সাদাস্রাব বের হলে ওযু ভঙ্গ হয় কি? কাপড়ে লাগলে কাপড় কি পরিবর্তন করা জরুরি?
Taharah Purity · Hanafi
Question
Answer
সাদাস্রাব (মাজি/ওয়াদি) সম্পর্কে বিস্তারিত মাসআলা
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য, দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উপর।
১. সাদাস্রাব বের হলে ওজু ও কাপড়ের শরয়ী হুকুম এবং কেবল পানি ছিটিয়ে নেওয়ার মাসআলা:
- ওজু ভাঙার বিধান: সাদাস্রাব জরায়ুর ভেতর থেকে নির্গত হয়ে যখনই শরীরের অনাবৃত অংশ বা বাইরে বের হয়ে আসবে, তখনই শরীয়তের দৃষ্টিতে ওজু ভেঙে যাবে।
- কাপড়ে লাগলে মাফ বা ক্ষমাযোগ্য হওয়ার সীমা: কাপড়ে সাদাস্রাব লাগলে তার পরিমাণ যদি এক দিরহাম (হাতের তালুর চ্যাপ্টা গভীর অংশ বা প্রায় ১ টাকার ধাতব মুদ্রার সমপরিমাণ) বা তার চেয়ে কম জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা ক্ষমাযোগ্য। অর্থাৎ ঐ কাপড় পরে নামায আদায় করলেও নামায হয়ে যাবে। তবে এক দিরহামের চেয়ে বেশি জায়গা জুড়ে লেগে থাকলে তা ধুয়ে পবিত্র করা ফরয।
- হালকা পানি ছিটিয়ে নিলে কি পবিত্র হবে? না, কেবল হালকা পানি ছিটিয়ে নিলে কাপড় পবিত্র হয় না। নাপাক হওয়া অংশটি পানি দিয়ে ভালোভাবে ধৌত করে নাপাকী দূর করতে হবে। তবে পুরো পায়জামা ধোয়ার প্রয়োজন নেই, কেবল যতটুকু জায়গায় নাপাকী লেগেছে, ততটুকু অংশ ধুয়ে নিলেই পুরো পায়জামা পবিত্র হয়ে যাবে।
২. প্রতিবার পায়জামা পরিবর্তন করতে হবে কি? এবং বালতিতে ধোয়ার সঠিক নিয়ম:
- পায়জামা পরিবর্তন: প্রতিবার সাদাস্রাব হলে পুরো পায়জামা পরিবর্তন করা আবশ্যক নয়। যে স্থানে সাদাস্রাব লেগেছে, কেবল সেটুকু স্থান ধুয়ে নিলেই চলবে।
- বালতিতে ৩ বার ধোয়ার নিয়ম: কাপড়ের নাপাক অংশটি যদি বালতিতে ধোয়া হয়, তবে পৃথক ৩ বার পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুতে হবে এবং প্রতিবার ভালোভাবে নিংড়ে নিতে হবে। তবে আপনি যদি কল বা ট্যাপের প্রবহমান রানিং পানির নিচে নাপাক অংশটি রেখে ভালো করে ধুয়ে নেন এবং একবার নিংড়ে নেন, তাহলেও ৩ বার ধোয়ার শর্ত ছাড়াই একবারে কাপড় পবিত্র হয়ে যাবে।
৩. নামাযের মধ্যে সাদাস্রাব বের হওয়ার সন্দেহ বা মনে হলে করণীয়:
ইসলামি শরীয়তে কেবল অহেতুক সন্দেহ, কূচিন্তা বা ওয়াসওয়াসার কারণে ওজু কিংবা নামায বাতিল হয় না।
- নামায চলাকালীন অস্পষ্ট মনে হলে: নামাযের ভেতরে কেবল "মনে হচ্ছে বা সন্দেহ হচ্ছে" কিন্তু নিশ্চিত নন—এমন অবস্থায় নামায ভাঙা যাবে না, নামায চালিয়ে যেতে হবে।
- নামাযের পর যদি নিশ্চিত হন: নামায শেষ করার পর যদি পরীক্ষা করে সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত হন যে নামাযের ভেতরের সময়েই সাদাস্রাব বের হয়ে কাপড় ভিজে গেছে, তবে পুনরায় ওজু করে এবং নাপাক স্থানটি ধুয়ে কেবল ওই নামাযটি আদায় করে নেবেন।
- ৪ রাকাতের ভেতরে নাকি পরে বের হয়েছে—এ নিয়ে সংশয় থাকলে: ৪ রাকাতের ভেতরে বের হয়েছে নাকি পরে বের হয়েছে—এ নিয়ে যদি নিশ্চিত হতে না পারেন (সংশয় থেকে যায়), তবে আপনার নামায আদায় হয়ে গেছে ধরে নেওয়া হবে; নামায পুনরায় পড়তে হবে না। তবে পরবর্তী নামাযের জন্য ওজু করে নেবেন ।
৪. ইবাদত না থাকা অবস্থায় ঐ পায়জামা পরিধান করে রাখলে গোনাহ হবে কি?
না, গোনাহ হবে না।
নামায, কুরআন তিলাওয়াত বা অন্য কোনো ইবাদত—যার জন্য পবিত্রতা শর্ত, তা ছাড়া অন্য সাধারণ সময়ে কাপড়ে সাদাস্রাব বা নাপাকী লেগে থাকা অবস্থায় ঐ পায়জামা পরিধান করে থাকলে কোনো গোনাহ বা পাপ হয় না। শরীয়তে ইবাদতের সময় কাপড় ও শরীর পবিত্র রাখা ফরয, সাধারণ অবস্থায় নাপাক কাপড় পরে থাকা হারাম বা গোনাহ নয়। তবে পরিচ্ছন্নতার খাতিরে ধুয়ে ফেলা উত্তম।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৫৫–৫৬ (পঞ্চম পরিচ্ছেদ: ওজু ভঙ্গের কারণসমূহ — নাপাক বস্তু ও রুতুবাত/স্রাব নির্গত হওয়া)।
- পৃষ্ঠা: ১২৬–১২৭ (সপ্তম পরিচ্ছেদ: নাপাকী হতে পবিত্রকরণ সম্বলিত মাসায়েল)।
- পৃষ্ঠা: ১৩১ (নাজাসাতে গলীযা এক দিরহাম পরিমাণ ক্ষমাযোগ্য হওয়া ও তার অতিরিক্ত হলে ধোয়া ফরয হওয়া) ।
- পৃষ্ঠা: ১৬৩ (সালাতের শর্তাবলী — পোশাকের পবিত্রতার বিবরণ)।
- পৃষ্ঠা: ৩২০ (সালাতের মধ্যে সন্দেহের মাসায়েল)।
২. নূরুল ঈযাহ:
- পৃষ্ঠা: ৩১ (অনুচ্ছেদ: ওজু ভঙ্গের কারণসমূহ)।
- পৃষ্ঠা: ৪৯–৫১ (পরিচ্ছেদ: নাজাসাতের বর্ণনা ও নাজাসাত থেকে পবিত্রতা হাসিলের পন্থা)।
- পৃষ্ঠা: ৮৮ (অনুচ্ছেদ: নামাযের মধ্যে সন্দেহের বর্ণনা)।
৩. দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৮৫–৮৭ (অধ্যায়: তহারত — নাপাক কাপড় বালতিতে ও প্রবহমান পানিতে ধোয়ার শরয়ী নিয়ম)।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পবিত্রতা ও ইবাদতের সঠিক বিধান বোঝার তাওফিক দান করুন। আমিন।