পালিয়ে বিয়ে ও জোরপূর্বক তালাকের শরীয়ত বিধান।

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 5585
Questioner: Faisal Reza
Question Asked: 17 Sep 2026, 09:51 AM
Reviewed & Published: 17 Sep 2026, 11:45 AM
Views: 16
Tokens: 5,673
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

রাকিবের বয়স ২১ এবং রাহিমার বয়স ১৭ ছিল রাকিব ও রহিমা পালিয়ে বিয়ে করে, যখন বিয়ে হয় তখন রহিমা বাবা-মা উপস্থিত ছিলেন না তারা বিয়েতে রাজি ছিলেন না কিন্তু রহিমা তার নিজের ইচ্ছায় ছেলেকে বিয়ে করে অন্য লোক সে বিয়েতে সাক্ষী হিসেবে দুইজন পুরুষ একজন মহিলা থাকে তারপর দেনমোহর এক লক্ষ টাকা ধার্য করে সাক্ষীদের সামনে তিনবার কবুল বলে বিয়ে হয় তারপর বিয়ের সাত দিন পর মেয়েটির ইচ্ছায় ডিভোর্স পেপারে স্বাক্ষর নেওয়া হয় তারপর ছেলেটিকে আশেপাশের লোকজন মারধর করে ডিভোর্স পেপারে স্বাক্ষর নেয় ছেলেটির আনিচ্ছায় জোরপূর্বক মুখেও তালাক উচ্চারন করে নি। এখন বলেন কোরআন হাদিসের আলোকে বিয়ে হয়েছে কিনা এবং তালাক হয়েছে কিনা মেয়েটিকে গ্রহণ করতে পারবে কিনা আবার?

Answer

পুনরায় গ্রহণ: পালিয়ে বিয়ে ও জোরপূর্বক তালাকের বিধান

উত্তর সংক্ষেপে: প্রশ্নে বর্ণিত বিবরণ অনুযায়ী—

  1. বিয়ে (নিকাহ) সহীহ হয়েছে — কারণ মেয়েটি প্রাপ্তবয়স্কা (বালিগা) ছিল, তার নিজের ইচ্ছায় ইজাব-কবুল হয়েছে, দুজন পুরুষ ও একজন মহিলা সাক্ষী উপস্থিত ছিল, এবং দেনমোহর (এক লক্ষ টাকা) ধার্য হয়েছে।
  2. তালাক সংঘটিত হয়নি — কারণ ছেলেটি নিজের ইচ্ছায় তালাক উচ্চারণ করেনি; বরং আশেপাশের লোকেরা জোরপূর্বক মারধর করে ডিভোর্স পেপারে স্বাক্ষর নিয়েছে। জোরপূর্বক (ইকরাহ) অবস্থায় উচ্চারিত তালাক শরীয়তের দৃষ্টিতে কার্যকর হয় না
  3. মেয়েটিকে পুনরায় গ্রহণ করা যাবে — যেহেতু তালাকই হয়নি, তাই নিকাহ বহাল আছে; নতুন করে নিকাহ করারও প্রয়োজন নেই। তবে সামাজিকভাবে বিষয়টি পরিবার ও সমাজের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা উত্তম।

বিস্তারিত দলিলসহ আলোচনা

১. নিকাহ সহীহ হওয়ার শর্ত ও প্রমাণ

কুরআন:

"তোমরা তোমাদের মধ্যে অবিবাহিতদের বিবাহ দাও..." (সূরা আন-নূর: ৩২)

"তোমরা নারীদেরকে তাদের সম্পত্তি থেকে সন্তুষ্টচিত্তে দেনমোহর দাও..." (সূরা আন-নিসা: ৪)

হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে; কারণ তা দৃষ্টিকে সংযত রাখে ও লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে।" (সহীহ বুখারী: ৫০৬৫, সহীহ মুসলিম: ১৪০০)

হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে নিকাহর রুকন:

  • ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ)
  • দুজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা সাক্ষী (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৯)
  • দেনমোহর নির্ধারণ (সূরা নিসা: ৪)

বালিগা মেয়ের নিজের ইচ্ছায় বিয়ের বৈধতা: হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"বালিগা মেয়ের অনুমতি ছাড়া তার বিয়ে হয় না।" (সহীহ মুসলিম: ১৪১৯)

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"বালিগা মেয়ের বিষয়ে তার অভিভাবকের সাথে পরামর্শ করতে হবে, এবং তার অনুমতি নিতে হবে।" (সহীহ মুসলিম: ১৪২১)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত: প্রাপ্তবয়স্কা (বালিগা) মেয়ে নিজের ইচ্ছায় সমকক্ষ (কুফু) পুরুষের সাথে বিয়ে করতে পারে, অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াও। (আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃ. ১৯৬; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৫৫)

সিদ্ধান্ত: রাহিমা ১৭ বছর বয়সী বালিগা ছিল, নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করেছে, সাক্ষী ও দেনমোহরসহ নিকাহ সম্পন্ন হয়েছে — নিকাহ সহীহ ও বৈধ


২. জোরপূর্বক তালাকের বিধান

কুরআন:

"আল্লাহ কারো উপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।" (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)

