ডিভোর্সি, বয়সী ও চেহারায় পছন্দ না হওয়া সত্ত্বেও দ্বীনদারির কারণে বিবাহ করা কি উচিত?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
হ্যাঁ তিনি আমাকে সর্বদিক থেকে সাপোর্ট দেয়ার কথা বলেছেন, যেমন আমার মূল টার্গেট ইলম শেখা। সে বলেছে প্রয়োজনে আমি টাকা দিয়ে আপনাকে হেল্প করব। এমনকি সে বিবাহের আগে তার জমানো টাকা আমাকে দিতে চেয়েছে যাতে করে আমার বিবাহ সহযোগিতায় কারণ আমার আর্থিক অবস্থা এখন ভালো না। সে একজন দ্বীনি ভাই হিসেবে সাহায্য করতে চেয়েছে। এবং বলেছে যে এটা আমার সাথে বিবাহ হোক অথবা অন্য কারো সাথে। আমি একজন মুসলিম ভাইয়ের বিবাহের সাহায্য করব যাতে করে সোয়াব পাই এমনটা বলেছে।
এখন সে যেহেতু ডিভোর্সি এবং আমার থেকে বেশ খাটো এবং আমার বয়সী আবার আমার সাইড থেকে দেখেই ভালো লাগেনি!
এরপরেও কি তাকে আমি বিবাহ করব?
Answer
বিবাহের প্রস্তাব: দ্বীন, আকর্ষণ ও সামাজিক চাপের ভারসাম্য
উত্তর সংক্ষেপে:
ইসলামে বিবাহের মূল ভিত্তি হলো—দ্বীনদারি, চরিত্র ও পারস্পরিক সম্মতি। রাসূল ﷺ বলেছেন, “চারটি গুণ দেখে নারীকে বিবাহ করা হয়… তুমি দ্বীনদারকে অগ্রাধিকার দাও।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫০৯০; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৪৬৬)। তবে শরীয়তে পাত্র-পাত্রীর পারস্পরিক পছন্দ ও আকর্ষণও বিবেচ্য। জোরপূর্বক বিবাহ ইসলামে নিষিদ্ধ। আপনার প্রশ্নে কয়েকটি দিক আছে—(১) দ্বীনদারি, (২) শারীরিক/চেহারার আকর্ষণ, (৩) ডিভোর্সি হওয়া, (৪) বয়স ও উচ্চতার পার্থক্য, (৫) সামাজিক কটূক্তি, (৬) আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব। নিচে প্রতিটি দিক শরীয়তের আলোকে আলোচনা করছি।
১. দ্বীনদারি ও চরিত্র: সবচেয়ে বড় মাপকাঠি
রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন:
«تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا، وَلِحَسَبِهَا، وَلِجَمَالِهَا، وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ» “নারীকে বিবাহ করা হয় চারটি কারণে—তার সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য ও দ্বীনদারির জন্য। তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও, অন্যথায় তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” — সহীহ বুখারী ৫০৯০; সহীহ মুসলিম ১৪৬৬
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, এই হাদীসে দ্বীনদারিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; কারণ দ্বীনদার স্ত্রী দ্বীন-দুনিয়া উভয় ক্ষেত্রে কল্যাণ বয়ে আনে। (শরহু সহীহ মুসলিম, খণ্ড ১০, পৃ. ৫১)
আপনি নিজেই স্বীকার করেছেন—তার দ্বীনি বোঝাপড়া ভালো, সে আপনাকে ইলম শেখায় সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এমনকি নিজের জমানো টাকা দিতে চেয়েছে। এটি অত্যন্ত মহৎ ও দ্বীনি চেতনার পরিচায়ক। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর নিকট বিবাহে কুফু (সমানতা) বিবেচ্য হলেও দ্বীনদারি সর্বোচ্চ মাপকাঠি। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃ. ১৪৭)
২. ডিভোর্সি হওয়া: কোনো বাধা নয়
শরীয়তে ডিভোর্সি নারীকে বিবাহ করা সম্পূর্ণ জায়েজ। রাসূল ﷺ-এর নিজেই একাধিক স্ত্রী ছিলেন যারা পূর্বে বিবাহিত ছিলেন। উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রা.) ও উম্মে হাবীবা (রা.) উভয়েই পূর্বে বিবাহিত ছিলেন। (সীরাত ইবনে হিশাম, খণ্ড ২)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
«وَأَنكِحُوا الْأَيَامَىٰ مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ» “তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত তাদের বিবাহ দাও…” — সূরা আন-নূর: ৩২
“আইয়ামা” শব্দটি অবিবাহিত ও পূর্বে বিবাহিত উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে। (তাফসীরে ইবনে কাসীর)
