স্বামী সন্তান নষ্ট করতে বললে কী করব?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
উস্তাদ এক মুসলিমাহ,তার ১০ মাস বয়সী একটি বাচ্চা আছে,সেই বাচ্চা ঠিকমতো দুধ পায়না মাসের পর মাস দরে তাকে দুধ আসার ঔষধ খেতে হয়।এখন সে আবার প্রেগন্যান্ট আগের বাচ্চার সময় সিজার করা লেগেছে।
তো এখন বাচ্চা হবে সেই বাচ্চা স্বামী নষ্ট করার জন্য তাকে চাপ দিচ্ছে প্রচুর। যেদিন বাচ্চা হবে সেদিন সে আত্মহত্যা করবে বলে প্রতুদিন হুমকি দিচ্ছে।
আবার আগের বাচ্চা হওয়ার সময়ও সে সিজার এর কোনো খরচ দেয়নি এমনকি বাচ্চার প্রয়োজনীয় ভরনপোষণ ও দেয় না অনেক সময় আরো বাচ্চা তার কাছে ১০ হাজার টাকার বেশি পাবে সে বাচ্চার টাকা ভেঙেছে। বাচ্চা অসুস্থ হলে বেশিরভাগ টাকা মেয়ের মা বাবাকে দিতে হয়,বাচ্চার বেশির ভাগ খরচই মেয়ের মা বাবাকে দিতে হয়।
এখন এবার বাচ্চা হলেও সিজার খরচ ও বাচ্চার প্রয়োজনীয় জিনিস তার বাবা মাকে দিতে হবে স্বামী কোনো খরচ দিবেনা এমনকি ডাক্তার ও দেখানোর টাকা দিবেনা। আগেরবারও সে ডাক্তার দেখানো বা টেস্ট এর কোনো টাকা দেয় নি। আর এখন বাচ্চা নষ্ট করার জন্য খারপ আচরণ করছে ঝগড়া করছে হুমকি দিচ্ছে আর তার নামে কারো কাছে নালিশ দিয়েও লাভ নেই আর বুঝিয়ে ও লাভ নেই সে কারো কথা শুনবেনা।
সে বাচ্চার কোন দ্বায়িত্ব নিতে চায়না, উস্তাদ মেয়েটির করনীয় কি?
Answer
কঠিন পরিস্থিতিতে করণীয়
উত্তর :
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
শরীয়তের বিধান হলো যদি মহিলা অত্যাধিক দুর্বল হয়, যার কারণে গর্ভধারণ তার জন্য আশঙ্কাজনক হয় এবং গর্ভধারণের মেয়াদ চার মাসের কম হয়। তাহলে অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক গর্ভপাত বৈধ হবে। মেয়াদ চার মাসের অধিক হলে কোনোভাবেই বৈধ হবেনা।
খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান ইত্যাদির অভাবের কারণে সংসারকে সচ্ছল করার নিয়তে, দৈহিক সৌন্দর্য বা ফিগার ঠিক রাখার উদ্দেশ্যে ,কন্যাসন্তান জন্ম নেয়ার ভয়ে (যাতে পরবর্তীতে এদের বিয়ে শাদীর ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়),অধিক সন্তান নেয়াকে লজ্জার বিষয় মনে করে গর্ভপাত বিশেষত অভাবের কারণে সংসারকে সচ্ছল করার নিয়তে গর্ভপাত করলে আল্লাহর উপর বিশ্বাস ও ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে। কেননা রিজিকের মালিক আল্লাহ।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
ولا تقتلوا أولادكم خشية إملاق، نحن نرزقهم وإيّاكم إنّ قتلهم كان خطأ كبيراً.
