নতুন ঘরে প্রবেশের সুন্নতি আমল কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২/আল-ইমরানের ২৬-২৭ প্রতিদিন রাতে তিলাওয়াতে বিশেষ ফজিলত আছে?
৩/اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي زِيَارَةَ بَيْتِكَ الْحَرَامِ، وَارْزُقْنِي الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ، وَيَسِّرْ لِي سَبِيلَهُمَا، وَتَقَبَّلْهُمَا مِنِّي، وَاكْتُبْ لِي فِيهِمَا الْقَبُولَ وَالْبَرَكَةَ.
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে আপনার পবিত্র ঘর বায়তুল্লাহর যিয়ারতের সৌভাগ্য দান করুন। আমাকে হজ ও উমরাহ করার তাওফীক দিন। এগুলোর পথ আমার জন্য সহজ করে দিন। আমার পক্ষ থেকে তা কবুল করুন এবং এতে আমার জন্য কবুলিয়ত ও বরকত লিখে দিন।
নামাযের সিজদাতে এই দুয়াটা করা যাবে?যেহেতু এইটা কুরআন, হাদিসে না।
৪/কেউ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ক্যানভাস বানায় এখন এই নিয়তও করে 'যে এই ক্যানভাসের দুরুদ পড়বে আমিও সওয়াব পেতে থাকব' আবার টাকার বিনিময়ে বিক্রিও করে দিয়েছে তাহলে কি গুনাহ হবে?
মানে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোন জিনিস বা কাজ করা আবার এটি টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা, তাহলে কি আখিরাতে বিনিময় পাওয়া যাবেনা?
৫/নতুন ঘরে প্রবেশের সুন্নতি আমল কি?নতুন ঘর বন্ধ কিভাবে করবো যেন শয়তান থেকে হিফাজত থাকে?
Answer
জবাবঃ-
১/ কুরআন তিলাওয়াতের সময় শুদ্ধভাবে শেখানোর আগ্রহ নিয়ে পড়া কি রিয়া হবে?
উত্তর: আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। ইসলামি স্কলারদের মতে, নিয়তের (ইখলাস) সাথে অন্য কোনো পার্থিব বা সৃষ্টিজীবের প্রশংসা লাভের আকাঙ্ক্ষা মিশে গেলে তা রিয়া (লোক দেখানো) হয়ে যায়। তবে আপনার বর্ণনায়, আপনি তিলাওয়াত করছেন যেন সামনের ব্যক্তি (যার মাখরাজ ভুল আছে) তা শুনে শুদ্ধভাবে শেখার আগ্রহ অনুভব করে। এটি যদি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয় এবং আপনার উদ্দেশ্য হয় তাকে কুরআন শেখার পথে উদ্বুদ্ধ করা, তাহলে এটি রিয়া নয়, বরং এটি একটি সাওয়াবের কাজ (দাওয়াত ও তাবলীগের নিয়ত) হিসেবে গণ্য হবে।
তবে, যদি আপনার অন্তরে এই চিন্তা থাকে যে, "লোকটি আমার তিলাওয়াত শুনে আমাকে ভালো মনে করবে" বা "আমার প্রশংসা করবে" অথবা "আমি ভালো তিলাওয়াতকারী হিসেবে পরিচিত হব"—তাহলে সেটি রিয়া হবে এবং এর কারণে তিলাওয়াতের সাওয়াব নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি: রিয়া সম্পর্কে কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: "অতএব যে ব্যক্তি তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে।" (সূরা আল-কাহফ: ১১০)। রদ্দুল মুহতার (হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ)-এ উল্লেখ আছে যে, ইবাদতের মধ্যে সামান্য পরিমাণ রিয়া মিশ্রিত হলে তা ইবাদতকে বিনষ্ট করে দেয়।
সিদ্ধান্ত: আপনার নিয়ত যদি খালেস (শুদ্ধ) হয় এবং আপনি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অপর ভাইয়ের উপকারের জন্য তিলাওয়াত করেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ কোনো গুনাহ হবে না। তবে, নিজের নিয়তকে সর্বদা খালেস রাখার চেষ্টা করুন এবং মনে মনে এই দৃঢ় সংকল্প করুন যে, "আমি আল্লাহর জন্যই পড়ছি, আর যদি কেউ শেখে সেটা আল্লাহরই অনুগ্রহ।"
২/ আল-ইমরানের ২৬-২৭ আয়াত প্রতিদিন রাতে তিলাওয়াতের বিশেষ ফজিলত আছে কি?
