স্বামীর ছবি বান্ধবীকে দেখানো কি গুনাহ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২. আগে অনেক ভালো ছিলাম আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ছিল নামাজে কান্না আসত সারাক্ষণ নিজের পাপের জন্য কান্না করতাম। কিন্তু এখন নামাজের মধ্যে বিন্দু পরিমাণ মন থাকে না আমলে স্বাদ লাগেনা আমল করতে ইচ্ছা করে না অনেকদিন চলে যায় কোরআন মাজীদ ছুঁয়েও দেখি না। কোন হতে নামাজ শেষ করে উঠে যাই দোয়া জিকির করি না মোনাজাত দেই না। আল্লাহর কাছে কিচ্ছু চাইতে ভালো লাগে না। আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে এখন আমি কি করবো?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্ন ১: বান্ধবীদেরকে নিজের স্বামীর ছবি দেখানো ইসলামী শিষ্টাচার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ইসলাম নারী-পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর নিয়ম নির্ধারণ করেছে। অমাহরাম (যাদের সাথে বিবাহ বৈধ) নারীদের কাছে নিজের স্বামীর ছবি দেখানো বা তাদেরকে স্বামীর ছবি দেখার সুযোগ দেওয়া গুনাহের কাজ।
দলিল:
- কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ
"আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে।" (সূরা আন-নূর: ৩১) - হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ
"তোমরা নারীদের কাছে প্রবেশ করা থেকে বেঁচে থাকো।" (সহীহ বুখারী: ৫২৩৪)
এই হাদীসের ব্যাখ্যায় আলেমগণ বলেন, অমাহরাম নারীর কাছে নিজের ছবি পাঠানো বা দেখানোও এই নিষেধের আওতাভুক্ত, কারণ এটি ফিতনার কারণ হতে পারে।
হানাফী ফিকহের নির্দেশনা:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ (৫/৩২৯) তে বলা হয়েছে: "পুরুষের জন্য অমাহরাম নারীর দিকে তাকানো হারাম, যেমন নারীর জন্যও অমাহরাম পুরুষের দিকে তাকানো হারাম।"
- রদ্দুল মুহতার (১/৪০৬) তে ইবনে আবিদীন রহ. বলেন: "নারীদের জন্য অমাহরাম পুরুষের ছবি দেখা জায়েয নয়, কারণ এটি দৃষ্টির হিফাজতের পরিপন্থী।"
সুতরাং:
- আপনার স্বামীর ছবি বান্ধবীদের দেখানো গুনাহ হবে।
- তওবা করুন এবং ভবিষ্যতে এই কাজ থেকে বিরত থাকুন।
- প্রয়োজনে স্বামীর ছবি শুধুমাত্র মাহরাম (যাদের সাথে বিবাহ চিরতরে হারাম) নারীদের দেখাতে পারেন।
প্রশ্ন ২: আপনার দ্বীনি অবস্থার অবনতি নিয়ে হতাশ না হয়ে বরং এটাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে নিন। ইমানের ঊর্ধ্বচাপ ও নিম্নচাপ স্বাভাবিক। সাহাবায়ে কিরামও এই অবস্থার সম্মুখীন হয়েছেন।
হাদীস:
- হযরত হানযালা রা. অভিযোগ করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যখন আপনার কাছে থাকি তখন জান্নাত-জাহান্নাম যেন চোখের সামনে দেখতে পাই। কিন্তু যখন আপনার কাছ থেকে ফিরে যাই এবং সংসারে মশগুল হয়ে যাই, তখন সেই অবস্থা ভুলে যাই।"
রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন:وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنْ لَوْ تَدُومُونَ عَلَى مَا تَكُونُونَ عِنْدِي وَفِي الذِّكْرِ لَصَافَحَتْكُمُ الْمَلَائِكَةُ عَلَى فُرُشِكُمْ وَفِي طُرُقِكُمْ وَلَكِنْ يَا حَنْظَلَةُ سَاعَةً وَسَاعَةً
"যার হাতে আমার প্রাণ, সেই সত্তার কসম! যদি তোমরা সর্বদা আমার কাছে যেভাবে থাকো সেভাবে (ইমানের উচ্ছ্বাস নিয়ে) থাকতে, তবে ফেরেশতারা তোমাদের সাথে তোমাদের বিছানায় ও পথে মুসাফাহা করত। কিন্তু হে হানযালা! (ইবাদতের জন্য) এক সময় এবং (সংসারের জন্য) এক সময়।" (সহীহ মুসলিম: ২৭৫০)
সমাধান:
১. হতাশা দূর করুন: শয়তান চায় আপনি দ্বীন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। আপনার এই অনুশোচনাই প্রমাণ করে আপনার অন্তরে ইমানের আলো এখনো জ্বলছে।
২. ছোট আমল দিয়ে শুরু করুন:
- প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে পড়ার চেষ্টা করুন, যদিও মন না থাকে।
- নামাজের পর অন্তত একবার "আস্তাগফিরুল্লাহ" বলুন।
- প্রতিদিন ১ পৃষ্ঠা কুরআন তিলাওয়াত করুন।
- বেশি বেশি দরুদ শরীফ পড়ুন।
৩. আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করুন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ
"বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছে, তারা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
৪. সৎ সঙ্গী বাছাই করুন: যারা দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত তাদের সাথে উঠাবসা করুন।
৫. দোয়া করুন:
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ
"হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন।" (তিরমিজি: ২১৪০)
মনে রাখবেন:
- ইবাদতে স্বাদ না পাওয়া আপনার ইবাদত বাতিল করে না। বরং আল্লাহর আদেশ পালনের নিয়তে নামাজ পড়লে সওয়াব পাওয়া যাবে।
- হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ أَحَبَّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ
"আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো সেই আমল যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়।" (সহীহ বুখারী: ৬৪৬৪)
আপনার করণীয়:
- তওবা করুন এবং নতুন করে দ্বীনের পথে ফিরে আসার সংকল্প করুন।
- প্রতিদিন অন্তত ২ রাকাত নফল নামাজ পড়ুন।
- আল্লাহর কাছে এই দোয়া করুন:
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
"হে আমাদের রব! আমাদের অন্তরকে সৎপথ প্রদর্শনের পর বক্র করো না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করো। নিশ্চয় আপনি মহাদাতা।" (সূরা আলে ইমরান: ৮)
*আল্লাহ তাআলা আপনার অবস্থা পরিবর্তন করে দেবেন, ইনশাআল্লাহ।