নেশা অবস্থায় বা যেকোনো অবস্থায় ভুলবশত কুফরি কথা বা কাজ করলে ঈমান চলে যায় কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
খ) নেশা অবস্থায় হোক বা যেকোনো অবস্থায় হোক ওসওয়াসা রোগির ইমান চলে যাবে কি?
গ)নেশা অবস্থায় হোক বা যেকোনো অবস্থায় হোক মনে বা ভিতরে ইমান এবং ইসলামের বিরুদ্ধে যাই আসে সেটা ওসওয়াসা হবে?
Answer
ইমান সম্পর্কিত তিনটি প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন (ক): নেশা অবস্থায় বা যেকোনো অবস্থায় বেখেয়ালে বা ভুলবশত ইমান চলে যাবে মনে হয় কিন্তু নিশ্চিত নয়—এরকম কাজ করলে বা কথা বললে ইমান চলে যাবে কি?
উত্তর:
ইমান চলে যাওয়ার বিষয়টি শুধু মনে সন্দেহ হওয়া বা ভুল ধারণা পোষণ করার দ্বারা নির্ধারিত হয় না; বরং ইমান ভঙ্গ হয় কুফরি কালাম (কুফরিমূলক কথা), কুফরি আমল (কুফরিমূলক কাজ) বা কুফরি আকিদা (কুফরিমূলক বিশ্বাস) দ্বারা—যা ইচ্ছাকৃতভাবে এবং স্বেচ্ছায় করা হয়।
মূলনীতি:
১. ভুলবশত বা বেখেয়ালে: যদি কেউ নেশার প্রভাবে বা অসতর্কতাবশত এমন কথা বলে বা কাজ করে যা কুফরি মনে হয়, কিন্তু সে ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরির নিয়ত করে না, বরং ভুলে বা বেখেয়ালে হয়ে যায়—তাহলে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে ইমান চলে যাবে না। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন:
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا "হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই বা ভুল করি তবে আমাদের পাকড়াও করবেন না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)
আর হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং জোরপূর্বক কাজ থেকে (পাকড়াও) ক্ষমা করে দিয়েছেন।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪৩; সুনানে বায়হাকি)
২. নেশার অবস্থা: নেশা (মাদকতা) নিজে হারাম এবং কবিরা গুনাহ। তবে নেশার কারণে যদি কেউ অজ্ঞান বা বেহুঁশ অবস্থায় থাকে এবং সে অবস্থায় কুফরি কথা বলে বা কাজ করে, তাহলে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে তার ইমান চলে যাবে না—কারণ তখন তার ইচ্ছা ও বিবেক কাজ করছিল না। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে সতর্কতাস্বরূপ ইমান নবায়ন করা উত্তম।
৩. সন্দেহ বা ওয়াসওয়াসা: শুধু মনে সন্দেহ হওয়া বা "ইমান চলে গেল কি না" এই ধরনের চিন্তা ইমান ভঙ্গের কারণ নয়। বরং এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ বলেন:
"الوسوسة لا تضر إذا لم يعقد القلب على الكفر" "ওয়াসওয়াসা ক্ষতি করে না, যতক্ষণ না অন্তর কুফরের উপর দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করে।" (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২৪)
সারসংক্ষেপ: নেশা বা ভুলবশত কুফরি কথা/কাজ হলে ইমান চলে যাবে না, যদি না ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরি বিশ্বাস বা অস্বীকার করা হয়। তবে সতর্কতাস্বরূপ কালিমা পড়ে ইমান নবায়ন করা এবং তাওবা করা উত্তম।
প্রশ্ন (খ): নেশা অবস্থায় হোক বা যেকোনো অবস্থায় হোক ওয়াসওয়াসা রোগীর ইমান চলে যাবে কি?
উত্তর:
ওয়াসওয়াসা (শয়তানি কুমন্ত্রণা) দ্বারা ইমান চলে যায় না। এটি একটি সুস্পষ্ট ও সর্বসম্মত ফিকহি নীতি।
দলিল:
১. আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ "আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার অন্তর তাকে যা কুমন্ত্রণা দেয় তা আমি জানি।" (সূরা কাফ: ১৬)
২. হাদিসে সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে বললেন:
إِنَّا نَجِدُ فِي أَنْفُسِنَا مَا لَوْ أَنَّ أَحَدَنَا أَنْ يَتَكَلَّمَ بِهِ لَكَانَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ أَنْ يَتَكَلَّمَ بِهِ "আমরা আমাদের অন্তরে এমন কিছু পাই, যা বলার চেয়ে আমরা আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া পছন্দ করি।" রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: ذَاكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ "এটাই হলো ইমানের প্রমাণ (অর্থাৎ ওয়াসওয়াসা আসা মানে ইমান আছে)।" (সহিহ মুসলিম: ১৩২)
৩. ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ বলেন:
"الوسوسة لا تضر إذا لم يعقد القلب على الكفر" "ওয়াসওয়াসা ক্ষতি করে না, যতক্ষণ না অন্তর কুফরের উপর দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করে।" (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২৪)
৪. মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মাআরিফুল কুরআন-এ বলেন: "ওয়াসওয়াসা শয়তানের পক্ষ থেকে আসে, এটি ইমানের ক্ষতি করে না; বরং এটি ইমানের দৃঢ়তার প্রমাণ।"
সারসংক্ষেপ: ওয়াসওয়াসা রোগীর ইমান চলে যায় না, সে নেশা অবস্থায় থাকুক বা স্বাভাবিক অবস্থায়। তবে ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা, কালিমা পড়া, কুরআন তিলাওয়াত করা এবং ওয়াসওয়াসাকে ভ্রুক্ষেপ না করা কর্তব্য।
প্রশ্ন (গ): নেশা অবস্থায় হোক বা যেকোনো অবস্থায় হোক মনে বা ভিতরে ইমান এবং ইসলামের বিরুদ্ধে যা আসে সেটা ওয়াসওয়াসা হবে?