উত্তর: সূরা আল-ইমরানের ২৬-২৭ নম্বর আয়াত দুটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। এই আয়াত দুটিতে আল্লাহর ক্ষমতা, রাজত্ব এবং রাত-দিনের পরিবর্তনের বর্ণনা রয়েছে।
হাদিসের আলোকে ফজিলত: হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাতে ঘুম থেকে উঠে এই আয়াত দুটি তিলাওয়াত করতেন।
- সুনানে আবু দাউদ ও তিরমিজি: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "একদা আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট রাত্রি যাপন করছিলাম। তিনি রাতে উঠে (তাহাজ্জুদের জন্য) গেলেন এবং সূরা আলে-ইমরানের শেষ দিকের আয়াতগুলো তিলাওয়াত করলেন।" (অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি সূরা আলে-ইমরানের ২৬-২৭ আয়াত তিলাওয়াত করেছেন)।
বিশেষ ফজিলত: এই আয়াত দুটিতে আল্লাহর কাছে রাজ্য ও ক্ষমতা প্রার্থনা করার এবং রাত-দিনের পরিবর্তনে চিন্তা করার শিক্ষা রয়েছে। অনেক আলেম এই আয়াত দুটি রাতে পড়ার বিশেষ গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন। তবে, প্রতিদিন রাতে নির্দিষ্টভাবে এই আয়াত দুটি পড়ার জন্য কুরআন বা সহিহ হাদিসে "বিশেষ ফজিলত" বা নির্দিষ্ট সংখ্যক বার পড়ার কথা বর্ণিত নেই। যা বর্ণিত আছে তা হলো, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) রাতে জাগ্রত হয়ে এই আয়াতগুলো তিলাওয়াত করতেন এবং এতে গভীর চিন্তা করতেন। তাই আপনি যদি নিয়মিত রাতে এই আয়াত দুটি তিলাওয়াত করেন এবং এর অর্থ অনুধাবন করেন, তবে এটি সুন্নতের অনুসরণ হবে এবং এর বরকত পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ।
৩/ নামাযের সিজদাতে কুরআন-হাদিসে বর্ণিত নয় এমন দুআ করা যাবে কি?
উত্তর: নামাযের সিজদা হলো বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার স্থান। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "বান্দার তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী অবস্থা হলো সিজদার সময়। তাই তোমরা সিজদায় বেশি বেশি দুআ করো।" (সহিহ মুসলিম)।
সিজদায় দুআ করার নিয়ম: ইসলামি স্কলারদের মতে, সিজদায় কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত দুআগুলো পড়া সর্বোত্তম। তবে, দুনিয়া ও আখিরাতের যেকোনো কল্যাণকর দুআ (যা কুরআন-হাদিসের পরিপন্থী নয়) সিজদায় করা জায়েয আছে।
- হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি: ফতোয়ায়ে আলমগিরি ও রদ্দুল মুহতারে উল্লেখ আছে, নামাযের মধ্যে (সিজদা বা অন্য অবস্থায়) দুনিয়ার যেকোনো বৈধ বিষয়ে দুআ করা জায়েয। তবে, মানুষের কাছে চাওয়ার মতো বিষয় (যেমন: "হে আল্লাহ! আমাকে অমুক জিনিস দান করুন") নামাযের মধ্যে করা মাকরুহ (অপছন্দনীয়)। কিন্তু আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ প্রার্থনা করা সম্পূর্ণ জায়েয।
- আপনার উল্লেখিত দুআটি হলো হজ ও উমরাহ করার তাওফীক এবং বায়তুল্লাহ যিয়ারতের প্রার্থনা। এটি একটি পবিত্র ও কল্যাণকর দুআ। যেহেতু এটি কোনো মানুষের কাছে চাওয়া নয়, বরং আল্লাহর কাছে ইবাদত ও পবিত্র স্থান যিয়ারতের প্রার্থনা, তাই নামাযের সিজদায় এই দুআ করা জায়েয এবং উত্তম। তবে, মনে রাখবেন, নামাযের মধ্যে দুআ সবসময় আরবিতে করা উচিত এবং নিজের ভাষায় (বাংলায়) দুআ করা মাকরুহে তাহরিমি (গুরুতর অপছন্দনীয়)।
৪/ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ক্যানভাস বানিয়ে তা বিক্রি করলে কি গুনাহ হবে? আখিরাতে কি বিনিময় পাওয়া যাবে না?
