অসুস্থতার নেয়ামতে আছি বলা যাবে কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
অসুস্থ অবস্থায় অসুস্থতার নেয়ামতে আছি বলা যাবে কিনা?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্ন: অসুস্থ অবস্থায় "অসুস্থতার নেয়ামতে আছি" বলা যাবে কি?
উত্তর:
হ্যাঁ, অসুস্থ অবস্থায় "অসুস্থতার নেয়ামতে আছি" বলা জায়েয, বরং এটি ঈমানের দাবি ও সুন্নাহসম্মত। তবে শর্ত হলো—এ কথা বলার সময় অন্তরে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি, ধৈর্য ও শোকরের ভাব থাকতে হবে, মুখে আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা থাকতে হবে; আর এটা যেন অসুস্থতাকে ভালো মনে করা বা আল্লাহর ফয়সালার উপর অসন্তুষ্টির প্রকাশ না হয়।
দলিল:
১. আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ "আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতি দ্বারা। আর সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের।" (সূরা বাকারা: ১৫৫)
২. আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ "হয়তো তোমরা কোনো বিষয়কে অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর; আর হয়তো কোনো বিষয়কে ভালোবাসছ, অথচ তা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।" (সূরা বাকারা: ২১৬)
৩. হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ: إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ "মুমিনের কাজ কতই না আশ্চর্যজনক! তার সব অবস্থাই কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া আর কারো জন্য এটা নয়। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য পেলে সে শোকর করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণ হয়; আর দুঃখ-কষ্ট পেলে সে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে তাও তার জন্য কল্যাণ হয়।" (সহিহ মুসলিম: ২৯৯৯)
৪. হাদিসে আরও এসেছে, নবী ﷺ বলেছেন:
مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمٍّ، حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا، إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ "মুসলিমকে যে ক্লান্তি, রোগ, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট ও পেরেশানি পৌঁছে—এমনকি যে কাঁটা বিঁধে—তা দ্বারা আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।" (সহিহ বুখারি: ৫৬৪১, সহিহ মুসলিম: ২৫৭৩)
ফিকহি দৃষ্টিকোণ:
- ইমাম ইবনে আবিদিন রহ. "রাদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ করেন, মুমিনের উপর আসা বিপদ-আপদ আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা ও গুনাহ মোচনের মাধ্যম। (রাদ্দুল মুহতার: ২/৪৩০ প্রসঙ্গ)
- আল্লামা আশরাফ আলী থানভী রহ. "বাহিশতী জেওর"-এ বলেন, অসুস্থতা আল্লাহর পক্ষ থেকে এক প্রকার কাফফারা ও রহমত; মুমিনের উচিত ধৈর্য ও শোকর করা। (বাহিশতী জেওর, চিকিৎসা অধ্যায়)
- মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ. "মাআরিফুল কুরআন"-এ সূরা বাকারার ১৫৫-১৫৭ আয়াতের তাফসিরে বলেন, ধৈর্যশীলদের জন্য সুসংবাদ হলো—তারা আল্লাহর নিকট থেকে সন্তুষ্টি ও রহমত লাভ করবে। (মাআরিফুল কুরআন: ১/৩৯০)
সতর্কতা:
"অসুস্থতার নেয়ামতে আছি" বলার অর্থ যদি হয়—"আমি অসুস্থতাকে উপভোগ করছি" বা "আল্লাহর ফয়সালা আমার কাছে অপছন্দনীয় নয় বরং আমি এটাকে ভালোবাসছি" —তাহলে এটা ভুল হবে না, বরং এটা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টির প্রকাশ। কিন্তু যদি কেউ এটা বলে আল্লাহর ফয়সালার প্রতি অসন্তুষ্টি বা অভিযোগের সুরে, তাহলে তা নাজায়েয।
সারসংক্ষেপ:
অসুস্থ অবস্থায় "অসুস্থতার নেয়ামতে আছি" বলা জায়েয ও উত্তম, যদি তা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি, ধৈর্য ও শোকরের সাথে বলা হয়। এতে কোনো গুনাহ নেই; বরং এটি ঈমানের পরিপূর্ণতার আলামত।
والله أعلم بالصواب