ক্রিপটোকারেন্সি হালাল না হারাম

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 5591
Questioner: Jannaty khatun
Question Asked: 17 Sep 2026, 11:07 AM
Reviewed & Published: 17 Sep 2026, 11:52 AM
Views: 17
Tokens: 4,696
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ক্রিপ্টোকারেন্সির অনেক এয়ারড্রপ এর কাজ আছে, যেমন এপ এর মাধ্যমে বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। অনেক প্রজেক্ট আছে যেগুলা এপ এ মাইনিং করতে হয়, আবার কিছু আছে যেগুলা তাদের ওয়েবসাইটে ডেইলি টাস্ক পূরণ করতে হয়, এর বিনিময়ে তাদের যে কারেন্সি আছে সেটা থেকে কিছু পরিমাণ রিওয়ার্ড হিসেবে দেয়, সেগুলা এক্সচেঞ্জারে নিয়ে বিক্রি করা যায়, পরবর্তীতে সেই টাকাটা ব্যাংক বা বিকাশ নগদের মাধ্যমে হাতে পাওয়া যায়। এই টাকা কী হালাল হবে?

Answer

ক্রিপ্টোকারেন্সি এয়ারড্রপ, মাইনিং ও রিওয়ার্ড থেকে অর্জিত টাকার হুকুম

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: বিভিন্ন অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে মাইনিং, ডেইলি টাস্ক বা এয়ারড্রপের মাধ্যমে ক্রিপ্টোকারেন্সি অর্জন করে তা এক্সচেঞ্জারে বিক্রি করে ব্যাংক/বিকাশে টাকা নেওয়া কি হালাল?


সংক্ষিপ্ত উত্তর

সতর্কতামূলক উত্তর (এহতিয়াত): বর্তমান সময়ে প্রচলিত অধিকাংশ ক্রিপ্টোকারেন্সি (বিটকয়েন, ইথেরিয়াম, ডোজকয়েন ইত্যাদি) শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ মুদ্রা বা মাল (মালে মুতাকাওয়িম) হিসেবে স্বীকৃত নয়। কারণ:

  1. এগুলোতে কোনো বাস্তব সম্পদ, সরকারি গ্যারান্টি বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমর্থন নেই
  2. এগুলোর মূল্য অত্যন্ত অস্থির ও অনিশ্চিত (গারার)
  3. এগুলো মূলত জুয়া, স্পেকুলেশন ও ধোঁকাবাজির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
  4. অনেক ক্ষেত্রে এগুলো অবৈধ কার্যক্রম (মাদক, জুয়া, সুদ, মানি লন্ডারিং)-এ ব্যবহৃত হয়।

তাই এয়ারড্রপ, মাইনিং বা টাস্ক কমপ্লিশনের মাধ্যমে অর্জিত ক্রিপ্টোকারেন্সি বিক্রি করে প্রাপ্ত টাকা হালাল হওয়ার ব্যাপারে গুরুতর সন্দেহ রয়েছেঅনেকেই হারাম বলেছেন। তাই এহতিয়াত (সতর্কতা) হলো তা থেকে বিরত থাকা।


বিস্তারিত আলোচনা

১. ক্রিপ্টোকারেন্সি কি শরীয়তসম্মত মাল?

হানাফি ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, মালে মুতাকাওয়িম (বৈধ সম্পদ) হওয়ার জন্য দুটি শর্ত:

  • মালিয়্যাত (সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি): শরীয়ত বা উরফ (প্রচলিত রীতি) দ্বারা সম্পদ হিসেবে গণ্য হতে হবে।
  • হুরমাত (সম্মানযোগ্যতা): শরীয়তে এর ব্যবহার বৈধ হতে হবে।

আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:

«وَالْمَالُ الْمُتَقَوِّمُ هُوَ الَّذِي يُبَاحُ الِانْتِفَاعُ بِهِ شَرْعًا»

অর্থ: "মালে মুতাকাওয়িম হলো যা শরীয়ত অনুযায়ী ব্যবহার করা বৈধ।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃ. ৫০১)

বর্তমান ক্রিপ্টোকারেন্সি কোনো সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টিযুক্ত নয়, বরং এটি সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত ও অস্থির। তাই অনেক হানাফি ফকিহ এটিকে মালে মুতাকাওয়িম হিসেবে স্বীকৃতি দেন না।

২. গারার (অনিশ্চয়তা) ও জুয়ার সংশ্লেষ

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে বলেন:

"বর্তমান ডিজিটাল কারেন্সি বা ক্রিপ্টোকারেন্সি শরীয়তের দৃষ্টিতে মুদ্রা বা মাল হিসেবে বিবেচিত নয়; এতে গারার ও জুয়ার উপাদান বিদ্যমান।" (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৬২৩-৬২৫)