উত্তর: আপনার প্রশ্নটি দুটি ভাগে বিভক্ত:
ক. ক্যানভাস বানিয়ে বিক্রি করা: যদি ক্যানভাসে দুরুদ বা কুরআনের আয়াত লেখা থাকে এবং আপনি তা বিক্রি করেন, তবে ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, কুরআনের আয়াত বা দুরুদ লেখা কাগজ/ক্যানভাস বিক্রি করা জায়েয আছে, তবে এর মূল্য হিসেবে কুরআনের পবিত্রতা রক্ষার খরচ (কাগজ, কালি, শ্রম) নেওয়া যাবে। (ফতোয়ায়ে শামি)।
খ. সওয়াবের নিয়ত ও বিনিময়: আপনি যদি ক্যানভাসটি বানানোর সময় এই নিয়ত করেন যে, "যারা এটি দেখবে বা পড়বে, তারা যেন দুরুদ পড়ে এবং আমিও সওয়াব পাই," এটি একটি ভালো নিয়ত। কিন্তু এরপর আপনি যদি সেটি টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেন, তাহলে ইসলামি নীতি হলো, একটি কাজের জন্য একই সাথে দুনিয়ার বিনিময় (টাকা) এবং আখিরাতের সওয়াব (প্রতিদান) উভয়টি কাম্য নয়।
- হানাফি ফিকহের নীতি: ফিকহের কিতাবে উল্লেখ আছে, যদি কেউ কোনো ইবাদত বা সৎকাজ সম্পাদন করে এবং এর বিনিময়ে দুনিয়ায় পারিশ্রমিক গ্রহণ করে, তাহলে তার জন্য আখিরাতের সওয়াব থেকে সেই অংশটি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সে সম্পূর্ণরূপে সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে।
- আপনার ক্ষেত্রে: আপনি যদি ক্যানভাসটি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বানিয়ে থাকেন এবং এর বিনিময়ে টাকা নেওয়ার পরও আপনার মূল উদ্দেশ্য যদি দাওয়াত ও দুরুদ প্রচার হয়, তাহলে আপনি সম্পূর্ণ সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবেন না, তবে আপনার নিয়তকে খালেস রাখা জরুরি।
- গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: আপনি যদি ক্যানভাসটি বিক্রির উদ্দেশ্যেই বানিয়ে থাকেন (ব্যবসা হিসেবে), তাহলে সেটি একটি দুনিয়াবি কাজ। এই কাজে আপনার দুরুদ প্রচারের নিয়ত থাকলে, আল্লাহর রহমতে আপনি নেক নিয়তের কারণে কিছু সওয়াব পেতে পারেন, কিন্তু এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে না, কারণ আপনি এর বিনিময় দুনিয়াতেই নিয়ে নিয়েছেন।
সিদ্ধান্ত: এটি গুনাহ নয়, তবে আখিরাতে পূর্ণ সওয়াব পাওয়ার জন্য আপনার নিয়ত হওয়া উচিত—"আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই কাজটি করছি, আর এর মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছি, এটি আমার দুনিয়াবি কাজ।" মনে রাখবেন, দুনিয়ার কাজ করেও যদি নিয়ত ভালো থাকে, তাহলে সেটিও ইবাদতে পরিণত হয়। তবে, একই কাজে দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের পূর্ণ বিনিময় আশা করা উচিত নয়।
