মেডিকেল পড়া প্রসঙ্গে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি ভবিষ্যতে ডাক্তার হইতে চাই। শুধুমাত্র এই নিয়তে যে যাতে আল্লাহর সন্তুষ্ট অর্জিত হয়। এবং দিনই বোনদের খেদমতে। এছাড়া আমার আর কোন উদ্দেশ্য নেই। তবে আমি আমার এক সিনিয়ার আপুর থেকে জানতে পেরেছি যে মেডিকেলে পড়তে গেলে ইন্টার্ন করার সময় অনেক সময় ফিমেল স্টুডেন্ট হয়েও পুরুষ পেশেন্টের পিছনে প্রাইভেট পার্ট দেখতে হয়। আবার অনেক সময় নাইট ডিউটি থাকে। এক্ষেত্রে ডাক্তারি পড়া কি জায়েজ মেয়েদের জন্য। আর তাছাড়া আমার পরিবার থেকে সবাই চাই আমি ডাক্তারি পড়াশোনা করি। আমিও চাই। কিন্তু মেডিকেল পড়তে গেলে তো পর্দার লঙ্ঘন হবে। এক্ষেত্রে আমার কি করা উচিত। আমি আমার পরিবারকে ভুলতেও পারবোনা যে আমি ডাক্তারি পড়তে পারবো না। তখন আমার মা-বাবা আমার উপর খুবই অসন্তুষ্ট হবেন। এমনিতে তারা আমার উপর অনেক অসন্তুষ্ট।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার নিয়ত খুবই মহৎ—আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং বোনদের সেবা করা। এটি সত্যিই প্রশংসনীয়। তবে ইসলামী বিধান অনুযায়ী, পর্দা (হিজাব) রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষের উপর ফরজ। এই ফরজ বিধান লঙ্ঘন করে কোনো কাজ করা জায়েজ নয়।
মেডিকেল পড়া এবং পর্দার বিধান:
১. মৌলিক নীতি: ইসলামে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য পর্দা করা ফরজ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে।" (সূরা আন-নূর: ৩১)।
২. মেডিকেল পড়ার শর্ত: মেয়েদের জন্য ডাক্তারি পড়া জায়েজ হতে পারে যদি নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূরণ হয়:
- পর্দার কঠোরভাবে প্রতিপালন: ক্লাসে, হাসপাতালে এবং ইন্টার্নশিপের সময় সম্পূর্ণ পর্দা বজায় রাখা। অর্থাৎ, শরীরের এমন অংশ (সতর) ঢেকে রাখা যা অন্য পুরুষের সামনে প্রকাশ করা হারাম।
- পুরুষ রোগী দেখার প্রয়োজনীয়তা: শুধুমাত্র জরুরি অবস্থায় এবং কোনো নারী ডাক্তার না থাকলে, অথবা রোগীর জীবন রক্ষার জন্য একান্ত প্রয়োজন হলে পুরুষ রোগী দেখা যেতে পারে। তবে সেক্ষেত্রেও পর্দার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে এবং একা না যাওয়া, অন্য নারী সহচরী রাখা ইত্যাদি।
- নাইট ডিউটি: নারীদের জন্য রাতের ডিউটি করা নিরাপত্তার দিক থেকে এবং পর্দার দিক থেকে সমস্যাজনক। যদি কোনো নারী ডাক্তার না থাকে এবং রোগীর জীবন রক্ষার জন্য জরুরি হয়, তাহলে শর্তসাপেক্ষে করা যেতে পারে, তবে সাধারণত নারীদের জন্য নাইট ডিউটি এড়িয়ে চলা উচিত।
৩. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি: হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়া শামী) এবং ফাতাওয়া হিন্দিয়া-তে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, নারীর জন্য তার সতর (পুরুষের সামনে) ঢেকে রাখা ফরজ। এমন কোনো কাজে অংশ নেওয়া যা পর্দা লঙ্ঘন করে, তা নিষিদ্ধ। তবে যদি কোনো রোগীর জীবন রক্ষার জন্য জরুরি অবস্থা হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিমাণ দেখা বা চিকিৎসা করা জায়েজ হতে পারে, কিন্তু তা শুধুমাত্র প্রয়োজনের তাগিদে।
আপনার জন্য করণীয়:
