মেয়েরা মেয়েদের অনলাইনে পড়ানো জায়েজ কি না
Halal and Haram · Hanafi
Question
একটি জরুরি মাসআলা জানতে চাই আপনার নিকট।
কয়েকজন বোন সম্বলিত ভাবে একটি একটি ইসলামিক পেইজ পরিচালন করছে। যেখানে ফ্রি তাজউইদ কোর্স , আমলি সুরা ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ক্লাস করানো হয় টেলিগ্রামে। ক্লাস সংক্রান্ত সব কাজ বোনেরাই করেন। যারা ক্লাস নেন প্রত্যেকেই তাজউইদ এর উপর পারদর্শী। আলেম প্রিপারেটরি কোর্স সম্পন্ন করেছেন। এবং উক্ত পেইজের সকল কোর্স ফ্রি। সপ্তাহে একদিন তালিম হয়। তালিমের বিষয় বস্তু তিনি নিজেই পছন্দ মতো বাছাই করেন। পেইজ টেলিগ্রাম সংক্রান্ত অর্থাৎ উক্ত পেইজের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বোনেরা ই পরিচালন করেন। এবং উনারা পরিচয় গোপন রাখেন যাতে করে অন্যদের প্রশংসায় নিজেদের মধ্যে রিয়া না প্রবেশ করে সেজন্যে। তবে কোনো ছাত্রী যদি নিজ থেকে প্রয়োজন অনুভব করে কার থেকে শিখছে জানার, সেক্ষেত্রে পরিচয় দেওয়া হয় উক্ত টিচারের। সম্প্রতি তারা ভাইদের নিয়ে ফিকির করছেন। কোনো পুরুষ টিচারের মাধ্যমে ভাইদের শিখার জন্য আলাদা সেক্টর করতে চাচ্ছেন। যেটা সম্পূর্ণ আলাদা থাকবে বোনদের কার্যক্রম থেকে।
এখন উক্ত পেইজের বোনেরা জানতে চাচ্ছেন শরীয়তের দৃষ্টিতে তাদের এই কাজগুলো সুন্নাহ সম্মত কি না! উনারা কাজগুলো চালিয়ে যাবেন কি না।
মেহেরবানী করে একটু জানাবেন ।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
আপনার প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, কয়েকজন বোন একটি ইসলামিক পেইজ পরিচালনা করছেন, যেখানে মহিলাদের জন্য তাজউইদ ও আমলি সূরা শেখানো হয় এবং সম্পূর্ণ কার্যক্রম মহিলাদের দ্বারাই পরিচালিত। এছাড়াও তারা ভাইদের জন্য আলাদা সেক্টর খোলার পরিকল্পনা করছেন, যেখানে পুরুষ শিক্ষক থাকবেন এবং তা সম্পূর্ণ আলাদা হবে।
শরীয়তের দৃষ্টিতে বিধান:
১. মহিলাদের জন্য মহিলা শিক্ষিকার মাধ্যমে শিক্ষাদান: ইসলামে নারীদের জন্য নারী শিক্ষিকার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করা সম্পূর্ণ বৈধ এবং উত্তম। এটি পর্দার বিধান রক্ষা করে এবং দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে সহায়ক। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে মহিলারা পুরুষ সাহাবীদের কাছ থেকে সরাসরি শিক্ষা নিতেন, তবে বর্তমান যুগে ফিতনার আশঙ্কায় আলেমগণ মহিলাদের জন্য মহিলা শিক্ষিকার মাধ্যমে শিক্ষার পরামর্শ দিয়েছেন। তাই বোনদের এই কার্যক্রম শরীয়তসম্মত এবং সওয়াবের কাজ।
২. পরিচয় গোপন রাখা (রিয়া থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে): পরিচয় গোপন রেখে ইখলাসের সাথে দ্বীনি কাজ করা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। রিয়া (লোক দেখানো) থেকে বাঁচার জন্য এটি একটি কার্যকর উপায়। তবে প্রয়োজনে ছাত্রীদের কাছে শিক্ষিকার পরিচয় প্রকাশ করা জায়েয, কারণ এটি আমানত ও বিশ্বস্ততার বিষয়।
৩. ভাইদের জন্য আলাদা সেক্টর: ভাইদের জন্য আলাদা সেক্টর খোলা এবং পুরুষ শিক্ষকের মাধ্যমে শিক্ষাদান সম্পূর্ণ বৈধ, যদি নিম্নোক্ত শর্তগুলো পালন করা হয়:
- পুরুষ ও মহিলাদের কার্যক্রম সম্পূর্ণ আলাদা থাকে।
- কোনো প্রকার মিশ্রণ (اختلاط) না থাকে।
- পুরুষ শিক্ষক শুধুমাত্র পুরুষ ছাত্রদের শিক্ষা দেন।
- মহিলারা পুরুষদের ক্লাসে অংশগ্রহণ করবে না এবং পুরুষ শিক্ষকদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করবে না।
৪. তালিমের বিষয়বস্তু নিজে বাছাই করা: তালিমের বিষয়বস্তু নিজে বাছাই করা জায়েয, তবে তা যেন কুরআন-সুন্নাহ ও সহিহ আকিদার ভিত্তিতে হয়। আলেমদের পরামর্শ অনুযায়ী বিষয় নির্বাচন করা উত্তম।
৫. ফ্রি কোর্স পরিচালনা: দ্বীনি শিক্ষা ফ্রি প্রদান করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। এটি সদকায়ে জারিয়ার মতো। তবে শিক্ষকদের নিজেদের প্রয়োজনীয়তা থাকলে তারা পারিশ্রমিক নিতে পারেন, তবে ফ্রি করানো উত্তম।
সতর্কতা:
- মহিলাদের জন্য অনলাইনে শিক্ষাদানের সময় তাদের কণ্ঠস্বর যেন অপ্রয়োজনীয়ভাবে পুরুষদের কাছে না পৌঁছায়। তবে মহিলাদের মধ্যে ক্লাস হলে সমস্যা নেই।
- ভাইদের সেক্টরে যেন কোনো মহিলা প্রশাসক হিসেবে সরাসরি জড়িত না হন, বরং একজন পুরুষ প্রশাসক নিয়োগ করা ভালো।
- পেইজের কার্যক্রম যেন সম্পূর্ণ ইসলামি আদর্শ ও পর্দার বিধান মেনে পরিচালিত হয়।
রেফারেন্স:
- কুরআন মজিদ: সূরা আহযাব, আয়াত ৫৯; সূরা নূর, আয়াত ৩০-৩১
- সহিহ বুখারী: হাদিস নং ১০১ (মহিলাদের শিক্ষার প্রতি উৎসাহ)
- রদ্দুল মুহতার: ১/৪০৬ (মহিলাদের শিক্ষার বিধান)
- ফাতাওয়া উসমানি: ২/১৮৫ (মহিলাদের অনলাইন শিক্ষা)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/২৩৪ (মহিলাদের শিক্ষাদান)
সিদ্ধান্ত: আপনাদের এই কার্যক্রম শরীয়তসম্মত এবং সুন্নাহ সম্মত, যদি পর্দার বিধান ও শর্তগুলো মানা হয়। বোনেরা এই কাজ চালিয়ে যেতে পারেন এবং ভাইদের জন্য আলাদা সেক্টর খোলাও বৈধ। তবে সর্বদা ইখলাস ও আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং কোনো প্রকার রিয়া বা প্রদর্শনী থেকে বাঁচতে হবে।
والله أعلم بالصواب