৫/ নতুন ঘরে প্রবেশের সুন্নতি আমল ও শয়তান থেকে হিফাজতের উপায়
উত্তর: নতুন ঘরে প্রবেশের সময় কিছু সুন্নতি আমল ও দোয়া রয়েছে, যা শয়তান থেকে হিফাজতের মাধ্যম।
১. নতুন ঘরে প্রবেশের দোয়া (সুন্নত): নতুন ঘরে প্রবেশের সময় এই দোয়া পড়া সুন্নত:
بِسْمِ اللَّهِ وَلَجْنَا وَبِسْمِ اللَّهِ خَرَجْنَا وَعَلَى اللَّهِ رَبِّنَا تَوَكَّلْنَا উচ্চারণ: "বিসমিল্লাহি ওয়ালাজনা, ওয়া বিসমিল্লাহি খারাজনা, ওয়া 'আলাল্লাহি রাব্বিনা তাওয়াক্কালনা।" অর্থ: "আল্লাহর নামে আমরা প্রবেশ করলাম, আল্লাহর নামে আমরা বের হলাম এবং আমাদের রব আল্লাহর উপরই আমরা ভরসা করলাম।" (সুনানে আবু দাউদ)
২. নতুন ঘরকে শয়তান থেকে হিফাজত করার উপায়:
- সূরা বাকারার তিলাওয়াত: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না। নিশ্চয়ই যে ঘরে সূরা বাকারা পাঠ করা হয়, শয়তান সে ঘর থেকে বের হয়ে যায়।" (সহিহ মুসলিম)। তাই নতুন ঘরে প্রবেশের পর সূরা বাকারা তিলাওয়াত করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
- আয়াতুল কুরসি: ঘরে প্রবেশের পর আয়াতুল কুরসি পড়লে শয়তান ঘরের কাছে ঘেঁষতে পারে না।
- সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (আমানার রাসূলু): রাতে এই আয়াত দুটি পড়লে শয়তান থেকে হিফাজত থাকে।
- ঘরের কোণায় কোণায় তিলাওয়াত: নতুন ঘরের প্রতিটি কক্ষে গিয়ে সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে ঘরে ফুঁ দেওয়া উত্তম।
- সালাম ও দোয়া: ঘরে প্রবেশ করে أهل البيت (পরিবারের সদস্যদের) সালাম দেওয়া এবং তাদের জন্য দোয়া করা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ঘরে প্রবেশ করে সালাম দিলে এবং খাবারের সময় বিসমিল্লাহ বললে শয়তান ঘরে প্রবেশ করতে পারে না। (সহিহ মুসলিম)।
৩. নতুন ঘর বন্ধ করার নিয়ম: ঘর বন্ধ করার সময় বা রাতে ঘুমানোর আগে এই দোয়া পড়া উচিত:
بِسْمِ اللَّهِ "বিসমিল্লাহ" (আল্লাহর নামে) বলে দরজা বন্ধ করা। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাতে ঘুমানোর আগে বিসমিল্লাহ বলে দরজা বন্ধ করতে, বাতি নেভাতে এবং পাত্রগুলো ঢেকে দিতে বলেছেন। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।
সারসংক্ষেপ: নতুন ঘরে প্রবেশ করে প্রথমে ২ রাকাত নফল নামাজ পড়া (যদি সম্ভব হয়), তারপর সূরা বাকারা তিলাওয়াত করা এবং উপরোক্ত দোয়াগুলো পড়া শয়তান থেকে হিফাজতের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী উপায়।