একজন সহকর্মীর কুফরি-বাক্যে ভুলবশত সম্মতি জানালে ঈমান যায় কি না?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: "আমার ঈমান কি চলে গেছে?"
সংক্ষিপ্ত উত্তর
না, আপনার ঈমান চলে যায়নি।
বিস্তারিত আলোচনা
১. ঈমান ভঙ্গের মূলনীতি (হানাফি ফিকহ)
কুফরি বা ঈমান ভঙ্গের জন্য শর্ত হলো:
- জ্ঞান (علم): ব্যক্তি জানে যে এটি কুফরি।
- ইচ্ছা (قصد): সে ইচ্ছাকৃতভাবে তা বলে বা করে।
- বিশ্বাস (اعتقاد): অন্তরে তা বিশ্বাস করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُم بِهِ وَلَٰكِن مَّا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ "তোমরা যে ভুল করেছ, তাতে তোমাদের কোনো অপরাধ নেই; কিন্তু যা তোমাদের অন্তর ইচ্ছা করেছে (তাতে আছে)।" — সূরা আল-আহযাব: ৫
আরও ইরশাদ হয়েছে:
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا "হে আমাদের রব! আমরা ভুলে গেলে বা ভুল করলে আমাদের পাকড়াও করবেন না।" — সূরা আল-বাকারা: ২৮৬
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং জবরদস্তিমূলক কাজ ক্ষমা করে দিয়েছেন।" — সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪৫; সহীহ ইবনে হিব্বান
২. হানাফি কিতাবের বক্তব্য
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:
"কুফরির হুকুম তখনই আরোপিত হয়, যখন ব্যক্তি তা ইচ্ছাকৃতভাবে ও জেনে-বুঝে বলে। আর যদি ভুলবশত বা না জেনে বলে, তবে কুফরি হয় না।" — রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল জিহাদ, খণ্ড ৪, পৃ. ২২৪-২২৫
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:
"যদি কেউ ভুলবশত কুফরি-বাক্য বলে, তবে তার ঈমান বাকি থাকে; কারণ কুফরির জন্য ইচ্ছা শর্ত।" — ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ২, পৃ. ২৬০
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে বলেন:
"কুফরির হুকুম তখনই হয়, যখন ব্যক্তি তা বিশ্বাস করে বা ইচ্ছাকৃতভাবে বলে। আর যদি কেউ না জেনে বা ভুলে বলে ফেলে, তবে ঈমান বাতিল হয় না।" — ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ১৪২
৩. আপনার ঘটনার বিশ্লেষণ
আপনার ঘটনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে:
- আপনি হঠাৎ করে সম্মতি জানিয়েছিলেন — অর্থাৎ পূর্বপরিকল্পনা বা ইচ্ছাকৃত কুফরি বিশ্বাস ছিল না।
- আপনি পরে বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়েছেন — এটি প্রমাণ করে আপনার অন্তরে ঈমান জীবিত ছিল।
- আপনি আল্লাহর কাছে তওবা করেছেন — তওবা ঈমানের সুরক্ষা ও পুনরুজ্জীবনের সর্বোত্তম উপায়।
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ উল্লেখ করেন:
"যে ব্যক্তি ভুলবশত কুফরি-বাক্য বলে ফেলে, তার জন্য তওবা করাই যথেষ্ট; তাকে নতুন করে ঈমান আনতে হবে না, বরং তওবা করলে ঈমান আগের মতোই বহাল থাকে।" — মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড ৭, পৃ. ২৪৫ (সূরা আহযাবের তাফসির)
৪. তবে সতর্কতা
যদিও আপনার ঈমান যায়নি, তবু ভবিষ্যতে এমন কথা থেকে বিরত থাকা জরুরি। কুফরি-বাক্য নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করাও ঈমানের জন্য বিপদ। আল্লাহ বলেন:
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ۚ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ "যদি আপনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, তারা বলবে: আমরা তো কেবল গল্প-গুজব ও খেল-তামাশা করছিলাম। বলুন: আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে কি তোমরা ঠাট্টা করছিলে?" — সূরা আত-তাওবা: ৬৫
তাই ভবিষ্যতে এমন কথায় সম্মতি জানানো বা হালকাভাবে নেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
করণীয়
- তওবা করুন — আপনি ইতিমধ্যে করেছেন; আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যতে এমন কথা না বলার দৃঢ় সংকল্প করুন।
- ঈমানের কালিমা পড়ুন — "আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু"।
- নেক আমল বাড়ান — নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির-আযকার।
- সহকর্মীর সাথে সতর্ক থাকুন — তার কথায় সম্মতি জানাবেন না; প্রয়োজনে তার ভুল বোঝানোর চেষ্টা করুন।
- আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন — তিনি তাওবাকারীদের ক্ষমা করেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও ভালোবাসেন।" — সূরা আল-বাকারা: ২২২
উপসংহার
আপনার ঈমান চলে যায়নি। আপনি ভুলবশত সম্মতি জানিয়েছিলেন, যা কুফরি হিসেবে গণ্য হয় না। আপনার তওবা গৃহীত হয়েছে ইনশাআল্লাহ। ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন এবং আল্লাহর কাছে দৃঢ়ভাবে ঈমানের উপর অবিচল থাকার দোয়া করুন।
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ "হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর অবিচল রাখুন।" — সুনানে তিরমিজি: ৩৫২২