সুতরাং ডিভোর্সি হওয়া কোনো দোষ নয়; বরং সে দ্বীনদার হলে তা বরকতের কারণ হতে পারে।
৩. চেহারার আকর্ষণ ও পারস্পরিক পছন্দ
ইসলামে বিবাহে পাত্র-পাত্রীর পারস্পরিক দেখা ও পছন্দের অনুমতি রয়েছে। রাসূল ﷺ বলেন:
«إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمْ الْمَرْأَةَ فَإِنْ اسْتَطَاعَ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى مَا يَدْعُوهُ إِلَى نِكَاحِهَا فَلْيَفْعَلْ» “তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়, তখন যদি তার দিকে তাকানো সম্ভব হয় যা তাকে বিবাহে উৎসাহিত করবে, তবে সে যেন তা করে।” — সুনানে আবু দাউদ ২০৮২; মুসনাদে আহমাদ ১৪৪৭৯
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী, পাত্র-পাত্রী একে অপরকে দেখা মুস্তাহাব। (আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ)
কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: আপনি বলেছেন “দেখেই আমার সাইড পছন্দ হয়নি।” এটি একটি বৈধ অনুভূতি। ইসলামে জোরপূর্বক বিবাহ নেই। রাসূল ﷺ বলেন:
«لَا تُنْكَحُ الْبِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ، وَلَا الثَّيِّبُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ» “কুমারীকে তার সম্মতি ছাড়া বিবাহ দেওয়া যাবে না, আর বিবাহিত/ডিভোর্সিকে তার নির্দেশ ছাড়া নয়।” — সহীহ বুখারী ৫১৩৬; সহীহ মুসলিম ১৪১৯
তবে শুধু চেহারার সৌন্দর্য একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত নয়। ইমাম গাযালী (রহ.) বলেন, “চেহারার সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী; চরিত্র ও দ্বীনদারি স্থায়ী।” (ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, খণ্ড ২)
৪. বয়স ও উচ্চতার পার্থক্য
বয়স ও উচ্চতার পার্থক্য শরীয়তে কোনো বাধা নয়। রাসূল ﷺ-এর সাথে খাদীজা (রা.)-এর বয়সের পার্থক্য ছিল, আবার আয়েশা (রা.)-এর সাথেও বয়সের পার্থক্য ছিল। (সীরাত ইবনে হিশাম)
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন, কুফু (সমানতা) বিবেচ্য হলেও তা দ্বীন, চরিত্র ও সামাজিক মর্যাদায়; বয়স বা উচ্চতায় নয়। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, পৃ. ১৪৭)
৫. সামাজিক কটূক্তি ও জাহিলিয়াত
আপনি বলেছেন, সমাজ জাহিলিয়াতপূর্ণ, তাই কটূক্তি শুনতে হতে পারে। ইসলামে সামাজিক চাপের কারণে দ্বীনি সিদ্ধান্ত ত্যাগ করা উচিত নয়। আল্লাহ বলেন:
«وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ» “তুমি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না।” — সূরা আল-মায়িদা: ৪৮
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, “মানুষের নিন্দা-ভয় দ্বীনি সিদ্ধান্তে বাধা হওয়া উচিত নয়।” (মাজমু‘উল ফাতাওয়া)
তবে যদি সামাজিক চাপ এতটাই হয় যে আপনার বা তার দ্বীনি জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তা বিবেচনায় আনা যেতে পারে। মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন, “বিবাহে সামাজিক চাপ নয়, বরং দ্বীন ও চরিত্র প্রধান।” (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২)
৬. আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব
সে বলেছে—বিবাহের আগে জমানো টাকা দিতে চায়, যাতে আপনার বিবাহ সহজ হয়; এমনকি অন্য কারো সাথে বিবাহ হলেও সাহায্য করবে। এটি অত্যন্ত মহৎ ও দ্বীনি চেতনার পরিচায়ক। তবে বিবাহের আগে টাকা নেওয়া শরীয়তে জায়েজ হলেও সতর্কতা প্রয়োজন—যাতে পরে কোনো বিরোধ বা অপমানের কারণ না হয়। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন, “বিবাহের আগে সম্পদ আদান-প্রদান হলে তা হিবা হিসেবে গণ্য; তবে তা সাক্ষীসহ হওয়া উচিত।” (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫)
৭. তাহলে কি তাকে বিবাহ করবেন?
