সূরা আহযাবের ৩৩ নম্বর আয়াতের বিধান কি কেবল নবী-পরিবারের জন্যই খাস?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
কুরআনের আয়াত "তোমরা গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করবে-মূর্খতা যুগের অনুরূপ নিজেদেরকে প্রদর্শন করবে না। নামায কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে। হে নবী পরিবারের সদস্যবর্গ। আল্লাহ কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পূত-পবিত্র রাখতে।"(সূরা আহযাব-৩৩)
অনেকেই এটি নিয়ে ব্যাখ্যা দেন যে, এ আয়াতে গৃহাভ্যন্তরে অবস্থানের বিষয়টি শুধু নবী পরিবারের জন্য। অন্যান্য সাধারণ নারীদের জন্য নয়। অন্যান্য নারীদের গৃহে অবস্থানের অতোটা কঠোরতা দেয়া হয়নি। এটা কতটুকু ঠিক?এ ব্যাপারে যদি একটু বিস্তারিত জানাতেন।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর: প্রশ্নে উল্লিখিত দাবিটি সঠিক নয়। সূরা আহযাবের ৩৩ নম্বর আয়াতের প্রথম অংশ—"তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান করো"—যদিও সরাসরি নবী-পরিবারের (আহলে বাইত) মহিলাদেরকে সম্বোধন করে নাজিল হয়েছে, তবে এর বিধান কেবল নবী-পরিবারের জন্যই খাস নয়; বরং সাধারণ মুসলিম নারীদের জন্যও এ বিধান প্রযোজ্য। কারণ আহলে বাইতের ফযীলত ও মর্যাদা আলাদা, কিন্তু শরীয়তের সাধারণ বিধানগুলোতে তারা অনুসরণীয় আদর্শ; তাদের প্রতি সম্বোধন করে বলা বিধান সাধারণ উম্মতের জন্যও প্রযোজ্য হয়, যদি না কোনো দলিল দ্বারা তা খাস প্রমাণিত হয়।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
১. আয়াতের শানে নুযূল ও সম্বোধনের ধরন:
সূরা আহযাব ৩৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ
"তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করো এবং প্রাচীন জাহেলি যুগের মতো নিজেদেরকে প্রদর্শন করো না।"
এখানে সম্বোধন নবী-পত্নীদেরকে করা হয়েছে। কিন্তু এ আয়াতের পূর্বে ৩০-৩১ নম্বর আয়াতে এবং পরে ৩৪ নম্বর আয়াতে আহলে বাইতের মর্যাদা ও ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। এতে বোঝা যায়, আহলে বাইতের প্রতি সম্বোধন করে বলা বিধানগুলো সাধারণভাবে উম্মতের জন্য আদর্শ ও অনুসরণীয়।
২. হাদীসের দলিল:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
فَاطِمَةُ بَضْعَةٌ مِنِّي، فَمَنْ أَغْضَبَهَا أَغْضَبَنِي
"ফাতিমা (রা.) আমার দেহের অংশ; যে তাকে রাগান্বিত করল, সে আমাকেই রাগান্বিত করল।" (সহীহ বুখারী: ৩৭১৪, সহীহ মুসলিম: ২৪৪৯)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
أَنَا مِنْ أَهْلِ الْبَيْتِ... (হাদীসে কিসা)
তবে আহলে বাইতের প্রতি সম্বোধন করা বিধান সাধারণ উম্মতের জন্য প্রযোজ্য হওয়ার মূলনীতি হলো: "আহলে বাইতের প্রতি খিতাব সাধারণত উম্মতের জন্যও বিধান হিসেবে গণ্য হয়, যদি না খাস হওয়ার দলিল থাকে।" (উসূলুল ফিকহ)
৩. ফকীহগণের অভিমত:
-
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.), ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, নারীর জন্য ঘরে অবস্থান করা সুন্নত ও কর্তব্য; বিশেষত ফিতনার সময়ে ঘরে অবস্থান করা ওয়াজিব হয়ে যায়।
-
আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে বলেন:
"নারীর জন্য ঘরে অবস্থান করা উত্তম; কারণ এতে ফিতনা থেকে হেফাজত হয়। তবে প্রয়োজনে শরীয়তের সীমা রক্ষা করে বাইরে যাওয়ার অনুমতি আছে।" (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৫০)
- মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) "মা'আরিফুল কুরআন"-এ সূরা আহযাব ৩৩ আয়াতের তাফসীরে লেখেন:
"এ আয়াতে নবী-পত্নীদেরকে সম্বোধন করা হলেও এর বিধান সাধারণ মুসলিম নারীদের জন্যও প্রযোজ্য। কারণ আহলে বাইতের প্রতি সম্বোধন উম্মতের জন্য অনুসরণীয়।" (মা'আরিফুল কুরআন: ৭/১৪৫)
- মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানী" গ্রন্থে বলেন:
"নারীর জন্য ঘরে অবস্থান করা ও পর্দা রক্ষা করা ইসলামের মূল শিক্ষা। সূরা আহযাবের আয়াতটি আহলে বাইতকে সম্বোধন করে নাজিল হলেও এর বিধান সাধারণ নারীদের জন্যও প্রযোজ্য।" (ফাতাওয়া উসমানী: ৩/৪০৫)
৪. সাধারণ নারীদের জন্য বিধান:
সূরা নূর ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তা'আলা সাধারণ মুসলিম নারীদেরকে সম্বোধন করে বলেন:
وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا
"মুমিন নারীদেরকে বলো, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে, লজ্জাস্থান হেফাজত করবে এবং নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করবে না।"
এ আয়াতে সাধারণ নারীদের জন্যও পর্দা ও ঘরে অবস্থানের বিধান দেওয়া হয়েছে। সুতরাং সূরা আহযাবের আয়াতটি কেবল আহলে বাইতের জন্য খাস নয়।
৫. ফিকহী মূলনীতি:
ফকীহগণের মধ্যে একটি মূলনীতি রয়েছে:
"الْخِطَابُ بِخِطَابِ الْأَهْلِ يَكُونُ عَامًّا لِلْأُمَّةِ إِلَّا إِذَا دَلَّ الدَّلِيلُ عَلَى الْخُصُوصِ"
"আহলে বাইতের প্রতি সম্বোধন সাধারণত উম্মতের জন্যও عام হয়, যদি না খাস হওয়ার দলিল থাকে।"
সুতরাং সূরা আহযাবের আয়াতটি আহলে বাইতের প্রতি সম্বোধন হলেও এর বিধান সাধারণ মুসলিম নারীদের জন্যও প্রযোজ্য।
উপসংহার:
প্রশ্নে উল্লিখিত দাবিটি সঠিক নয়। সূরা আহযাবের ৩৩ নম্বর আয়াতের বিধান কেবল নবী-পরিবারের জন্যই খাস নয়; বরং সাধারণ মুসলিম নারীদের জন্যও প্রযোজ্য। তবে আহলে বাইতের মর্যাদা ও ফযীলত আলাদা। সাধারণ নারীদের জন্যও ঘরে অবস্থান করা, পর্দা রক্ষা করা ও ফিতনা থেকে বেঁচে থাকা ইসলামের মূল শিক্ষা। প্রয়োজনে শরীয়তের সীমা রক্ষা করে বাইরে যাওয়ার অনুমতি আছে।
والله أعلم بالصواب