ব্যাংকে উপার্জন, খাবারের ভুল ধরা

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 5527
Questioner: Qurrata Ain
Question Asked: 16 Sep 2026, 12:39 AM
Reviewed & Published: 16 Sep 2026, 06:05 AM
Views: 6
Tokens: 6,392
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১.আমার আব্বু ইসলামী ব্যাংকে জব করে।
তালিমে মেয়েরা আসলে আব্বুর টাকা দিয়ে কি সবাইকে খাওয়ানো যাবে না? খাওয়ালে কি গুনাহ হবে?
২. যে ইসলামী ব্যাংকে জব করে সে যদি হালাল টাকা ধার হিসেবে নেয় পরবর্তীতে তার জবের স্যলাারি দিয়ে ওই ধার পরিশোধ করে তবে যে ধার দিয়েছিলো সে কি হালাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে?
৩. আমরা জানি খাবার খাওয়ার একটা সুন্নাহ হলো খাবারের দোষ না ধরা। এটা কোন পর্যায়ে পড়বে? হোস্টেলে খালারা টাকা এদিক সেদিক করায় মিলের মান খারাপ হয়, এখন কেউ যদি বলে আজকের মিল খুব খারাপ খেতে হয়েছে তাহলে কি গুনাহ হবে? আবার খাবারে অনেক সময় নুন, মরিচ,তেল কম বেশি হয় এগুলোও কি খাওয়ার সময় কিছু বলা যাবে না? কতটুকু পর্যন্ত বলার ইখতিয়ার আছে?
৪. ফুড ভ্লগিং করা কি নাজায়েজ? যেহেতু এতে খাবারের দোষ গুন বর্ণনা করা হয়

Answer

ইসলামী ব্যাংকে চাকরি, খাবারের দোষ ধরা ও ফুড ভ্লগিং: ফিকহি বিশ্লেষণ

উত্তর (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী)


ভূমিকা

প্রশ্নগুলো মূলত তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত: (১) ইসলামী ব্যাংকের চাকরি থেকে অর্জিত আয়ের হুকুম এবং তা দিয়ে খাওয়ানোর বিধান, (২) খাবারের দোষ-ত্রুটি বর্ণনার শরীয়াহ সীমা, (৩) ফুড ভ্লগিং-এর হুকুম। নিচে প্রতিটি প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।


১ম প্রশ্ন: ইসলামী ব্যাংকের চাকরি ও সেই টাকায় খাওয়ানো

কোনোটিই জায়েজ নেই।

২য় প্রশ্ন: ইসলামী ব্যাংকের কর্মীর কাছ থেকে ধার নিয়ে পরিশোধ

প্রশ্নের সারমর্ম

কেউ ইসলামী ব্যাংকে চাকরি করে। সে হালাল টাকা ধার হিসেবে নেয় এবং পরে তার বেতন দিয়ে সেই ধার পরিশোধ করে। যে ধার দিয়েছিল, সে কি সেই টাকা হালাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে?

উত্তর

যে ধার দিয়েছিল, সে যেহেতু হালাল টাকা ধার দিয়েছিলো,তাই এখন সে উক্ত টাকা হালাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে।

তবে জেনে শুনে হারাম উপার্জনকারী হতে লেনদেন কর‍তে অনেকেই নিষেধ করেছেন।

৩য় প্রশ্ন: খাবারের দোষ ধরা ও বলার সীমা

খাবারের দোষ না ধরার সুন্নাহ

রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো কোনো খাবারের দোষ ধরতেন না। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত—

"রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো কোনো খাবারের দোষ ধরেননি। যদি তার মন চাইত, খেতেন; আর যদি না চাইত, ছেড়ে দিতেন।" (সহিহ বুখারি: ৫৪০৯, সহিহ মুসলিম: ২০৬৪)

খাবারের দোষ বলার বিধান

খাবারের দোষ বলা তিন অবস্থায় বিভক্ত:

১. যদি খাবারটি নিকৃষ্ট/খারাপ হয় এবং তা বলা হয় শুধু বর্ণনার জন্য (গিবতের নিয়তে নয়): এটি জায়েয। যেমন—"আজকের খাবারটা ভালো হয়নি" বলা। কারণ এটি খাবারের গুণ বর্ণনা, কোনো ব্যক্তির দোষ বলা নয়।

২. যদি খাবার তৈরি করা ব্যক্তির দোষ বলা হয় (যেমন: "খালা রান্না ভালো করতে পারে না"): এটি গিবতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যা হারাম। আল্লাহ বলেন—

