"আমার নাম রিমা না ইনশাআল্লাহ" — এ ধরনের বাক্য কি কসম হিসেবে গণ্য হবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি যদি এইটা আবার বলি তাহলে আমার নাম রিমা না ইনশাআল্লাহ। আমি বুঝানোর পরে সে কথাটার জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে মাফ চেয়েছে।
এখন যেহেতু সে ইনশাআল্লাহ বলছে, এরপরও কি এটা কসমের আন্ডারে পড়বে? মানে এটার জন্য কি তাকে কাফফারা দিতে হবে?
Answer
কসম সম্পর্কে — "আমার নাম রিমা না ইনশাআল্লাহ" ধরনের বাক্যের হুকুম
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
এক বোন রাগ বা আবেগের বশে বলেছে: "আমি যদি এই কথাটা আবার বলি, তাহলে আমার নাম রিমা না ইনশাআল্লাহ।" পরে সে আল্লাহর কাছে মাফ চেয়েছে এবং এখন ইনশাআল্লাহ বলছে। প্রশ্ন হলো—এটি কি কসমের অন্তর্ভুক্ত হবে? কাফফারা দিতে হবে কি?
১. প্রথমে জানা জরুরি: এ ধরনের বাক্য কি কসম (শপথ) হিসেবে গণ্য?
হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো—কসম তখনই হয় যখন আল্লাহ তায়ালার নাম, সিফাত বা তাঁর কোনো বিশেষণ নিয়ে শপথ করা হয়। যেমন: "আল্লাহর কসম", "ওয়াল্লাহি", "বিল্লাহি", "আল্লাহর ইজ্জতের কসম" ইত্যাদি।
আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে: "اليمين ما كان بالله أو بأسمائه أو صفاته" — কসম হলো তা-ই, যা আল্লাহ, তাঁর নাম বা সিফাত দ্বারা হয়। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল আইমান, ৫/৪৮৭)
এখন প্রশ্ন হলো—"আমার নাম রিমা না" এ কথাটি কি আল্লাহর নাম বা সিফাতের কসম? না। এটি আল্লাহর নাম, সিফাত বা তাঁর কোনো গুণের কসম নয়। এটি একটি সাধারণ শর্তমূলক বাক্য (conditional statement), যেখানে নিজের নামের সাথে সম্পর্কিত একটি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
তবে কিছু ফকিহ এ ধরনের বাক্যকে "يمين بالطلاق أو بالعتاق أو بالحرم" (তালাক, আজাদি বা হারাম করার কসম) এর সাথে তুলনা করেন না; বরং এটি "يمين لغو" বা "يمين غير منعقدة" (অকার্যকর কসম) হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
২. হানাফি মাজহাবে কসমের প্রকারভেদ
হানাফি মাজহাবে কসম মূলত তিন প্রকার:
| প্রকার | বিবরণ | হুকুম | |--------|--------|-------| | يمين لغو | ভুলবশত বা আবেগে বলা কসম, যা অন্তরে সংকল্প ছিল না | কোনো কাফফারা নেই | | يمين منعقدة | আল্লাহর নামে কৃত কসম, যা ভঙ্গ করা হয়েছে | কাফফারা ওয়াজিব | | يمين غموس | মিথ্যা কসম, যা দিয়ে কারো হক নষ্ট করা হয় | কাফফারা নেই, তবে তাওবা ওয়াজিব |
আল-হিদায়া-তে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) থেকে বর্ণিত: "اللغو ما لا يعقد عليه القلب" — لغو হলো তা, যা অন্তরে সংকল্প করা হয় না। (আল-হিদায়া, কিতাবুল আইমান, ২/৩৫২)
৩. প্রশ্নের বাক্যটির বিশ্লেষণ
বাক্যটি হলো: "আমি যদি এইটা আবার বলি তাহলে আমার নাম রিমা না ইনশাআল্লাহ।"
এখানে কয়েকটি দিক লক্ষণীয়:
- এটি আল্লাহর নামে কসম নয় — বরং নিজের নামের সাথে সম্পর্কিত একটি শর্ত।
- "ইনশাআল্লাহ" বলা হয়েছে — এতে বাক্যটি আরও দুর্বল হয়ে যায়, কারণ ইনশাআল্লাহ বলা মানে ভবিষ্যতের বিষয় আল্লাহর ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া।
- সে আল্লাহর কাছে মাফ চেয়েছে — এটি তাওবার অন্তর্ভুক্ত।
হানাফি ফকিহদের মত:
ইমাম ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) বলেন:
"وإذا قال: إن فعلت كذا فامرأتي طالق، أو قال: فعلي نذر، أو قال: فوالله لا أفعل، فهذا يمين منعقدة" — যদি বলে: "যদি আমি এমন করি তবে আমার স্ত্রী তালাক", বা "আমার উপর মান্নত", বা "আল্লাহর কসম আমি করব না" — এগুলো কসমে মুন'আকিদা। (রাদ্দুল মুহতার, ৫/৪৮৮)
কিন্তু "আমার নাম রিমা না" — এটি আল্লাহর নাম বা সিফাতের কসম নয়, তাই এটি কসমে মুন'আকিদা হিসেবে গণ্য হবে না।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)-এর "ফাতাওয়া উসমানি"-তে উল্লেখ আছে:
"কসম তখনই শপথ হিসেবে গণ্য হবে যখন আল্লাহ তায়ালার নাম, সিফাত বা তাঁর কোনো বিশেষণ দ্বারা শপথ করা হয়। নিজের নাম, সন্তানের নাম, বা অন্য কোনো মাখলুকের নামে শপথ করা কসম হিসেবে গণ্য নয়।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৯৫)
৪. তবে কি এতে কোনো দোষ নেই?