১. আপনার নিয়ত পরিবর্তন করুন: আপনি শুধুমাত্র বোনদের (নারী রোগীদের) সেবা করার জন্য ডাক্তারি পড়তে চান। এটি খুবই উত্তম। আপনি যদি শুধুমাত্র নারী রোগীদের চিকিৎসা করার জন্য পড়াশোনা করেন এবং পুরুষ রোগীদের থেকে দূরে থাকার সংকল্প করেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ আপনার জন্য এটি জায়েজ হতে পারে। তবে বাস্তবিকভাবে মেডিকেল শিক্ষায় ইন্টার্নশিপের সময় পুরুষ রোগী দেখা প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। তাই এই বিষয়ে আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে।
২. বিকল্প পথ: আপনি যদি ডাক্তারি পড়তে চান, তাহলে গাইনোকোলজি (স্ত্রীরোগ) বা শিশু বিশেষজ্ঞ (যেখানে নারী রোগী বেশি) বিষয়ে specialization করতে পারেন। তবে ইন্টার্নশিপের সময় তো সব বিষয়েই ঘুরতে হয়। তাই আপনি যদি মনে করেন যে আপনি পর্দা রক্ষা করে এই শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারবেন না, তাহলে এমন কোনো ব্যবস্থা যেখানে শুধুমাত্র নারী রোগীদের সেবা করা হয়, এটি একটি উত্তম বিকল্প হতে পারে। তাছাড়া ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক বেশি নিরাপদ এবং সম্মানজনক।
৩. পরিবারের সাথে আলোচনা: আপনার পরিবার চায় আপনি ডাক্তার হন, কিন্তু ইসলামী বিধান লঙ্ঘন করে কোনো কাজ করা জায়েজ নয়। আপনি আপনার পরিবারের সাথে খোলাখুলি আলোচনা করুন এবং তাদেরকে বোঝান যে, আপনি ইসলামী পর্দার বিধান মেনে চলতে চান। আপনি যদি ডাক্তারি পড়তে গিয়ে পর্দা লঙ্ঘন করেন, তাহলে তা আল্লাহর নাফরমানি হবে, যা আপনার জন্য ক্ষতির কারণ হবে। আপনি তাদেরকে বিকল্প প্রস্তাব দিন, যা নারীদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা।
৪. মা-বাবার অসন্তুষ্টি: মা-বাবার অসন্তুষ্টি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে আল্লাহর নাফরমানি করে মা-বাবাকে খুশি করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "সৃষ্টিকর্তার (আল্লাহর) অবাধ্যতার বিষয়ে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (সহীহ বুখারী)। তাই আপনি যদি পর্দার কারণে ডাক্তারি না পড়তে পারেন, তাহলে এটি আপনার জন্য গুনাহ নয়, বরং সওয়াবের কাজ। আপনি তাদেরকে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সাথে বোঝানোর চেষ্টা করুন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তাদের অন্তর নরম হয়।
সারসংক্ষেপ:
- মেডিকেল পড়া মেয়েদের জন্য জায়েজ হতে পারে যদি পর্দা রক্ষা করা সম্ভব হয় এবং পুরুষ রোগী দেখা শুধুমাত্র জরুরি প্রয়োজনে সীমাবদ্ধ থাকে।
- তবে বাস্তবিকভাবে মেডিকেল শিক্ষায় পর্দা রক্ষা করা খুবই কঠিন, বিশেষ করে ইন্টার্নশিপের সময়।
- আপনার জন্য উত্তম হবে নারী রোগীদের সেবা করার জন্য এমন কোনো ব্যবস্থা খুজে বের করা যা শুধুমাত্র নারী রোগীদের জন্য বিশেষায়িত (যদি সম্ভব হয়)।
- মা-বাবার অসন্তুষ্টির ভয়ে আল্লাহর নাফরমানি করা যাবে না। তাদের সাথে বোঝাপড়া করুন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন এবং আপনার নেক নিয়ত পূরণ করুন। আমিন।
প্রচলিত সহশিক্ষা ব্যবস্থায়ও ফুকাহায়ে কেরাম নিজের ঈমান আমল ও গোনাহমুক্ত জীবন রক্ষার প্রত্যয়ে চিকিৎসা শিক্ষা গ্রহণের রুখসত বা অনুমতি প্রদান করে থাকেন।আল্লাহ আপনার নেক ইচ্ছাকে কবুল করুক।আমীন।