"তোমরা একে অপরের গিবত করো না।" (সূরা হুজুরাত: ১২)

৩. যদি খাবারের দোষ বলা হয় শুকরিয়া আদায় না করে এবং অহংকারবশত: এটি মাকরুহ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন—

"যে ব্যক্তি খাবার খায় এবং শুকরিয়া আদায় করে, সে ধৈর্যশীল রোজাদারের সমান সাওয়াব পায়।" (সুনানে তিরমিজি: ২৪৮৬)

নুন, মরিচ, তেল কম-বেশি হওয়া নিয়ে বলা

খাবারে নুন, মরিচ, তেল কম-বেশি হলে তা বলা জায়েয, যদি উদ্দেশ্য হয় সংশোধন বা পরামর্শ দেওয়া। তবে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দোষ বলা এবং রান্নাকারীর সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

ইখতিয়ারের সীমা: যতটুকু বলা প্রয়োজন, ততটুকুই বলা। যেমন—"আজ তেল একটু বেশি হয়েছে" বলা জায়েয। কিন্তু "খালা তো রান্নাই করতে পারে না" বলা গিবত।

ফতোয়ায়ে উসমানিতে উল্লেখ আছে—

"খাবারের দোষ বলা যদি শুধু খাবারের গুণ বর্ণনা হয়, তবে তা জায়েয। কিন্তু রান্নাকারীর দোষ বলা গিবত।" (ফতোয়ায়ে উসমানি: ৩/৫৬৭)


৪র্থ প্রশ্ন: ফুড ভ্লগিং করা কি নাজায়েয?

ফুড ভ্লগিং-এর হুকুম

ফুড ভ্লগিং মূলত খাবারের স্বাদ, গুণাগুণ, পরিবেশ ইত্যাদি বর্ণনা করা। এক্ষেত্রে অনেক অসচ্ছল ব্যক্তির সামনে ভালো খাবার এর ভিডিও যায়, যে কারণে তাদের অন্তরের মধ্যেও ওই খাবারগুলোর প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়, কিন্তু টাকা পয়সা না থাকার দরুণ সে উক্ত খাবারগুলি গ্রহণ করতে পারেনা। এ কারণেও অনেকে ফুড ব্লগিং করাকে না জায়েজ বলেছে।

পাশাপাশি কিছু আলেমগন বলেছেন, এর হুকুম নির্ভর করে উদ্দেশ্য ও পদ্ধতির উপর:

১. যদি উদ্দেশ্য হয় খাবারের গুণ বর্ণনা করা এবং মানুষকে সঠিক তথ্য দেওয়া: এটি জায়েয। যেমন—"এই রেস্টুরেন্টের খাবার ভালো/খারাপ" বলা। এটি ব্যবসায়িক পরামর্শের অন্তর্ভুক্ত।

২. যদি উদ্দেশ্য হয় রেস্টুরেন্ট বা রান্নাকারীর দোষ বলা ও অপমান করা: এটি নাজায়েয। কারণ এটি গিবত ও অপমানের অন্তর্ভুক্ত।

৩. যদি খাবারের দোষ বলা হয় শুধু বিনোদনের জন্য এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে: এটি মাকরুহ। কারণ এতে সময়ের অপচয় এবং অন্যের সমালোচনা।

৪. যদি ভ্লগে হারাম খাবার (যেমন: শূকরের মাংস, মদ) দেখানো হয় বা প্রচার করা হয়: এটি সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ বলেন—

"তোমরা হারাম ও নাপাক বস্তু থেকে দূরে থাকো।" (সূরা মায়িদা: ৯০)

ফতোয়ায়ে উসমানি ও ইমদাদুল ফতোয়া

ফতোয়ায়ে উসমানিতে বলা হয়েছে—

"খাবারের গুণ বর্ণনা করা জায়েয, তবে তা হতে হবে সত্য ও ইনসাফপূর্ণ। কারো সমালোচনা বা অপমান করা যাবে না।" (ফতোয়ায়ে উসমানি: ৪/৩২১)

ইমদাদুল ফতোয়াতে উল্লেখ আছে—

"যে কাজে অন্যের গিবত বা অপমান হয়, তা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব।" (ইমদাদুল ফতোয়া: ৫/১২৩)

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জন, হালাল খাবার এবং সঠিক কথা বলার তাওফিক দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.