অন্য মাঝহাবের অপর আমল করা
Waswasa-OCD · Hanafi
Question
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় প্রশ্নকারিণী,
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। আপনি জানতে চেয়েছেন—নিশ্চিতভাবে (ওয়াসওয়াসা বা সন্দেহ থেকে বাঁচার জন্য) হুরমত (স্ত্রী-স্বামীর বৈধ সম্পর্ক) সংক্রান্ত মাসআলায় অন্য মাযহাবের অনুসরণ করা যাবে কি না?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: জরুরত ও প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে (যেমন: ওয়াসওয়াসা বা চরম সংকট) অন্য মাযহাবের অনুসরণ করা জায়েয আছে, তবে তা শর্তসাপেক্ষে। তবে সাধারণভাবে নিজ মাযহাব ছেড়ে অন্য মাযহাবের অনুসরণ করা উচিত নয়। বরং একজন মুজতাহিদ ফকিহ/আলেম/মুফতি সাহেবের অনুমতি নিয়ে উনার সমর্থনে অন্য মাযহাবের উপর আমল করা যাবে।
দলিল ও ব্যাখ্যা:
১. কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশ:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ "তোমরা যদি না জান, তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর।" (সূরা আন-নাহল: ৪৩)
এই আয়াতের নির্দেশনা হলো—সাধারণ মানুষের জন্য নিজের সমাজে প্রচলিত ও স্বীকৃত আলেম/মুফতির কাছে মাসআলা জানা এবং সেই অনুযায়ী আমল করা। নিজে নিজে মাযহাব বাছাই করা বা যেকোনো মাযহাব থেকে খুঁজে নেওয়া বিদআতের পথ খুলে দিতে পারে।
২. হানাফী ফিকহের মূলনীতি:
হানাফী মাযহাবের ইমামগণ (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ) সকলেই একমত যে, তাকলিদ (কোনো ইমামের অনুসরণ) করা ওয়াজিব এবং তা থেকে বের হওয়া জায়েয নয়। তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে যে, প্রয়োজন বা সংকটের সময় অন্য মাযহাবের অনুসরণ করা জায়েয হতে পারে, যদি তা শরীয়তের কোনো সুস্পষ্ট দলিলের পরিপন্থী না হয়।
৩. ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়া:
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর ফাতাওয়ায় লিখেছেন: "যখন কোনো ব্যক্তি ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত হয় এবং নিজ মাযহাবের অনুসরণে তার সমস্যার সমাধান না হয়, তখন সে ক্ষেত্রে অন্য মাযহাবের অনুসরণ করা জায়েয, তবে শর্ত হলো—সে যেন এটাকে 'সহজ সমাধান' হিসেবে না নেয়, বরং শরীয়তের দলিলের ভিত্তিতে গ্রহণ করে।"
- আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ইমদাদুল ফাতাওয়ায় বলেন: "ওয়াসওয়াসা রোগীদের জন্য অন্য মাযহাবের অনুসরণ করা রুখসত (অনুমতি) হিসেবে জায়েয, কিন্তু তা স্থায়ীভাবে নয়, বরং শুধু সেই নির্দিষ্ট মাসআলার জন্য।"
৪. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন):
ইবনে আবিদীন (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে লিখেছেন:
"يَجُوزُ التَّقْلِيدُ لِلْأَعْلَمِ وَالْأَوْرَعِ مِنْ غَيْرِهِ، وَإِذَا وَقَعَ فِي ضِيقٍ جَازَ لَهُ الْعَمَلُ بِقَوْلِ مَنْ يُفْتِيهِ مِنَ الْمُجْتَهِدِينَ" "যখন কোনো ব্যক্তি সংকটে পড়ে, তখন তার জন্য অন্য মুজতাহিদের মতামত অনুযায়ী আমল করা জায়েয।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৫৮)
৫. হুরমতের মাসআলায় বিশেষ নির্দেশনা:
হুরমত (স্ত্রী-স্বামীর সম্পর্ক) অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। এখানে তালাক বা হুরমত সংক্রান্ত মাসআলায় অন্য মাযহাবের অনুসরণ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কারণ:
- যদি কোনো মাসআলায় অন্য মাযহাব অনুযায়ী আমল করা হয়, কিন্তু পরে দেখা যায় যে, সেই আমলটি নিজ মাযহাবের কোনো সুস্পষ্ট দলিলের পরিপন্থী, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
- মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন: "হুরমত বা তালাকের মাসআলায় অন্য মাযহাবের অনুসরণ করা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে করতে হবে। কারণ এতে যদি ভুল হয়, তাহলে তা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই এ বিষয়ে সরাসরি কোনো বিশ্বস্ত মুফতির পরামর্শ নেওয়া জরুরি।"
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে ব্যবহারিক সমাধান:
যেহেতু আপনি ওয়াসওয়াসা (OCD) তে ভুগছেন এবং প্রশ্ন ৫০৭৬-এর আলোকে জানতে চেয়েছেন, তাই আমি বলব:
১. ওয়াসওয়াসা রোগীদের জন্য ইসলামী ফিকহে বিশেষ ছাড় (রুখসত) রয়েছে। ওয়াসওয়াসা একটি মানসিক রোগ, এবং রোগীর জন্য শরীয়তের পূর্ণাঙ্গ বিধান প্রযোজ্য নয়, বরং তার জন্য সহজ সমাধান গ্রহণ করা উচিত।
২. হুরমতের মাসআলায় যদি আপনি নিশ্চিতভাবে জানতে চান যে, আপনার সম্পর্ক হালাল কি না, তাহলে সরাসরি কোনো বিশ্বস্ত হানাফী মুফতির কাছে প্রশ্নটি উপস্থাপন করুন। তিনি আপনার অবস্থা বুঝে যদি দেখেন যে, অন্য মাযহাবের অনুসরণ করা আপনার জন্য প্রয়োজনীয়, তাহলে তিনি আপনাকে সেটির অনুমতি দেবেন।
৩. নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। কারণ হুরমতের মাসআলা অত্যন্ত সূক্ষ্ম। এখানে ভুল করলে তা গুনাহের কারণ হবে। তাই সরাসরি মুফতি সাহেবের শরণাপন্ন হওয়াই উত্তম।
উপসংহার:
- সাধারণ অবস্থায়: নিজ মাযহাব (হানাফী) অনুযায়ী আমল করা ওয়াজিব।
- ওয়াসওয়াসা বা সংকটের অবস্থায়: অন্য মাযহাবের অনুসরণ করা জায়েয, তবে তা বিশ্বস্ত মুফতির পরামর্শক্রমে এবং শুধু সেই নির্দিষ্ট মাসআলার জন্য।
- হুরমতের মাসআলায়: অত্যন্ত সতর্কতা প্রয়োজন। সরাসরি মুফতির কাছে প্রশ্ন উপস্থাপন করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে ওয়াসওয়াসা থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখুন এবং আপনার সমস্যার সমাধান করুন। আমিন।