স্বপ্নে মৃত ব্যক্তি থেকে নবীর সালাম

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5379
Questioner: Muhammad Ashraf
Question Asked: 13 Sep 2026, 01:40 AM
Reviewed & Published: 13 Sep 2026, 03:10 AM
Views: 24
Tokens: 4,931
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমতুল্লাহ,
আমার বড় বোন গতকাল একটি স্বপ্ন দেখে। সে দেখে -
" কিছু কবর বড় এবং ছোট। হঠাৎ কবর থেকে জীবিত মানুষ (ছোট কবর থেকে বাচ্চা) বের হয় এবং তার কাছে জড়ো হয়। সে ঘাবড়ে গিয়ে ঘরের ভেতর চলে যায়। তারা তাকে বলে নবী আপনাকে সালাম দিয়েছেন। তারা ইসা নবীর কথা ইঙ্গিত করে। তারপর একটি বাচ্চা তাকে পানি দেয় এবং বলে, "এটা আপনার জন্য নবীর পক্ষ থেকে"। সে পানি পান করে অদ্ভুত তৃপ্ত স্বাদ পায়।"
তারপর তার ঘুম ভেঙ্গে যায়।

প্রিয় উস্তায এই স্বপ্নের অর্থ কি হতে পারে এবং কি আমল গ্রহণ করা জরুরি জানাবেন।
জাযাকাল্লাহু খাইরান।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্ন: আমার বড় বোন একটি স্বপ্ন দেখেছেন: কিছু ছোট-বড় কবর দেখলেন, হঠাৎ একটি ছোট কবর থেকে একটি জীবিত শিশু বের হয়ে তাঁর কাছে এলো, তিনি ভয় পেয়ে ঘরে চলে গেলেন। লোকেরা বলল, "নবী (সা.) আপনাকে সালাম দিয়েছেন," এবং ঈসা (আ.)-এর প্রতি ইঙ্গিত করল। এরপর একটি শিশু তাঁকে পানি দিয়ে বলল, "এটি আপনার জন্য নবীর পক্ষ থেকে।" তিনি পানি পান করে অদ্ভুত তৃপ্তি ও মধুর স্বাদ পেলেন। এরপর ঘুম ভেঙে গেল। এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা কী এবং কী আমল করা উচিত?

উত্তর:

بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد:

প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি মনে রাখা দরকার: স্বপ্ন শরীয়তের দলীল নয়। স্বপ্নের ভিত্তিতে কোনো হুকুম সাব্যস্ত হয় না, কোনো ইবাদত নির্ধারিত হয় না, আর কোনো অদৃশ্য বিষয়ের বিশ্বাস স্থাপনও করা যায় না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

«الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللهِ، وَالرُّؤْيَا مِنَ الشَّيْطَانِ» — সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৯৮৭

অর্থাৎ ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, আর খারাপ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে। তবে ভালো স্বপ্নও কেবল সুসংবাদ বা সান্ত্বনার বিষয়; তা থেকে কোনো নতুন বিধান বা আকীদা গঠন করা হয় না।

আপনার বোনের স্বপ্নের বিষয়ে:

১. স্বপ্নে নবী (সা.)-কে দেখা বা নবীর সালাম পাওয়া: ফুকাহায়ে কেরাম ও মুহাদ্দিসীনে কেরামের স্পষ্ট বক্তব্য হলো—স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দেখা সম্ভব এবং তা সত্য হতে পারে; কারণ শয়তান নবীর শাকল/আকৃতিতে আসতে পারে না (সহীহ বুখারী, হাদীস ১১০)। কিন্তু স্বপ্নে কেউ নবী (সা.)-কে দেখেছেন বলে দাবি করা এবং তা থেকে কোনো হুকুম বা বিশেষ মর্যাদা সাব্যস্ত করা শরীয়তে গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন, স্বপ্নে নবী (সা.)-কে দেখা সত্য, তবে তা কেবল ব্যক্তিগত সান্ত্বনা; এর ভিত্তিতে দ্বীনি বিধান পরিবর্তন বা সংযোজন করা যায় না।

২. স্বপ্নে ঈসা (আ.)-এর প্রতি ইঙ্গিত: এটি কেবল স্বপ্নের দৃশ্যপট; এর কোনো শরীয়তসম্মত তাৎপর্য নেই যা থেকে বিশেষ আমল বা বিশ্বাস নেওয়া যাবে। ঈসা (আ.) আল্লাহর নবী, তিনি জীবিত আছেন এবং কিয়ামতের পূর্বে অবতরণ করবেন—এটি কুরআন-হাদীস দ্বারা প্রমাণিত (সূরা নিসা: ১৫৭-১৫৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৫৫)। কিন্তু স্বপ্নের এই দৃশ্যের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

