বাবার বাড়িতে সুদের টাকা এবং পান বিক্রি টাকা য় সংসার চললে বাবার বাড়িতে যাওয়া উচিত হবে?
Miscellaneous Fiqh · Shafei
Question
Answer
বাবার বাড়িতে সুদের টাকা ও পান বিক্রির টাকায় সংসার চললে সেখানে যাওয়া প্রসঙ্গে
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনার বাবার বাড়িতে সুদের টাকা এবং পান বিক্রির আয় দিয়ে সংসার চলে। আপনার বাবা জ্ঞান-বুদ্ধিতে দুর্বল, তাই তিনি সঠিকভাবে চলতে পারেন না। আপনার কোনো ভাই নেই, দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। পান ক্ষেত থেকে বেশি আয় হয় না। আপনি জানতে চান, বাবার বাড়িতে গেলে আপনার গুনাহ হবে কি না?
উত্তর
১. সুদের টাকা খাওয়া হারাম
কুরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী সুদ (রিবা) খাওয়া সম্পূর্ণ হারাম এবং কবিরা গুনাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ "হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ "রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুদ খাওয়াকারী, সুদ খাওয়ানোকারী, সুদের লেখক এবং সুদের সাক্ষীদ্বয়ের উপর লানত করেছেন।" (সহীহ মুসলিম: ১৫৯৭)
২. বাবার বাড়িতে যাওয়া কি গুনাহ হবে?
মূল নীতি: বাবার বাড়িতে যাওয়া এবং বাবার সাথে সদাচরণ করা আপনার জন্য আবশ্যক (ওয়াজিব) — এটি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার অংশ। তবে সেখানে গিয়ে আপনি যদি সুদের টাকায় উপকৃত হন বা সুদের লেনদেনে অংশগ্রহণ করেন, তাহলে সেটি আপনার জন্য সমস্যার কারণ হবে।
শাফিঈ মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি:
ইমাম শাফিঈ (রহ.) এবং শাফিঈ ফকিহগণ বলেন, হারাম অর্থে উপকৃত হওয়া (খাওয়া, পান করা, ব্যবহার করা) হারাম। কিন্তু হারাম টাকার মালিকের বাড়িতে যাওয়া বা তার সাথে উঠাবসা করা নিজে হারাম নয়, যদি না কেউ জানা সত্ত্বেও সেই হারাম অর্থে উপকৃত হয়।
ইমাম নববী (রহ.) তার আল-মাজমু' গ্রন্থে বলেন:
"যদি কারো সম্পদের অধিকাংশই হারাম হয় এবং কিছু হালালও থাকে, তাহলে তার কাছ থেকে নেওয়া বা তার দাওয়াত গ্রহণ করা মাকরুহ (অপছন্দনীয়) — যদি না জানা যায় যে, তিনি হালাল সম্পদ থেকে দিচ্ছেন। তবে যদি কেউ জানতে পারে যে, তিনি হারাম সম্পদ থেকে দিচ্ছেন, তাহলে তা গ্রহণ করা হারাম।"
ইবনে হাজার আল-হায়তামী (রহ.) তার তুহফাতুল মুহতাজ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:
"যে ব্যক্তির সম্পদ হারাম দ্বারা মিশ্রিত, তার সাথে লেনদেন করা এবং তার কাছ থেকে নেওয়া মাকরুহ, যদি না জানা যায় যে, তা হালাল সম্পদ থেকে।"
৩. আপনার করণীয়
আপনার বাবার বাড়িতে যাওয়া এবং তাকে দেখাশোনা করা আপনার জন্য জরুরি, বিশেষত যখন তার জ্ঞান-বুদ্ধি দুর্বল এবং তার দেখাশোনার কেউ নেই। তবে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো খেয়াল রাখুন:
ক. বাবার সেবা করা ওয়াজিব: বাবা অসহায় ও দুর্বল অবস্থায় থাকলে তার সেবা করা সন্তানের উপর ওয়াজিব। আপনি সেখানে গিয়ে তার খোঁজখবর নেবেন, তার প্রয়োজনীয় হালাল জিনিস কিনে দেবেন — এটি সওয়াবের কাজ।
খ. সুদের টাকায় উপকৃত হওয়া থেকে বিরত থাকুন: আপনি যদি জানেন যে, বাড়ির খরচ সুদের টাকায় চলে, তাহলে আপনি সেখানে গিয়ে সেই খাবার না খাওয়াই উত্তম। তবে যদি আপনি নিশ্চিত না হন যে, আপনার পরিবেশিত খাবারটি সুদের টাকায় কেনা হয়েছে (যেমন: কেউ উপহার দিয়েছে, বা অন্য হালাল উৎস থেকে এসেছে), তাহলে সেটি খেতে অসুবিধা নেই।
গ. বাবাকে নসীহত করুন: আপনার বাবা জ্ঞান-বুদ্ধিতে দুর্বল হলেও যতটুকু সম্ভব তাকে সুদ থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিন। যদি তিনি বুঝতে না পারেন, তাহলে অন্তত তার সুদের লেনদেন বন্ধ করার চেষ্টা করুন বা কোনো বিজ্ঞ আলেমের সাথে যোগাযোগ করান।
ঘ. পান বিক্রির টাকা: পান ক্ষেত থেকে আয় হালাল। যদি পান বিক্রির টাকা হালাল হয় এবং তা দিয়ে সংসার চলে, তাহলে সেখানে গিয়ে পান বিক্রির টাকায় কেনা খাবার খাওয়া জায়েজ। তবে যদি সুদের টাকাও মিশ্রিত থাকে, তাহলে সতর্কতা অবলম্বন করুন।
৪. গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা (শাফিঈ মাযহাব)
ইমাম আল-গাযযালী (রহ.) তার ইহইয়া উলুমিদ্দীন গ্রন্থে বলেন:
"যদি কোনো ব্যক্তির সম্পদ হালাল-হারাম মিশ্রিত হয়, তাহলে তার কাছ থেকে নেওয়া থেকে বিরত থাকা উত্তম, তবে তা হারাম নয় যদি না জানা যায় যে, নির্দিষ্ট বস্তুটি হারাম সম্পদ থেকে এসেছে।"
শাফিঈ ফকিহগণের নীতি: কোনো বস্তু হারাম হবে তখনই, যখন নিশ্চিতভাবে জানা যাবে যে, তা হারাম উপার্জন থেকে এসেছে। সন্দেহের ভিত্তিতে হারাম বলা যাবে না।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনার বাবার বাড়িতে যাওয়া গুনাহের কাজ নয় — বরং এটি আপনার জন্য সওয়াবের কাজ, বিশেষত যখন আপনার বাবা অসহায় এবং দেখাশোনার প্রয়োজন। তবে সেখানে গিয়ে আপনি যদি জানা সত্ত্বেও সুদের টাকায় কেনা খাবার খান বা সুদের টাকায় উপকৃত হন, তাহলে সেটি আপনার জন্য গুনাহ হবে।
আপনার করণীয়:
- বাবার বাড়িতে যান এবং তার সেবা করুন — এটি ওয়াজিব।
- সুদের টাকায় কেনা খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন, যদি নিশ্চিত হন।
- পান বিক্রির হালাল টাকায় কেনা খাবার খেতে পারেন।
- বাবাকে সুদ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করুন।
- প্রয়োজনে স্থানীয় আলেমের সাহায্য নিন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।