এখানে একটি সতর্কতা জরুরি:
-
নিজের নামে শপথ করা বা নিজের নামকে শর্তের সাথে জড়িত করা — এটি শরিয়তে নিষিদ্ধ বা মাকরুহ। কারণ কসম একমাত্র আল্লাহর নামে হতে হবে।
-
হাদিসে এসেছে: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"من كان حالفا فليحلف بالله أو ليصمت" — যে কসম করবে সে যেন আল্লাহর নামে কসম করে, নয়তো চুপ থাকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৬৪৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৪৬)
-
আরও এসেছে: "من حلف بغير الله فقد أشرك" — যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে কসম করল সে শিরক করল।
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩২৫১; তিরমিজি, হাদিস: ১৫৩৫ — ইমাম তিরমিজি হাসান বলেছেন)
তবে শিরকে আকবার নয়; বরং এটি শিরকে আসগার (ছোট শিরক) বা মাকরুহ। তাই এ থেকে তাওবা করা জরুরি, যা সে ইতিমধ্যে করেছে।
৫. কাফফারা সম্পর্কে চূড়ান্ত হুকুম
| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | বাক্যটি আল্লাহর নামে কসম? | না | | কসমে মুন'আকিদা হিসেবে গণ্য? | না | | কাফফারা ওয়াজিব? | না | | তাওবা জরুরি? | হ্যাঁ (নিজের নামে শপথ/শর্ত জড়ানোর কারণে) | | ভবিষ্যতে এ ধরনের বাক্য বলা? | নিষিদ্ধ/মাকরুহ |
সিদ্ধান্ত: যেহেতু বাক্যটি আল্লাহর নাম, সিফাত বা তাঁর কোনো গুণের কসম নয়, বরং নিজের নামের সাথে সম্পর্কিত একটি শর্তমূলক বাক্য — তাই এটি কসমে মুন'আকিদা হিসেবে গণ্য হবে না এবং কাফফারা ওয়াজিব হবে না। তবে নিজের নামে শপথ/শর্ত জড়ানো শরিয়তে নিষিদ্ধ; তাই তাওবা করা জরুরি, যা সে করেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের বাক্য বলা থেকে বিরত থাকা উচিত।
৬. কসম ভঙ্গের কাফফারা (যদি কখনো কসমে মুন'আকিদা হয়)
যদি কখনো আল্লাহর নামে কসম করে তা ভঙ্গ হয়, তবে কাফফারা হলো:
- দশজন মিসকিনকে খাবার দেওয়া (মধ্যম মানের), অথবা
- দশজন মিসকিনকে বস্ত্র দেওয়া, অথবা
- একজন দাস আজাদ করা — যদি সামর্থ্য না থাকে, তবে
- তিন দিন রোজা রাখা
সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৮৯ "لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَٰكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا عَقَّدتُّمُ الْأَيْمَانَ ۖ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ ۖ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ"
৭. উপদেশ
- ভবিষ্যতে নিজের নাম, সন্তানের নাম, বা কোনো মাখলুকের নামে কসম/শর্ত করা থেকে বিরত থাকুন।
- শুধু আল্লাহর নামে কসম করুন — "ওয়াল্লাহি", "বিল্লাহি", "আল্লাহর কসম"।
- রাগের সময় মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়া বাক্যের জন্য তাওবা করুন — সে করেছে, আলহামদুলিল্লাহ।
- ইনশাআল্লাহ বলা — এটি ভালো অভ্যাস; তবে কসমের ক্ষেত্রে ইনশাআল্লাহ বলা কসমকে বাতিল করে না, যদি কসম আল্লাহর নামে হয়ে থাকে। কিন্তু এখানে মূলত কসমই হয়নি।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
না, এটার জন্য কাফফারা দিতে হবে না। কারণ এটি আল্লাহর নামে কসম নয়; বরং নিজের নামের সাথে সম্পর্কিত একটি শর্তমূলক বাক্য। তবে নিজের নামে শপথ/শর্ত জড়ানো শরিয়তে নিষিদ্ধ, তাই তাওবা করা জরুরি — যা সে করেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের বাক্য বলা থেকে বিরত থাকা উচিত।