"তোমাদের জন্য যা হারাম করা হয়েছে... তা ছাড়া; তবে কেউ বাধ্য হলে (অনিচ্ছায়) সীমা লঙ্ঘন না করে, তার কোনো গুনাহ নেই।" (সূরা আল-বাকারা: ১৭৩)

হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"নিশ্চয় আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং জোরপূর্বক কাজের (ইকরাহ) উপর (গুনাহ) উঠিয়ে নিয়েছেন।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪৩, সুনানে বায়হাকি)

হানাফি ফিকহ:

  • ইকরাহ (জোরপূর্বক) অবস্থায় তালাক কার্যকর হয় না। (আল-হিদায়া, খণ্ড ২, পৃ. ৩৫৯; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৩৭)
  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, জোরপূর্বক তালাক উচ্চারণ করলে তালাক পতিত হয় না। (শরহু মাআনিল আছার, খণ্ড ২, পৃ. ২৩)
  • ফতোয়া আলমগিরি: "যদি কেউ জোরপূর্বক তালাক উচ্চারণ করায়, তবে তা কার্যকর হবে না।" (ফতোয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৩৫৪)

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:

"জোরপূর্বক বা ভয়ভীতির কারণে উচ্চারিত তালাক শরীয়তের দৃষ্টিতে পতিত হয় না।" (ফতোয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩২৪)

সিদ্ধান্ত: ছেলেটি নিজের ইচ্ছায় তালাক দেয়নি; বরং মারধর করে জোরপূর্বক ডিভোর্স পেপারে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। তালাক সংঘটিত হয়নি।


৩. মেয়েটিকে পুনরায় গ্রহণ করা যাবে কি?

যেহেতু তালাকই হয়নি, তাই:

  • নিকাহ এখনও বহাল আছে — রাকিব ও রাহিমা এখনও স্বামী-স্ত্রী।
  • নতুন করে নিকাহ করার প্রয়োজন নেই — তবে সামাজিকভাবে সমঝোতা ও পরিবারের সম্মতি নিয়ে একসাথে থাকা উত্তম।
  • ইদ্দত পালনের প্রয়োজন নেই — কারণ তালাক হয়নি।
  • যদি কেউ সন্দেহ করে যে তালাক হয়েছে, তবে احتیاطاً (সতর্কতামূলক) নতুন করে নিকাহ করে নেওয়া যেতে পারে, তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়।

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন:

"জোরপূর্বক তালাক পতিত হয় না; সুতরাং নিকাহ বহাল থাকে এবং স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার জন্য নতুন নিকাহর প্রয়োজন নেই।" (মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড ১, পৃ. ৩৯৮)


৪. সামাজিক ও পারিবারিক দিক

  • পালিয়ে বিয়ে ইসলামে নিষিদ্ধ নয়, তবে অভিভাবকের অনুমতি নেওয়া উত্তম ও বরকতময়।
  • জোরপূর্বক মারধর ও ডিভোর্স পেপারে স্বাক্ষর নেওয়া — এটি জুলুম ও হারাম। কুরআনে বলা হয়েছে:

    "তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ গ্রাস করো না..." (সূরা আন-নিসা: ২৯)

  • পরিবারের সাথে সমঝোতা করে সংসার পরিচালনা করা উচিত।

চূড়ান্ত ফতোয়া

| বিষয় | বিধান | |------|--------| | নিকাহ সহীহ হয়েছে? | হ্যাঁ | | তালাক হয়েছে? | না | | মেয়েটিকে পুনরায় গ্রহণ করা যাবে? | হ্যাঁ, নিকাহ বহাল আছে | | নতুন নিকাহর প্রয়োজন? | না (তবে احتیاطاً করা যেতে পারে) | | ইদ্দত পালন করতে হবে? | না |

পরামর্শ: উভয় পরিবারের সাথে সমঝোতা করে সংসার পরিচালনা করুন। জোরপূর্বক তালাকের ঘটনাটি শরীয়তের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য এবং এটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে না। যদি ভবিষ্যতে তালাকের প্রয়োজন হয়, তবে শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে (ইচ্ছাকৃতভাবে, সাক্ষীসহ, ইদ্দতসহ) করতে হবে।

রেফারেন্স:

  • আল-কুরআন: সূরা আন-নূর ৩২, সূরা আন-নিসা ৪, ২৯, সূরা আল-বাকারা ২৮৬, ১৭৩
  • সহীহ বুখারী: ৫০৬৫
  • সহীহ মুসলিম: ১৪০০, ১৪১৯, ১৪২১
  • সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪৩
  • আল-হিদায়া: খণ্ড ১, পৃ. ১৯৬; খণ্ড ২, পৃ. ৩৫৯
  • রাদ্দুল মুহতার: খণ্ড ৩, পৃ. ৯, ৫৫, ২৩৭
  • ফতোয়া আলমগিরি: খণ্ড ১, পৃ. ৩৫৪
  • ফতোয়া উসমানি: খণ্ড ২, পৃ. ৩২৪
  • মাআরিফুল কুরআন: খণ্ড ১, পৃ. ৩৯৮
  • শরহু মাআনিল আছার: খণ্ড ২, পৃ. ২৩

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.