৩. স্বপ্নে পানি পান করা ও মধুর স্বাদ: স্বপ্নে পানি পান করা সাধারণত কল্যাণ, রিযিক, জ্ঞান ও ঈমানের প্রশান্তির ইঙ্গিত হতে পারে (ইবনে সীরীন, «তাফসীরুল আহলাম»; ইমাম নাবুলসী, «তাতীরুল আনাম»-এ উল্লেখিত)। তবে এটি কেবল সম্ভাব্য ব্যাখ্যা, নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। আর "নবীর পক্ষ থেকে পানি" বলে স্বপ্নে বলা—এটি স্বপ্নের ভাষা; এর দ্বারা কোনো বাস্তব হুকুম বা বিশেষ ইবাদত প্রমাণিত হয় না।

সারকথা: এই স্বপ্নটি একটি ভালো ও সান্ত্বনাদায়ক স্বপ্ন হিসেবে গ্রহণ করা যায়, কিন্তু এর পেছনে কোনো গোপন বার্তা, বিশেষ ইবাদত বা অদৃশ্য নির্দেশ আছে বলে বিশ্বাস করা ঠিক নয়। স্বপ্নকে কেন্দ্র করে ভয় পাওয়া, দুশ্চিন্তা করা বা বিশেষ আমল আবিষ্কার করা শরীয়তে নেই।

করণীয় আমল:

১. আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন—ভালো স্বপ্ন দেখলে «الحمد لله» বলা এবং আল্লাহর প্রশংসা করা সুন্নত (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬২)।

২. স্বপ্নটি কারও কাছে বর্ণনা করা: ভালো স্বপ্ন শুধু প্রিয় ও নেককার ব্যক্তির কাছে বর্ণনা করা সুন্নত; সাধারণ মানুষের কাছে ছড়ানো বা আলোচনা করা উচিত নয় (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬৩)।

৩. নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামায, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির-আযকার ও দরুদ শরীফ পাঠ অব্যাহত রাখুন। বিশেষ করে সকাল-সন্ধ্যা মাসনূন যিকির ও আয়াতুল কুরসী পাঠ করা।

৪. স্বপ্নকে কেন্দ্র করে কোনো নতুন আমল, মান্নত বা বিশেষ ইবাদত নির্ধারণ করবেন না। দ্বীনের সব আমল কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত হতে হবে।

৫. যদি স্বপ্নটি বারবার দেখা যায় বা মনে অস্থিরতা সৃষ্টি করে, তাহলে ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসী, সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়ে তিনবার ফুঁ দিয়ে শরীরে বুলিয়ে নিন এবং ডান কাত হয়ে ঘুমান—এটি সুন্নত (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫০১০)।

৬. ভয় বা দুশ্চিন্তা থাকলে «أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ» পাঠ করুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।

৭. স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে অতিরিক্ত মাথা ঘামাবেন না। ইমাম ইবনে সীরীন (রহ.) নিজেই বলতেন, স্বপ্নের ব্যাখ্যা কেবল সম্ভাবনা; নিশ্চিত জ্ঞান নয়। তাই স্বপ্নকে জীবনের সিদ্ধান্তের ভিত্তি বানানো উচিত নয়।

উপসংহার: আপনার বোনের স্বপ্নটি একটি সুন্দর ও সান্ত্বনাদায়ক স্বপ্ন; এতে ভয় বা দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন, নিয়মিত ইবাদত-বন্দেগি চালিয়ে যান, এবং স্বপ্নকে কেন্দ্র করে কোনো বিশেষ আমল বা বিশ্বাস তৈরি করবেন না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথে রাখুন। আমীন।

والله أعلم بالصواب


📌 রেফারেন্স:

  • সহীহ বুখারী, হাদীস ১১০, ৬৯৮৭, ৫০১০
  • সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬২, ২২৬৩, ১৫৫
  • সূরা নিসা: ১৫৭-১৫৮
  • ইবনে আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, পৃ. ৫৭০ (স্বপ্ন ও রু'ইয়া প্রসঙ্গে)
  • ইবনে সীরীন, তাফসীরুল আহলাম
  • ইমাম নাবুলসী, তাতীরুল আনাম ফী তাফসীরিল আহলাম
  • মুফতি তাকি উসমানি, ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৪ (স্বপ্ন ও রু'ইয়া সংক্রান্ত অধ্যায়)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.