"তোমার যদি বেশি মনে চায় তাহলে যাও গিয়ে" এরকম কথা বলার দ্বারা কি কোনো সমস্যা হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আসসালামু আলাইকুম
আমার হাসবেন্ড আমার সাথে রাগ করে বলে যে আমি তার সংসারের জন্য কিছু করি না,আর্থিকভাবে সাহায্য ও করি না।এসব বলার এক পর্যায়ে তিনি বলেন যে আমার উচিত ছিলো ইউরোপ -আমেরিকা প্রবাসী কাউকে বিয়ে করা।আর উনার উচিত ছিলো তার চেয়ে ১০ বছরের ছোট কোনো অশিক্ষিত মেয়েকে বিয়ে করা।।তো আমি এসব কথার উত্তরে বলি যে,"তাহলে তুমি ভেবে দেখো কি করবা,এখনো সময় আছে,আমার আসলেই প্রবাসী বিয়ে করা উচিত ছিলো।"
তো এসবের উত্তরে তিনি বলেন,"তোমার যদি বেশি মন চায় তাহলে করো গিয়ে।"
আমি বলসি,"এখন বিয়ে করলে তো ওই বিয়ে অবৈধ হবে,তুমি কি আমাকে ছেড়ে দিবা নাকি।"
তো সে উত্তরে বলে,"তোমার যদি বেশি মনে চায় তাহলে যাও গিয়ে"
এই কথাটা কয়েক বার বলসে।
আমি জিজ্ঞেস করসি তুমি কি আমাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য বলতেসো? উনি সেই কথার উত্তরে ও উপরের কথা টাই বলসে যে তোমার যদি বেশি মনে চায়,যাও গিয়ে।
তিনি নিজে তালাক দিচ্ছে এই নিয়তে বলে নাই কিন্তু উনি আমার ইচ্ছার উপরে বলসে।
এমতবস্থায় কি আমাদের মধ্যে তালাক পতিত হবে??
দয়া করে উত্তর দিবেন জনাব
জাযাকাল্লাহ
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
উল্লিখিত ঘটনায় কোনো তালাক পতিত হয়নি। স্বামী কর্তৃক "তোমার যদি বেশি মন চায় তাহলে যাও গিয়ে" বলা স্পষ্ট তালাকের শব্দ নয় এবং তিনি তালাকের নিয়তও করেননি। তাই বিবাহ বহাল আছে। তবে এই ধরনের কথা বলা অনুচিত এবং দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। আপনারা উভয়ে ধৈর্য ধরে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করুন।
বিস্তারিত জবাব:
ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী তালাকের জন্য স্পষ্ট (সরীহ) বা অস্পষ্ট (কিনায়া) শব্দের প্রয়োগ এবং নির্দিষ্ট নিয়ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে স্বামী যে বাক্যগুলো বলেছেন, তা বিশ্লেষণ করে দেখা যাক:
-
"তোমার যদি বেশি মন চায় তাহলে করো গিয়ে" / "যাও গিয়ে" – এটি তালাকের স্পষ্ট শব্দ নয়। বরং এটি একটি অস্পষ্ট (কিনায়া) বাক্য। অস্পষ্ট বাক্যে তালাক পতিত হওয়ার জন্য স্বামীর নিয়ত আবশ্যক। যেহেতু স্বামী নিজে তালাক দেওয়ার নিয়ত করেননি, বরং তিনি স্ত্রীর ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন, তাই এখানে তালাক পতিত হয়নি।
- ফাতওয়া উসমানী (৩/২৫৬) তে এসেছে:
"কিনায়া শব্দে তালাক দেওয়ার জন্য সুস্পষ্ট নিয়ত (অথবা প্রমাণিত প্রেক্ষাপট) আবশ্যক। অন্যথায় তালাক পতিত হবে না।"
- ফাতওয়া উসমানী (৩/২৫৬) তে এসেছে:
-
"তুমি ভেবে দেখো কি করবা, এখনো সময় আছে" – এটি তালাকের কোনো ইঙ্গিত নয়; এটি হুমকি বা উপদেশের মতো।
-
স্বামীর কথাবার্তার প্রেক্ষাপট – তিনি রাগের মুহূর্তে এসব বলেছেন এবং নিজে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেননি। বরং তিনি স্ত্রীর কথা অনুযায়ী স্ত্রীকে 'যেতে' বলেছেন, যা ইজাজ (অনুমতি) হিসেবে গণ্য হবে। ইজাজ তালাক নয়।
- রদ্দুল মুহতার (৩/২৪৫) এ উল্লেখ আছে:
"যদি স্বামী স্ত্রীকে বলে, 'তুমি যেখানে ইচ্ছা যাও' বা 'তোমার ইচ্ছা মতো করো', তাহলে এটি তালাক নয়, যতক্ষণ না তিনি তালাকের নিয়ত করেন।"
- রদ্দুল মুহতার (৩/২৪৫) এ উল্লেখ আছে:
-
স্ত্রীর প্রশ্ন "তুমি কি আমাকে ছেড়ে দিবা?" – স্বামী তার জবাবে একই বাক্য পুনরাবৃত্তি করেছেন, যা তালাকের ইচ্ছা প্রকাশ করে না। বরং তিনি স্ত্রীর ইচ্ছার ওপরেই সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিচ্ছেন।
-
হানাফি ফিকহের নীতি – তালাকের ক্ষেত্রে স্পষ্ট শব্দ (যেমন: "তোমাকে তালাক দিলাম") বা নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট ও নিয়ত অপরিহার্য। এখানে উভয়ই অনুপস্থিত।
- ইমাম আবু হানিফা (رحمة الله) এর মতে, রাগের সময় বলা অস্পষ্ট বাক্যে তালাক পতিত হয় না, যদি না স্বামী তা ভিন্নভাবে প্রমাণ করে।
(সূত্র: বাদায়েউস সানায়ে, ৩/১০১)
- ইমাম আবু হানিফা (رحمة الله) এর মতে, রাগের সময় বলা অস্পষ্ট বাক্যে তালাক পতিত হয় না, যদি না স্বামী তা ভিন্নভাবে প্রমাণ করে।
অতএব,
- তালাক পতিত হয়নি। আপনাদের বিবাহ বৈধ ও অটুট রয়েছে।
- তবে স্বামীর উচিত হবে এই ধরনের কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা এবং স্ত্রীর প্রতি ভালো ব্যবহার করা।
- স্ত্রীরও উচিত হবে ধৈর্য ধরে স্বামীর সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করা।
- ভবিষ্যতে তালাক সংক্রান্ত কোনো কথা বলা থেকে বিরত থাকুন, কারণ অজান্তে তালাক পতিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের দাম্পত্য জীবনে শান্তি ও সাফল্য দান করুন। আমিন।
জাযাকাল্লাহ খইরান।