উত্তর:
হ্যাঁ, মনে বা অন্তরে ইমান ও ইসলামের বিরুদ্ধে যে চিন্তা আসে—যদি তা ইচ্ছাকৃতভাবে পোষণ না করা হয়, বরং অনিচ্ছাকৃতভাবে আসে—তাহলে তা ওয়াসওয়াসা। এটি ইমান ভঙ্গের কারণ নয়।
বিশ্লেষণ:
১. ওয়াসওয়াসার সংজ্ঞা: ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের পক্ষ থেকে অন্তরে আসা কুমন্ত্রণা, যা মানুষ ইচ্ছা করে না, বরং অনিচ্ছাকৃতভাবে আসে। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"الوسوسة ما يقع في القلب من غير اختيار العبد" "ওয়াসওয়াসা হলো যা বান্দার ইচ্ছা ছাড়াই অন্তরে আসে।" (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২৪)
২. ইমান ভঙ্গের শর্ত: ইমান ভঙ্গের জন্য প্রয়োজন—ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরি বিশ্বাস করা, কুফরি কথা বলা বা কুফরি কাজ করা। শুধু মনে আসা চিন্তা ইমান ভঙ্গ করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا "আল্লাহ কারো উপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)
৩. নেশা অবস্থায়: নেশার কারণে যদি কেউ অজ্ঞান বা বেহুঁশ থাকে এবং সে অবস্থায় মনে কুফরি চিন্তা আসে, তাহলে তা ওয়াসওয়াসা হিসেবে গণ্য হবে এবং ইমান চলে যাবে না। তবে নেশা নিজে হারাম, তাই তা থেকে বিরত থাকা ফরজ।
৪. ওয়াসওয়াসা দূর করার উপায়:
- আউযুবিল্লাহ পড়া: "أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ"
- কালিমা তাইয়্যেবা পড়া: "لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ"
- কুরআন তিলাওয়াত করা, বিশেষত সূরা নাস ও সূরা ফালাক
- ওয়াসওয়াসাকে ভ্রুক্ষেপ না করা এবং মনে না আনা
- আল্লাহর কাছে ইমানের দৃঢ়তা প্রার্থনা করা
৫. মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানি-তে বলেন: "ওয়াসওয়াসা ইমান ভঙ্গ করে না; বরং এটি ইমানের দৃঢ়তার লক্ষণ। ওয়াসওয়াসাকে ভ্রুক্ষেপ না করাই এর চিকিৎসা।" (ফাতাওয়া উসমানি: ১/১২৩)
সারসংক্ষেপ: মনে বা অন্তরে ইমান ও ইসলামের বিরুদ্ধে যা আসে—যদি তা অনিচ্ছাকৃত হয় এবং ইচ্ছাকৃতভাবে পোষণ না করা হয়—তাহলে তা ওয়াসওয়াসা, যা ইমান ভঙ্গ করে না। নেশা অবস্থায় হোক বা স্বাভাবিক অবস্থায় হোক, ইমান চলে যাবে না। তবে নেশা থেকে বিরত থাকা এবং ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা কর্তব্য।
সারসংক্ষেপ (তিনটি প্রশ্নের একত্রে উত্তর)
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | (ক) নেশা/ভুলবশত কুফরি কথা/কাজ | ইচ্ছাকৃত না হলে ইমান চলে যাবে না | | (খ) ওয়াসওয়াসা রোগীর ইমান | চলে যাবে না, নেশা বা স্বাভাবিক যেকোনো অবস্থায় | | (গ) মনে ইমানবিরোধী চিন্তা | অনিচ্ছাকৃত হলে তা ওয়াসওয়াসা, ইমান ভঙ্গ করে না |
মূলনীতি: ইমান ভঙ্গ হয় শুধু ইচ্ছাকৃত কুফরি বিশ্বাস, কথা বা কাজ দ্বারা। অনিচ্ছাকৃত ভুল, বিস্মৃতি, নেশার প্রভাব বা ওয়াসওয়াসা ইমান ভঙ্গ করে না। তবে সতর্কতাস্বরূপ ইমান নবায়ন করা এবং তাওবা করা উত্তম।
আরবি দোয়া (ইমান রক্ষার জন্য)
اللَّهُمَّ يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ "হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী আল্লাহ! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর দৃঢ় রাখুন।" (সুনানে তিরমিজি: ৩৫২২)
তথ্যসূত্র:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): ৪/২২৪
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): ১/১২৩
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি)
- সহিহ মুসলিম: ১৩২
- সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪৩
- সুনানে তিরমিজি: ৩৫২২
- সূরা বাকারা: ২৮৬, সূরা কাফ: ১৬