সুস্থ হলে তিন দিন তাবলিগে যাওয়ার নযরের শরয়ি হুকুম
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
السلام عليكم ورحمة الله وبركاته
সম্মানিত ওস্তাদ/মুফতিয়ানে কেরাম,
আশা করি আল্লাহ তাআলার রহমতে আপনারা ভালো আছেন। আমার একটি ব্যক্তিগত মাসআলা সম্পর্কে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী বিস্তারিত দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। অনুগ্রহ করে কুরআন-সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য হানাফি ফিকহের কিতাবের দলিলসহ উত্তর দেওয়ার অনুরোধ করছি।
আমার পরিস্থিতি:
আমি প্রায় আড়াই মাস আগে পায়ে fracture-এর কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ি। দীর্ঘ সময় আমাকে প্রায় সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হয়েছে এবং স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারিনি। এ সময় আমি মানসিকভাবেও অনেক কষ্টের মধ্যে ছিলাম এবং আল্লাহ তাআলার কাছে সুস্থতার জন্য অনেক দোয়া, ইস্তিগফার, দরুদ শরিফ ও নফল ইবাদত করেছি।
অসুস্থতার সময় আমি আল্লাহ তাআলার কাছে আন্তরিকভাবে নিয়ত/প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে, আল্লাহ তাআলা যদি আমাকে সুস্থ করে দেন, তাহলে আমি ইনশাআল্লাহ তিন দিনের জন্য তাবলিগ জামাতে সময় দেব।
আলহামদুলিল্লাহ, বর্তমানে আল্লাহ তাআলা আমাকে সুস্থতা দান করেছেন। ডাক্তার আমাকে স্বাভাবিকভাবে হাঁটার অনুমতি দিয়েছেন। তবে যেহেতু আমি দীর্ঘদিন হাঁটতে পারিনি, তাই বর্তমানে ধীরে ধীরে হাঁটা ও ডাক্তার প্রদত্ত rehabilitation exercise করছি। অর্থাৎ আমি এখন সদ্য recovery-এর পর্যায়ে আছি।
এখন আমার কয়েকটি বিষয় জানতে চাই:
১. আমি যে আল্লাহর কাছে এভাবে বলেছিলাম—“আল্লাহ আমাকে সুস্থ করে দিলে আমি তিন দিনের জন্য তাবলিগ জামাতে সময় দেব”—এটি কি হানাফি মাযহাব অনুযায়ী শরয়ি নযর (نذر) হিসেবে গণ্য হয়েছে, নাকি এটি শুধু একটি সাধারণ নিয়ত/ইচ্ছা হিসেবে গণ্য হবে?
২. যদি এটি শরয়ি নযর হয়ে থাকে, তাহলে যেহেতু এখন আল্লাহ তাআলা আমাকে সুস্থতা দান করেছেন, তিন দিনের তাবলিগে সময় দেওয়া কি আমার ওপর ওয়াজিব হয়ে গেছে?
৩. “তিন দিনের জন্য তাবলিগ জামাতে সময় দেওয়া”—এটি কি শরয়ি নযর হিসেবে এমন কোনো আমল, যার মাধ্যমে নযর আদায় হবে? নাকি তিন দিনের নির্দিষ্ট সময় দেওয়া যেহেতু ফরজ/ওয়াজিব ইবাদত নয়, তাই নযরটি কীভাবে আদায় করতে হবে—এ বিষয়ে হানাফি ফিকহের নির্দিষ্ট বিধান আছে?
৪. আমি বর্তমানে মাত্র সুস্থ হয়েছি এবং দীর্ঘ আড়াই মাসের bed rest-এর পর আবার হাঁটাচলা শুরু করেছি। তাই নযর আদায়ের জন্য কি এখনই তিন দিনের জামাতে বের হওয়া জরুরি, নাকি শরীর পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত কিছুদিন অপেক্ষা করে পরে তিন দিন দেওয়া যাবে? নযর আদায়ের সময়সীমা সম্পর্কে হানাফি মাযহাবের বিধান কী?
৫. যদি আমি কয়েক সপ্তাহ বা এক মাস পরে, শরীর আরও শক্তিশালী হওয়ার পর তিন দিনের জামাতে যাই, তাহলে কি এতে নযর আদায়ে কোনো সমস্যা হবে বা বিলম্বের কারণে কোনো গুনাহ হবে?
৬. আমার আর্থিক অবস্থাও বর্তমানে কিছুটা দুর্বল। চিকিৎসার কারণে আমার নিজের সঞ্চয়ের বেশিরভাগ টাকা খরচ হয়ে গেছে। আমাদের এলাকায় তিন দিনের জামাতে সাধারণত কাছাকাছি এলাকাতেই পাঠানো হয় এবং আনুমানিক ৫০০ টাকার মতো খরচে তিন দিন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। এই অবস্থায় নিজের জরুরি প্রয়োজনীয় খরচ অক্ষুণ্ণ রেখে সামর্থ্য অনুযায়ী তিন দিন দেওয়া কি যথেষ্ট হবে?
৭. সর্বশেষে, যদি এটি নযর হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে, তাহলে কোন নিয়তে, কীভাবে এবং কখন তিন দিন দিলে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী আমার নযর আদায় হয়েছে বলে গণ্য হবে—দয়া করে বিস্তারিতভাবে জানাবেন।
বিশেষ অনুরোধ, উত্তরটি হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য ফিকহের কিতাবের রেফারেন্সসহ দিলে উপকৃত হব। সম্ভব হলে কিতাবের নাম, খণ্ড ও পৃষ্ঠা/অধ্যায়ের উল্লেখ করলে আরও উপকৃত হব।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের উত্তম জাযায়ে খায়ের দান করুন এবং আমাদের সবাইকে সহিহ ইলম অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
والسلام عليكم ورحمة الله وبركاته
Answer
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী নযরের বিধান ও আপনার মাসআলার বিস্তারিত উত্তর
জবাব:
আলহামদুলিল্লাহ!
