চাকরিক্ষেত্রে ভিডিও এডিট এ মিউজিকের ব্যবহার প্রসঙ্গে
Halal and Haram · Hanafi
Question
১। আমি পাঞ্জাবী পায়জামা পরিধান করি, কিন্তু ঐ কোম্পানিতে জয়েন করলে ডিউটি টাইমে ইউনিফর্ম পরতে হবে জানিয়েছে, কোম্পানির নির্ধারিত শার্ট প্যান্ট দেয়া হবে।
২। অনেক রকম কাজের মধ্যে একটা হলো- মাঝে মাঝে কিছু ভিডিও এডিট করতে হবে, যদিও অনিয়মিত। ভিডিওতে মূলত ফ্যাক্টরির বিভিন্ন কাজকর্ম, মিটিং এগুলো দেখানো হয়। তাদের কোম্পানির একটা স্যাম্পল ভিডিও দেখিয়েছে আমাকে। কোনো নারী নেই ভিডিওতে, এবং ভবিষ্যতে আসবেও না এটা জানিয়েছে।
তবে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক/সাউন্ড ব্যবহার করতে হবে ভিডিওতে। গান ব্যবহার করে না তারা, তবে সাধারণ মিউজিক/সাউন্ড ব্যবহার করে থাকে।
আমার প্রশ্ন হলো, আমি কি উক্ত ২ শর্ত মেনে নিয়ে কোম্পনিতে জয়েন করতে পারবো নাকি এসকল শর্তে রাজি হওয়া জায়েজ হবে না?
মিউজিকের শর্ত মেনে নিলে কি ইনকাম হারাম হবে?
উল্লেখ্য, আমি প্রায় এক বছর যাবত বেকার, পরিবার আছে, বিবাহিত।
Answer
চাকরিক্ষেত্রে ভিডিও এডিট ও মিউজিকের ব্যবহার প্রসঙ্গে
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের দুটি দিক রয়েছে। নিচে ধারাবাহিকভাবে ফিকহি বিধান ও সমাধান পেশ করা হলো।
প্রথম সমস্যা: ইউনিফর্ম (শার্ট-প্যান্ট) পরিধান
বিধান:
এটি যেহেতু প্রয়োজন বশত, সুতরাং ঢিলেঢালা হলে তাহলে তা পরিধান করা জায়েজ।
দলিল:
-
আল্লাহ তাআলা বলেন:
«يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ»
(সূরা আল-আরাফ: ৩১)
অর্থ: "হে আদম সন্তান! প্রত্যেক নামাজের সময় তোমরা তোমাদের সৌন্দর্য (পোশাক) গ্রহণ করো।" -
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لَا يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَى مَنْ يَجُرُّ ثَوْبَهُ خُيَلَاءَ»
(সহিহ বুখারি: ৫৭৮৮)
অর্থ: "যে ব্যক্তি অহংকারবশত কাপড় ঝুলিয়ে টানে, আল্লাহ তার দিকে তাকাবেন না।"
ফতোয়া:
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন—
"কাফিরদের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পোশাক পরিধান করা মাকরূহ তাহরিমি, তবে সাধারণ শার্ট-প্যান্ট যদি কাফিরদের ধর্মীয় প্রতীক না হয়, তাহলে তা জায়েজ।"
(রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৫০)
দ্বিতীয় সমস্যা: ভিডিও এডিটে মিউজিক/সাউন্ড ব্যবহার
বিধান:
বাদ্যযন্ত্র ও মিউজিক ইসলামে হারাম।
দলিল:
-
আল্লাহ তাআলা বলেন:
«وَمِنَ النَّاسِ مَن يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّهِ»
(সূরা লুকমান: ৬)
ইবনে মাসউদ (রা.) ও ইবনে আব্বাস (রা.) «لَهْوَ الْحَدِيثِ»-এর তাফসিরে বলেছেন: "এটি হলো গান ও বাদ্যযন্ত্র।"
(তাফসিরে ইবনে কাসির: ৬/৩৩২) -
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّونَ الْحِرَ وَالْحَرِيرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ»
(সুনানে আবু দাউদ: ৪০৩৯)
অর্থ: "আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোক আসবে যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।" -
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন:
"বাদ্যযন্ত্র ও গান ফাসিকদের কাজ।"
(আল-হিদায়া: ৪/৪৪১)
২. ভিডিও এডিটে মিউজিক ব্যবহারের বিধান:
যদি কোম্পানি বাদ্যযন্ত্রের সুর (musical instrument) ব্যবহার করতে বলে, তাহলে তা হারাম কাজে সহযোগিতা হবে।
দলিল:
-
আল্লাহ তাআলা বলেন:
«وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ»
(সূরা আল-মায়িদা: ২)
অর্থ: "তোমরা নেক কাজ ও তাকওয়ায় সহযোগিতা করো, আর গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।" -
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হারাম, যদিও তা পরোক্ষ হয়।"
(রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৯১)
৩. ইনকাম হারাম হবে কি?
- যদি আপনার কাজের সিংহভাগ হালাল হয় এবং মিউজিক সংযোজন অনিয়মিত ও সামান্য হয়, তাহলে পুরো বেতন হারাম হবে না; বরং মিউজিক সংযোজনের অংশটুকু গুনাহ হবে।
- তবে যদি কাজের মূল দায়িত্বই মিউজিকসহ ভিডিও এডিট হয়, তাহলে সেই কাজের বেতন হারাম হবে।
ফতোয়া:
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফতোয়ায়ে উসমানি»-তে বলেন:
"যদি কোনো ব্যক্তির চাকরির মূল কাজই হারাম হয়, তাহলে তার বেতন হারাম। আর যদি হারাম কাজ সামান্য ও অনিয়মিত হয়, তাহলে বেতন হারাম নয়, তবে সেই কাজের গুনাহ হবে।"
(ফতোয়ায়ে উসমানি: ৩/৪২৯)
★সুতরাং সম্পূর্ণ বেতন হারাম হবে না শুধু যতটুকু আপনি মিউজিক সম্বলিত ভিডিও ইডিট এর কাজ করবেন, ততটুকু বেতন হারাম হবে।
তারপরও পরামর্শ থাকবে উক্ত কাজ পরিহার করে চলার।
যদি মিউজিক সম্বলিত ভিডিও ইডিটের কাজ পরিহার করার কোন প্রকারের সুযোগ না থাকে, সেক্ষেত্রে আপনি উক্ত চাকরি করে যাওয়ার পাশাপাশি অন্য হালাল চাকরি খোঁজে এই চাকরি বাদ দিতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য হালাল রুজির ব্যবস্থা করবেন।
«وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا ۞ وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ»
(সূরা আত-তালাক: ২-৩)
অর্থ: "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।"