নন মাহরামের সহিত কুশলাদি বিনিময় প্রসঙ্গে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমার বিয়ের পর থেকেই আমার ননদের স্বামীর সঙ্গে আমাকে দেখা ও পর্দা করা নিয়ে কিছুটা ঝামেলা চলছে। ওয়ালিমার দিন পর্দা মেইনটেইন করে তাঁর সামনে গিয়ে সালাম দিতে বলা হলেও আমি তা করিনি। পরবর্তীতে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পড়ে আমি পর্দার আড়াল থেকে তাঁর কুশলাদি বিনিময়ের চেষ্টা করি। কিন্তু এতে তিনি আমাকে অপমানিত করেন।
এরপর বিষয়টি নিয়ে তিনি তাঁর স্ত্রীর (আমার ননদের) সঙ্গে অশান্তি করেন। ফলে তাঁদের সংসারে সমস্যা তৈরি হচ্ছে এবং একই সঙ্গে ভাই-বোনের সম্পর্কও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আমি ইচ্ছাকৃতভাবে কারও অসম্মান করতে চাইনি। নিজের পর্দা ও দ্বীনি সীমারেখা বজায় রাখার পাশাপাশি পারিবারিক সম্পর্কও সুন্দর রাখতে চাই। কিন্তু পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, আমি কীভাবে চললে একদিকে পর্দা রক্ষা হবে, অন্যদিকে তাঁদের সংসার ও ভাই-বোনের সম্পর্কও নষ্ট হবে না—এ বিষয়ে দ্বিধায় আছি।
এ অবস্থায় আমার কী করা উচিত? আমি কি তাঁর সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে যোগাযোগ বন্ধ রাখব, নাকি পর্দার আড়াল থেকে প্রয়োজনীয় কুশলাদি বা সালামের জবাব দেওয়া যেতে পারে? একই সঙ্গে তাঁদের সংসারে অশান্তি সৃষ্টি না করে এবং আমার নিজের সম্মান ও পর্দা বজায় রেখে কীভাবে বিষয়টি সামলানো উচিত—দয়া করে পরামর্শ দিলে উপকৃত হব।
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার পরিস্থিতি বুঝতে পেরে সহানুভূতি জানাচ্ছি। আসুন আমরা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।
পর্দার বিধান
আপনার ননদের স্বামী (যিনি আপনার ভাসুর) আপনার জন্য গায়রে মাহরাম। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে পর্দা করা ফরজ। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে।" (সূরা আন-নূর: ৩১)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, গায়রে মাহরামের সামনে সম্পূর্ণ পর্দা করা ওয়াজিব। শুধু মুখমণ্ডল ও হাতের তালু পর্যন্ত (যা সাধারণত খোলা থাকে) দেখা যেতে পারে, তবে ফিতনার আশঙ্কা থাকলে তা-ও ঢেকে রাখা উচিত।
সালাম ও কুশলাদি বিনিময়
গায়রে মাহরামের সাথে সালাম বিনিময় বা কুশলাদি জিজ্ঞাসা করা জায়েয আছে যদি তা পর্দার আড়াল থেকে হয় এবং কোনো প্রকার ফিতনার আশঙ্কা না থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে মহিলারা পর্দার আড়াল থেকে পুরুষদের সাথে কথা বলতেন।
তবে পর্দার আড়াল থেকে হলেও যদি তাতে ফিতনার আশঙ্কা থাকে অথবা অন্যপক্ষ তা অপমানজনকভাবে গ্রহণ করে, তবে তা পরিহার করা উচিত।
আপনার করণীয়
১. পর্দা রক্ষা করা আপনার অগ্রাধিকার - ইসলামী বিধান অনুযায়ী, পর্দা রক্ষা করা আপনার উপর ফরজ। কোনো পারিবারিক সম্পর্কের খাতিরে আপনি পর্দার বিধান লঙ্ঘন করতে পারবেন না।
২. যোগাযোগের সীমা - আপনি পর্দার আড়াল থেকে প্রয়োজনীয় কথা বলতে পারেন, তবে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বা কুশলাদি বিনিময় এড়িয়ে চলা উত্তম। যদি দেখেন আপনার কুশলাদি জিজ্ঞাসা করায় তিনি অপমানিত হন বা সমস্যা তৈরি হয়, তবে তা বন্ধ রাখুন।
৩. স্বামীর মাধ্যমে যোগাযোগ - প্রয়োজনে আপনার স্বামীর মাধ্যমে তাঁর কাছে সালাম পৌঁছে দিতে পারেন। এতে পর্দাও রক্ষা হবে এবং সম্পর্কও বজায় থাকবে।
৪. দ্বন্দ্ব নিরসনে - আপনার ননদ বা তার স্বামীর সাথে সরাসরি দ্বন্দ্বে জড়াবেন না। বিষয়টি আপনার স্বামীকে জানান এবং তিনি যেন মধ্যস্থতা করেন।
৫. দোয়া করুন - আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি পরিস্থিতি উন্নত করেন এবং সবার মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টি করেন।
গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের মধ্যে সম্পর্ক মীমাংসা কর।" (সূরা আল-আনফাল: ১)
উপসংহার
আপনার কর্তব্য হলো:
- পর্দা রক্ষা করা (এটি অপরিহার্য)
- প্রয়োজনে পর্দার আড়াল থেকে সংক্ষিপ্ত ও প্রয়োজনীয় কথা বলা যেতে পারে
- অপ্রয়োজনীয় কুশলাদি বিনিময় এড়িয়ে চলা
- বিষয়টি স্বামীকে জানিয়ে তার মাধ্যমে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করা
- ধৈর্য ধারণ করা এবং দোয়া করা
আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম পথ প্রদর্শন করুন এবং আপনার পারিবারিক সম্পর্ক সুন্দর রাখুন। আমিন।