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ সূরা আল-মায়িদার ৯০ নম্বর আয়াতের তাফসিরে বলেন:

"জুয়া ও অনিশ্চিত লেনদেন ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম।"

আল্লাহ তাআলা বলেন:

«يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ»

"হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণয়ের তীর—এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং এগুলো থেকে দূরে থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" (সূরা আল-মায়িদা: ৯০)

৩. মাইনিং ও এয়ারড্রপের প্রকৃতি

  • মাইনিং: এতে কম্পিউটারের প্রসেসিং পাওয়ার ব্যবহার করে অ্যালগরিদম সমাধান করা হয়। এতে কোনো বাস্তব পণ্য বা সেবার বিনিময় হয় না; বরং এটি একটি অনিশ্চিত প্রতিযোগিতা, যা জুয়ার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
  • এয়ারড্রপ ও টাস্ক কমপ্লিশন: এতে প্রকৃত কোনো শ্রম বা পণ্যের বিনিময় ছাড়াই "ফ্রি" টোকেন দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে স্পেকুলেটিভ মার্কেটে বিক্রি হয়। এতে গারার ও মাইসির (জুয়া) উপাদান রয়েছে।

ইমাম সারাখসি (রহ.) «আল-মাবসুত»-এ বলেন:

«الْغَرَرُ الَّذِي يُوجِبُ الْجَهْلَ بِالْمَعْقُودِ عَلَيْهِ يُفْسِدُ الْعَقْدَ»

অর্থ: "যে অনিশ্চয়তা চুক্তির বিষয়বস্তু সম্পর্কে অজ্ঞতা সৃষ্টি করে, তা চুক্তিকে বাতিল করে দেয়।" (আল-মাবসুত, খণ্ড ১৩, পৃ. ১৭)

৪. হানাফি ফকিহদের অভিমত

| ফকিহ | অভিমত | |------|--------| | মুফতি তাকি উসমানি | ক্রিপ্টোকারেন্সি শরীয়তসম্মত নয়; এ থেকে অর্জিত আয় হালাল নয়। | | মুফতি মুহাম্মদ শফি | অনিশ্চিত ও জুয়াসদৃশ লেনদেন হারাম। | | আশরাফ আলী থানভি (রহ.) | «বেহেশতী জেওর»-এ অনিশ্চিত ও প্রতারণামূলক আয়কে হারাম বলা হয়েছে। | | ইবনে আবিদিন (রহ.) | মালে মুতাকাওয়িমের শর্ত পূরণ না হলে তা থেকে আয় বৈধ নয়। |


বিশেষ সতর্কতা

  1. যদি কোনো ক্রিপ্টোকারেন্সি ভবিষ্যতে সরকারি স্বীকৃতি পায় এবং বাস্তব সম্পদ দ্বারা সমর্থিত হয়, তবে আলেমদের একটি অংশ তা বৈধ বলতে পারেন। তবে বর্তমানে প্রচলিত অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়।

  2. মাইনিং বা টাস্ক কমপ্লিশনের মাধ্যমে অর্জিত টোকেন বিক্রি করে প্রাপ্ত টাকা যদি অন্য কোনো বৈধ উৎসের সাথে মিশ্রিত না হয়, তবে তা সন্দেহজনক (শুভহা) এবং এহতিয়াত হলো তা পরিহার করা।

  3. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

«دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لَا يَرِيبُكَ»

"যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে, তা ছেড়ে দাও এবং যা সন্দেহমুক্ত তা গ্রহণ করো।" (তিরমিজি: ২৫১৮, নাসাঈ: ৫৭১১)


উপসংহার

**প্রশ্নে উল্লেখিত পদ্ধতিতে (মাইনিং, এয়ারড্রপ, ডেইলি টাস্ক) অর্জিত ক্রিপ্টোকারেন্সি বিক্রি করে প্রাপ্ত টাকা হালাল হওয়ার ব্যাপারে গুরুতর সন্দেহ রয়েছে। অনেকেই হারাম বলেছেন। ** বর্তমান প্রচলিত ক্রিপ্টোকারেন্সি শরীয়তসম্মত মুদ্রা বা মাল হিসেবে স্বীকৃত নয়; এতে গারার, জুয়া ও অনিশ্চয়তার উপাদান বিদ্যমান। তাই এহতিয়াত ও তাকওয়ার দাবি হলো এ ধরনের আয় থেকে বিরত থাকা

তবে যদি কেউ ইতিমধ্যে এমন আয় করে ফেলে, তবে তাওবা করবে এবং সেই অর্থ সদকা করে দেবে (যদি তা হারাম হয়)। আর যদি ভবিষ্যতে কোনো ক্রিপ্টোকারেন্সি সরকারি স্বীকৃতি পায় ও শরীয়তসম্মত শর্ত পূরণ করে, তবে আলেমদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.