এখানে দুটি দিক বিবেচনা করুন:
(ক) যদি আপনি তাকে বিবাহ করেন:
- দ্বীনদারি ও চরিত্রের কারণে বরকত পাবেন।
- ইলম শেখায় সহযোগিতা পাবেন।
- ডিভোর্সি হওয়া কোনো দোষ নয়।
- তবে চেহারার আকর্ষণ না থাকলে দাম্পত্য জীবনে মানসিক অশান্তি হতে পারে। ইসলামে পারস্পরিক ভালোবাসা ও আকর্ষণ দাম্পত্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাসূল ﷺ বলেন: “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম।” (সুনানে তিরমিযী ৩৮৯৫)
- সামাজিক চাপ সহন করতে হবে।
(খ) যদি আপনি তাকে বিবাহ না করেন:
- এটি শরীয়তসম্মত; কারণ জোরপূর্বক বিবাহ নেই।
- তবে দ্বীনদারি ও চরিত্র উপেক্ষা করলে ক্ষতি হতে পারে।
- তার টাকা নেবেন না; কারণ বিবাহ না করলে তার টাকা নেওয়া অনুচিত। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন, “যে ব্যক্তি বিবাহের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তার জন্য প্রস্তাবকারীর সম্পদ গ্রহণ করা উচিত নয়।” (আল-হিদায়া)
৮. সিদ্ধান্তের জন্য শরীয়তসম্মত পদ্ধতি
১. ইস্তিখারা করুন—আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করুন।
২. পরিবারের সাথে পরামর্শ করুন—তবে তাদের চাপে নয়।
৩. তার সাথে সরাসরি কথা বলুন—আপনার অনুভূতি খোলাখুলি জানান।
৪. দ্বীনদারি ও চরিত্র সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন; চেহারা শুধু মাপকাঠি নয়।
৫. যদি মনে হয় যে চেহারার কারণে আপনি তাকে ভালোবাসতে পারবেন না, তাহলে বিবাহ করবেন না—কারণ এটি তার প্রতি জুলুম হবে।
৬. যদি মনে হয় যে দ্বীনদারি ও চরিত্রের কারণে আপনি তাকে ভালোবাসতে পারবেন, তাহলে বিবাহ করুন—সামাজিক চাপ আল্লাহর উপর ভরসা করে সহ্য করুন।
৯. চূড়ান্ত পরামর্শ
ইসলামে বিবাহ দ্বীন, চরিত্র ও পারস্পরিক সম্মতির উপর প্রতিষ্ঠিত। ডিভোর্সি হওয়া, বয়স বা উচ্চতার পার্থক্য কোনো বাধা নয়। তবে চেহারার আকর্ষণ দাম্পত্য জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনি আন্তরিকভাবে মনে করেন যে তাকে ভালোবাসতে পারবেন না, তাহলে বিবাহ করবেন না—এটি তার প্রতি ইনসাফ হবে। আর যদি মনে করেন যে দ্বীনদারি ও চরিত্রের কারণে ভালোবাসা তৈরি হতে পারে, তাহলে বিবাহ করুন—আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
«وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ» “হয়তো তোমরা কোনো বিষয় অপছন্দ করো, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।” — সূরা আল-বাকারা: ২১৬
মূল কথা:
- দ্বীনদারি ও চরিত্র সর্বোচ্চ।
- ডিভোর্সি হওয়া দোষ নয়।
- চেহারার আকর্ষণ গুরুত্বপূর্ণ, তবে একমাত্র মাপকাঠি নয়।
- সামাজিক চাপ সহনযোগ্য, তবে জোরপূর্বক নয়।
- ইস্তিখারা করুন, পরামর্শ করুন, সিদ্ধান্ত নিন।
আরবি দোয়া
«اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ بِعِلْمِكَ، وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ، وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيمِ» “হে আল্লাহ! আমি তোমার জ্ঞানের মাধ্যমে কল্যাণ প্রার্থনা করছি, তোমার কুদরতের মাধ্যমে সামর্থ্য চাইছি, এবং তোমার মহান অনুগ্রহ থেকে চাইছি।” — সহীহ বুখারী ১১৬৬
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া
প্রশ্ন: ডিভোর্সি, বয়সী, খাটো ও চেহারায় পছন্দ না হওয়া সত্ত্বেও দ্বীনদারির কারণে তাকে বিবাহ করা কি উচিত?
উত্তর:
শরীয়তে বিবাহের প্রধান মাপকাঠি দ্বীনদারি ও চরিত্র। ডিভোর্সি হওয়া, বয়স বা উচ্চতার পার্থক্য কোনো বাধা নয়। তবে পারস্পরিক আকর্ষণ ও সম্মতিও গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনি আন্তরিকভাবে তাকে ভালোবাসতে না পারেন, তাহলে বিবাহ না করা শরীয়তসম্মত; কারণ জোরপূর্বক বিবাহ ইসলামে নেই। আর যদি দ্বীনদারির কারণে ভালোবাসা তৈরি হতে পারে, তাহলে বিবাহ করা উত্তম। ইস্তিখারা করুন এবং পরিবারের সাথে পরামর্শ করুন। তার টাকা বিবাহের আগে নেবেন না। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
মারেফুল কুরআন ও ফাতাওয়া উসমানী থেকে উদ্ধৃতি
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন:
“বিবাহে দ্বীনদারি ও চরিত্র প্রধান; চেহারার সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী। তবে যদি পাত্র-পাত্রীর মধ্যে আকর্ষণ না থাকে, তাহলে দাম্পত্য জীবনে অশান্তি হতে পারে। তাই উভয় দিক বিবেচনা করা উচিত।”
— মা‘আরিফুল কুরআন, সূরা আন-নূর: ৩২-এর তাফসীর
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন:
“বিবাহে সামাজিক চাপ বা লোকের নিন্দা নয়, বরং দ্বীন ও চরিত্র বিবেচ্য। তবে পাত্র-পাত্রীর পারস্পরিক সম্মতি ছাড়া বিবাহ করা উচিত নয়।”
— ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২, পৃ. ৩২১