুধ পাত্রে করে অল্প অল্প করে ঘন ঘন পান করেছেন। যেহেতু ইমাম আবু হানিফার মতে অল্প পরিমাণ দুধও সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে, তাই আপনার ও মামির মধ্যে দুধ-মা ও দুধ-সন্তানের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। ফলে মামির কন্যা (আপনার মামাতো বোন) আপনার দুধবোন হয়ে যান।


২. দুধবোনের সাথে বিবাহের হুকুম

দুধবোনের সাথে বিবাহ কুরআনের নস দ্বারা চিরতরে হারাম। এটি ইজমা (সর্বসম্মত) মাসআলা।

وَأَخَوَاتُكُم مِّنَ الرَّضَاعَةِ — "এবং দুধের সম্পর্কে তোমাদের বোনেরা (হারাম)।" —(সূরা আন-নিসা: ২৩)

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার: খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২১০
  • ফতোয়ায়ে উসমানি: খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩০৫-৩০৮
  • ইমদাদুল ফতোয়া: খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৮৭

সুতরাং আপনি ওই মামাতো বোনকে বিয়ে করতে পারবেন না। এ বিয়ে করা যাবে না, হারাম।


৩. জেনে বুঝে দুধবোনকে বিয়ে করলে কী হবে?

(ক) বংশের পবিত্রতা কি নষ্ট হবে?

হ্যাঁ, এ বিয়ে জিনার (ব্যভিচার) সমতুল্য। দুধবোনের সাথে বিবাহ-বন্ধন সহবাসসহ সম্পূর্ণরূপে যিনা হিসেবে গণ্য হবে। কারণ দুধের সম্পর্ক রক্তের সম্পর্কের মতোই। এতে বংশের পবিত্রতা নষ্ট হবে, পরিবারে কলঙ্ক আসবে এবং আল্লাহর কাছে এটা মহাপাপ।

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا

"তোমরা যিনার কাছেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।" —(সূরা আল-ইসরা: ৩২)

(খ) সন্তান কি জারজ হবে?

হ্যাঁ, এ সম্পর্ক থেকে জন্মগ্রহণকারী সন্তান শরীয়তের দৃষ্টিতে জারজ (ব illegitimate) হিসেবে গণ্য হবে। কারণ এটি বৈধ বিবাহ নয়, বরং যিনার শামিল। তবে মনে রাখতে হবে—সন্তান এতে দায়ী নয়; দায়ী হবে তার পিতা-মাতা। সন্তান নিরপরাধ, তার কোনো গুনাহ নেই।

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার: খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২১০-২১৫
  • ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া: খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ২৩০

৪. যারা দুধভাই-বোন জেনে-বুঝে বিয়ে করেছে, তারা সন্তানের কাছে দায়ী হবে?

হ্যাঁ, অবশ্যই দায়ী হবে। কারণ:

  1. তারা জেনে-বুঝে হারাম কাজ করেছে —এটি যিনার সমতুল্য।
  2. সন্তানকে হারাম সম্পর্কের মাধ্যমে জন্ম দিয়েছে —সন্তান জারজ হিসেবে জন্মেছে।
  3. সন্তানের হক নষ্ট করেছে —সন্তানের বৈধ বংশ পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা ও উত্তরাধিকার সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
  4. কিয়ামতের দিন তাদের জবাবদিহি করতে হবে —সন্তান তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে অভিযোগ করবে।

وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ

"কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।" —(সূরা আল-আনআম: ১৬৪)

তবে সন্তান নিজের গুনাহের জন্য দায়ী নয়; সে নিরপরাধ। কিন্তু পিতা-মাতা সন্তানের হক নষ্ট করার জন্য এবং হারাম কাজ করার জন্য দায়ী থাকবে।

রেফারেন্স:

  • মা'আরিফুল কুরআন: সূরা আন-নিসা: ২৩-এর তাফসির
  • ফতোয়ায়ে উসমানি: খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩০৫
  • ইমদাদুল ফতোয়া: খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৮৭-২৯০

৫. করণীয়

  1. এ বিয়ে অবিলম্বে বাতিল করে দিতে হবে —যদি ইতিমধ্যে হয়ে থাকে, তবে তাওবা করে পৃথক হতে হবে।
  2. তাওবা করুন —আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করুন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকুন।
  3. সন্তানের হক আদায় করুন —সন্তানের ভরণপোষণ ও শিক্ষার ব্যবস্থা করুন; তবে সন্তানকে এ হারাম সম্পর্কের পরিচয় থেকে রক্ষা করুন।
  4. বংশের দুধ সম্পর্ক যাচাই করুন —পরিবারের বড়দের কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন কে কার দুধভাই-বোন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ভুল না হয়।
  5. স্থানীয় মুফতি সাহেবের সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন —বিস্তারিত ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি জানিয়ে ফতোয়া নিন।

সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | মামাতো বোনকে বিয়ে করা জায়েজ? | না, হারাম ও নাজায়েজ (দুধ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত) | | বংশের পবিত্রতা নষ্ট হবে? | হ্যাঁ, যিনার সমতুল্য | | সন্তান জারজ হবে? | হ্যাঁ, শরীয়তের দৃষ্টিতে জারজ | | দুধভাই-বোন যারা বিয়ে করেছে, তারা সন্তানের কাছে দায়ী? | হ্যাঁ, দায়ী হবে |

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.