ওয়াসওয়াসা দূর করার ইসলামি উপায়
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: স্বাভাবিক বা সুস্থ অবস্থায় যা মনে বা অন্তরে আসলে ওয়াসওয়াসা (শয়তানি কুমন্ত্রণা) হয়, সেগুলো নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বা যেকোনো অবস্থায় মনে বা অন্তরে আসলে কি ওয়াসওয়াসা হবে?
উত্তর:
সংক্ষেপে উত্তর হলো—হ্যাঁ, ওয়াসওয়াসা সর্বাবস্থায় ওয়াসওয়াসাই থাকে। ওয়াসওয়াসার পরিচয় বা প্রকৃতি অবস্থা-পরিবর্তনের দ্বারা বদলে যায় না। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বা অন্য যেকোনো অবস্থায় মনে বা অন্তরে যে খারাপ বা অসংগত কুমন্ত্রণা আসে, তা-ও ওয়াসওয়াসার অন্তর্ভুক্ত। তবে এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে:
১) ওয়াসওয়াসার সংজ্ঞা ও প্রকৃতি:
ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের পক্ষ থেকে অন্তরে নিক্ষিপ্ত কুমন্ত্রণা বা কুমন্ত্রণামূলক চিন্তা। কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ ۞ مَلِكِ النَّاسِ ۞ إِلَٰهِ النَّاسِ ۞ مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ ۞ الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ
"বলুন, আমি আশ্রয় চাই মানুষের রবের কাছে, মানুষের অধিপতির কাছে, মানুষের ইলাহের কাছে, সেই আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে, যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়।" —(সূরা আন-নাস: ১-৫)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ ۚ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ "আর যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" —(সূরা আল-আ'রাফ: ২০০)
২) নেশাগ্রস্ত অবস্থার বিশেষ বিধান:
নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মানুষ যদি নিজের ইচ্ছা-বিবেচনা হারিয়ে ফেলে এবং তার মুখ থেকে অসংগত কথা বের হয় বা মনে খারাপ চিন্তা আসে, তবে সেটি ওয়াসওয়াসা হিসেবেই গণ্য হবে। কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি বিষয় হলো—
- নেশার কারণে যদি বিবেক-বিবেচনা লোপ পায়, তবে সেই অবস্থায় বলা কথা বা কৃত কাজের জন্য শরিয়তের দৃষ্টিতে দায়-দায়িত্বের বিধান ভিন্ন হয়। যেমন হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ: عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَبْلُغَ، وَعَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ "তিন ব্যক্তির উপর থেকে কলম (দায়-দায়িত্ব) উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে: ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না জাগে, শিশু যতক্ষণ না বালেগ হয়, এবং পাগল যতক্ষণ না বিবেক ফিরে পায়।" —(সুনানে আবু দাউদ: ৪৪০৩; সুনানে তিরমিজি: ১৪২৩)
তবে নেশা করা নিজেই হারাম ও কবিরা গুনাহ, এবং তা ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়, তাই নেশার কারণে বিবেক লোপ পাওয়া নিজের কৃতকর্মেরই ফল—এ কারণে নেশার অবস্থায় কৃত অনেক কাজের দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। ফিকহের কিতাবসমূহে বর্ণিত আছে, মাতাল ব্যক্তি তার তালাক, ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি ক্ষেত্রে মুসলিম ফুকাহায়ে কেরামের মতভেদ রয়েছে
৩) ওয়াসওয়াসা দূর করার উপায়:
ওয়াসওয়াসা আসা স্বাভাবিক; কিন্তু তার উপর আমল করা বা তাতে বিশ্বাস স্থাপন করা জায়েজ নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْتِي أَحَدَكُمْ فَيَقُولُ: مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ حَتَّى يَقُولَ: مَنْ خَلَقَ رَبَّكَ؟ فَإِذَا بَلَغَ ذَلِكَ فَلْيَسْتَعِذْ بِاللَّهِ وَلْيَنْتَهِ "শয়তান তোমাদের কারো কাছে এসে বলে: অমুককে কে সৃষ্টি করেছে? অমুককে কে সৃষ্টি করেছে? এমনকি বলে: তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে? যখন সে এ পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন সে যেন আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং (এসব চিন্তা) বর্জন করে।" —(সহিহ বুখারি: ৩২৭৬; সহিহ মুসলিম: ১৩৪)
অন্য হাদিসে এসেছে, সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা অন্তরে এমন কিছু অনুভব করি যা বলতে আমরা লজ্জাবোধ করি। তিনি বললেন:
ذَاكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ "এটাই হলো ঈমানের স্পষ্ট প্রমাণ।" —(সহিহ মুসলিম: ১৩২)
অর্থাৎ ওয়াসওয়াসা আসা এবং তা অপছন্দ করা ঈমানের দলিল; কারণ মুমিনের অন্তর তা ঘৃণা করে।
উপসংহার:
- স্বাভাবিক, সুস্থ, নেশাগ্রস্ত বা যেকোনো অবস্থায় মনে বা অন্তরে যে কুমন্ত্রণা আসে, তা ওয়াসওয়াসাই।
- ওয়াসওয়াসা আসা দোষের নয়; বরং তার উপর আমল করা বা তাতে সন্তুষ্ট থাকা দোষের।
- নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ওয়াসওয়াসা আসলে সেটিও ওয়াসওয়াসা; তবে নেশার কারণে বিবেক লোপ পেলে কিছু ফিকহি বিধানে ভিন্নতা আসে, যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে।
- ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা, কুরআন-হাদিসের চিন্তা করা এবং ওয়াসওয়াসাকে ভ্রুক্ষেপ না করা কর্তব্য।
- তবে নেশা করা নিজেই হারাম ও কবিরা গুনাহ
আরও জানতে হলে দেখুন: ফাতাওয়া উসমানি (১/৪৯০-৪৯২), ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৫০-২৫৫), রাদ্দুল মুহতার (৬/৩৭০-৩৭৫), বাহিশতী জেওর (প্রথম খণ্ড, ওয়াসওয়াসা অধ্যায়)।