‘’দারিদ্রতার ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানকে হত্যা কর না। তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমিই খাদ্য প্রদান করে থাকি।নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ…’’(সূরা ইসরা, আয়াত-৩১)
অন্যত্র তিনি বলেন, الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ . “শয়তান তোমাদের অভাবের ওয়াদা দেয়।” (সূরা আল-বাক্বারা)
আধুনিক যুগে ভ্রুণহত্যা জাহেলি যুগে কন্যাসন্তানকে জীবন্ত সমাধিস্থ করার নামান্তর। তখন বাবা নিজ মেয়েকে গর্তে পুঁতে ফেলত; আর এখন আধুনিক যন্ত্রপাতি দ্বারা মায়ের পেটেই শিশুকে মেরে ফেলা হয়। এ দুই হত্যার মধ্যে বাহ্যত কোনো তফাত নেই। এজন্য
রাসুলুল্লাহ (সা.) ভ্রুণহত্যাকে ‘গুপ্তহত্যা’ বলে উল্লেখ করেছেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘স্মরণ কর ওই
দিনকে, যেদিন জীবন্ত সমাধিস্থ নিষ্পাপ
বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমাকে কোন অপরাধের কারণে হত্যা করা হয়েছে?’ (সূরা তাকয়ির :৮)।
,
★সু-প্রিয় প্রশ্নকারী দ্বীনি বোন,
চার মাসের পূর্বে বিশেষ কিছু কারণে শরীয়ত গর্ভপাতকে অনুমোদন প্রদান করে থাকে।
,
(ক)বর্তমানে কোলে দুধের একটি শিশু রয়েছে,অপরদিকে উক্ত মহিলার গর্ভাশয়ে নতুন সন্তানও উৎপাদিত হচ্ছে। গর্ভের দরুন দুধ একেবারে শুকিয়ে গেছে।অপরদিকে উক্ত সন্তানকে অন্যকোনো উপায়ে লালনপালন করা যাচ্ছেনা। মায়ের দুধ ব্যতীত অন্যকিছুতে সে মূখই দিচ্ছে না।এমতাবস্থায় চারমাস হয়নি এমন গর্ভকে গর্ভপাত করা বৈধ রয়েছে।
,
(খ)কোনো মুসলমান বিজ্ঞ ডাক্তার উক্ত গর্ভবতী মহিলাকে পরিদর্শন করে বলে যে,গর্ভপাত না করলে মহিলার জান বা কোনো অঙ্গ বিনাশের আশঙ্কা রয়েছে।
,
★সু-প্রিয় প্রশ্নকারী দ্বীনি বোন,
প্রশ্নে উল্লেখিত ছুরতে আপনার কোলে যেহেতু দুধের একটি শিশু রয়েছে,অপরদিকে আপনার গর্ভাশয়ে নতুন সন্তানও উৎপাদিত হচ্ছে,সুতরাং এক্ষেত্রে গর্ভের দরুন যদি আপনার দুধ একেবারে শুকিয়ে যায়,অপরদিকে উক্ত সন্তানকে অন্যকোনো উপায়ে লালনপালন করা না যায়। মায়ের দুধ ব্যতীত অন্যকিছুতে সে মূখই না দেয়, এমতাবস্থায় গর্ভের বয়স যদি চারমাস না হয়,সেক্ষেত্রে এমন গর্ভকে গর্ভপাত করা বৈধ হবে।
অন্যথায় জায়েজ নয়।
গর্ভের বাচ্চার বয়স চার মাস অতিবাহিত হয়ে গেলে গর্ভপাত করা কবিরা গুনাহ ও হত্যার সমতুল্য। স্বামীর হুমকি বা চাপের কাছে নত হয়ে গর্ভপাত করা হারাম। পাশাপাশি স্বামী ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণ (নফকা) দিতে বাধ্য; না দিলে সে গুনাহগার ও জালিম। বোনের উচিত—ধৈর্য ধারণ করা, আল্লাহর উপর ভরসা রাখা, সম্ভব হলে বুঝদার আত্মীয়/ইমাম/মুরুব্বির মাধ্যমে স্বামীকে বোঝানো, এবং প্রয়োজনে শরীয়তসম্মত বিচ্ছেদ (খুলা/তালাক) এর ব্যবস্থা নেওয়া। আত্মহত্যা সম্পূর্ণ হারাম—এটি কখনোই সমাধান নয়।
ইসলামে জীবনের হেফাজত সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে দারিদ্র্যের ভয়ে হত্যা করো না; আমিই তাদেরকে এবং তোমাদেরকে রিযিক দান করি।" — (সূরা আল-আনআম: ১৫১; সূরা আল-ইসরা: ৩১)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে সন্তান হত্যা করে..." — হত্যা কবিরা গুনাহসমূহের মধ্যে অন্যতম। — (সহীহ বুখারী: ৬৮৭১)
স্বামীর দায়িত্ব ও নফকা (ভরণপোষণ)
ইসলামে স্বামীর উপর স্ত্রীর নফকা ওয়াজিব। আল্লাহ বলেন:
"আর সন্তানবতী মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে..." "আর সন্তানের পিতার দায়িত্ব হলো তাদের ভরণপোষণ ও পোশাক-পরিচ্ছদ ন্যায়সংগতভাবে।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৩৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমাদের উপর তোমাদের স্ত্রীদের হক হলো—তোমরা তাদের খাবার ও পোশাক দেবে ন্যায়সংগতভাবে।" — (সুনানে আবু দাউদ: ২১৪২; ইবনে মাজাহ: ১৮৫০)
হানাফী ফিকহ:
- স্ত্রীর নফকা, সন্তানের নফকা, সিজার/চিকিৎসার খরচ—সবই স্বামীর দায়িত্ব।
- স্বামী না দিলে সে গুনাহগার ও জালিম; কিয়ামতের দিন তাকে জবাবদিহি করতে হবে।
- স্ত্রী চাইলে শরীয়তের আদালত/কাজীর মাধ্যমে নফকা আদায় করাতে পারে।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুন নিকাহ।
- আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ।
- ফাতাওয়া উসমানী, নফকা অধ্যায়।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী রহ.)।
নির্যাতন চললে — ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী খুলা' (স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিচ্ছেদ) বা তালাকের ব্যবস্থা নেওয়া জায়েয। এমতাবস্থায় ধৈর্য ধরে জুলুম সহ্য করা ফরজ নয়।
আল্লাহ তাআলা বোনকে সবর ও হেফাজত দান করুন। আমীন।