ইসলামী শরীয়তে মান্নত (নয এবং শর্তপূরণ সাপেক্ষে তা আদায় করা ওয়াজিব । তবে মান্নত শরীয়তসম্মত ও শুদ্ধ হওয়ার জন্য কতিপয় আবশ্যকীয় শর্ত রয়েছে। নিচে আপনার দেওয়া লেখাটি ফতোয়ার মানদণ্ড অনুযায়ী সুন্দর ও সুবিন্যস্তভাবে সাজিয়ে উপস্থাপন করা হলো:
মান্নত শুদ্ধ হওয়ার আবশ্যকীয় শর্তাবলি:
১. একমাত্র আল্লাহর নামে হতে হবে:
মান্নত হতে হবে কেবল আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এবং তাঁরই নামে। আল্লাহ তাআলা ছাড়া অন্য কোনো সৃষ্টি বা মাখলুকের (যেমন: পীর, ওলী বা মাজারের) নামে মান্নত করা সম্পূর্ণ নাজায়েয, বাতিল ও হারাম।
আরবী উদ্ধৃতি:
(قوله باطل وحرام) بوجوه، منها أنه نذر لمخلوق والنذر للمخلوق لا يجوز لأنه عبادة والعبادة لا تكون لمخلوق.
অনুবাদ: "(মৃত বা মাখলুকের নামে মান্নত করা) কয়েকটি কারণে বাতিল ও হারাম। তার মধ্যে অন্যতম হলো—এটি মাখলুকের উদ্দেশ্যে মান্নত, আর মাখলুকের উদ্দেশ্যে মান্নত করা জায়েয নেই; কারণ মান্নত হলো ইবাদত, আর ইবাদত কোনো মাখলুকের জন্য হতে পারে না।"
(রদ্দুল মুহতার / ফাতাওয়ায়ে শামী — ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪৩৯)
২. মান্নত ইবাদত ও স্বতন্ত্র নেক কাজ হতে হবে (قربة مقصودة):
মান্নতের বিষয়টি শরীয়তসম্মত ইবাদত ও মূল উদ্দেশ্যমূলক নেক কাজের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে । যে কাজ নিজে স্বতন্ত্র ইবাদত নয় বরং অন্য ইবাদতের মাধ্যম (যেমন: ওজু করা, গোসল করা বা রোগী দেখতে যাওয়া), এমন বিষয়ের মান্নত করলে তা মান্নত হিসেবে শুদ্ধ হবে না ।
আরবী উদ্ধৃতি:
وفى البدائع: ومن شروطه أن يكون قربة مقصودة فلا يصح النذر بعيادة المريض والوضوء والاغتسال.
অনুবাদ: "বায়েউস সানায়ে কিতাবে রয়েছে: মান্নতের অন্যতম শর্ত হলো তা স্বয়ং উদ্দেশ্যমূলক ইবাদত (কুরবতে মাকসূদা) হতে হবে। সুতরাং রোগী দেখা, ওজু করা ও গোসল করার মান্নত সহীহ হবে না।"
(রদ্দুল মুহতার / কিতাবুল ঈমান — ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৩৫)
৩. সমজাতীয় ফরয বা ওয়াজিব ইবাদত বিদ্যমান থাকা:
মান্নতকৃত ইবাদতটি এমন হতে হবে, শরীয়তে যার মূল বা সমজাতীয় (جنس) কোনো ফরয বা ওয়াজিব আমল বিদ্যমান রয়েছে । যেমন—নামায (যার ফরয নামায রয়েছে), রোযা (যার ফরয রমযানের রোযা রয়েছে), সদকা (যার ফরয যাকাত ও ওয়াজিব ফিতরা রয়েছে), হজ্ব ও কুরবানী ইত্যাদি। কিন্তু যে কাজের সমজাতীয় কোনো ফরয বা ওয়াজিব বিধান শরীয়তে নেই, তার মান্নত আবশ্যক হবে না।
আরবী উদ্ধৃতি:
وفى رد المحتار: وكان من جنسه واجب أى فرض……… كصوم وصلاة وصدقة……… ولم يلزم الناذر ما ليس من جنسه فرض.
অনুবাদ: "রদ্দুল মুহতারে রয়েছে: এবং ঐ ইবাদতের সমজাতীয় কোনো ফরয বা ওয়াজিব আমল থাকতে হবে; যেমন: রোযা, নামায ও সদকা। আর যার সমজাতীয় ফরয আমল নেই, তা মান্নতকারীর ওপর আবশ্যক হয় না।"
(রদ্দুল মুহতার / কিতাবুল ঈমান — ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৩৫)
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়ায়ে শামী):
- ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪৩৯ (কিতাবুছ ছাওম: মাজার ও প্রথাগত মান্নতের হুকুম)
- ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৩৫ (কিতাবুল ঈমান: মান্নত শুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলি) ২. নূরুল ঈযাহ:
- পৃষ্ঠা: ১৯০ (যে সকল মান্নত পূরণ করা আবশ্যক — ৩টি মৌলিক শর্ত)। ৩. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৮৬–১৮৭ (মানতের মাসায়েল ও আহকাম) । ৪. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৪শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৫৯ (বাবুন নুযুর বা মান্নতের বিবরণ)।
**আপনার জন্য করণীয় ও পালনীয় কি?
** যেহেতু তাবলীগে যাওয়াটা নযর করার দরুণ এখন তাবলীগে যাওয়াটা ওয়াজিব হবে না।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।