বিবাহ এবং মৃত্যু

Family Life · Hanafi

Question No: 4903
Questioner: Asha Islam Mou
Question Asked: 03 Sep 2026, 06:55 PM
Reviewed & Published: 03 Sep 2026, 07:15 PM
Views: 32
Tokens: 8,404
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ, উস্তাদ।
একজন বোনের পক্ষ থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা জানতে চাচ্ছি।
একজন মুসলিম নারী আনুমানিক ৮/৯ বছর আগে একজন হিন্দু পুরুষকে বিয়ে করেন। তিনি স্বামীর হিন্দু পরিবারের সাথে বসবাস করতেন। তাদের দুটি সন্তান হয়—একজন ছেলে ও একজন মেয়ে। স্বামী ও সন্তানরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং হিন্দু হিসেবেই বড় হচ্ছিল। তবে ওই নারী নিজে হিন্দু ধর্মের কোনো আচার পালন করতেন না এবং নিজেকে মুসলিম মনে করতেন।এই বিয়ের কারণে তার পরিবার তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল।সম্প্রতি এক দুর্ঘটনায় ওই নারী, তার হিন্দু স্বামী এবং তাদের ছোট ছেলে মারা যায়। তাদের বড় মেয়ে জীবিত আছে এবং বর্তমানে তার হিন্দু দাদা-দাদির কাছে হিন্দু হিসেবে বড় হচ্ছে।ওই নারীকে মুসলিম হিসেবে জানাযা পড়িয়ে দাফন করা হয়েছে এবং তার স্বামী ও ছেলেকে হিন্দু রীতি অনুযায়ী দাহ করা হয়েছে।

আমাদের প্রশ্নগুলো হলো:
১. জীবিত মেয়েটি যেহেতু বর্তমানে হিন্দু দাদা-দাদির কাছে হিন্দু হিসেবে বড় হচ্ছে, তার সাথে তার মুসলিম নানা-নানী, খালা ইত্যাদি আত্মীয়রা কি যোগাযোগ রাখতে পারবেন? সে কি তাদের বাড়িতে যাতায়াত করতে বা কিছুদিন এসে থাকতে পারবে? তাকে ইসলামের দিকে দাওয়াত ও ইসলামী পরিবেশে রাখার জন্য আত্মীয়দের কী দায়িত্ব রয়েছে?
২. মেয়েটি হিন্দু হিসেবে বড় হচ্ছে। তার মায়ের নামে তার নানা-এর সম্পত্তিতে কোনো অংশ থাকলে, মেয়েটি কি সেই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে? অমুসলিম হওয়ার কারণে সে কি উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে? এ ক্ষেত্রে শরিয়ত অনুযায়ী সম্পত্তির বিধান কী?
৩. ওই নারী একজন হিন্দু পুরুষকে বিয়ে করে তার সাথে সংসার করেছেন—এটি গুরুতর গুনাহ। তিনি এখন ইন্তেকাল করেছেন। তার জীবদ্দশায় করা এই গুনাহের জন্য তার পরিবার কি তার পক্ষ থেকে কোনো কাফফারা, সদকা, দান বা অন্য কোনো নেক আমল করতে পারবে? করলে তার গুনাহ মাফ হওয়ার কোনো আশা আছে কি?
দয়া করে বিষয়গুলো পরিষ্কার করে জানালে উপকৃত হব।জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

Answer

উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর নিম্নরূপ দেওয়া হলো:

১. জীবিত মেয়েটির সাথে আত্মীয়দের সম্পর্ক ও দায়িত্ব

মেয়েটি বর্তমানে হিন্দু দাদা-দাদির কাছে বড় হচ্ছে। সে নাবালক (বালেগ নয়)। ইসলামী আইনে, একটি শিশু যে পর্যন্ত নিজে সঠিকভাবে ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম না হয়, সে পর্যন্ত তার ধর্মীয় অবস্থান তার অভিভাবকের অনুসরণে নির্ধারিত হয়। যেহেতু তার পিতা হিন্দু ছিলেন এবং সে তার পিতার পরিবারে বেড়ে উঠছে, তাই শরিয়তের দৃষ্টিতে সে বর্তমানে হিন্দু হিসেবে গণ্য হবে।

যোগাযোগ ও যাতায়াতের বিধান:

  • তার মুসলিম নানা-নানী, খালা ইত্যাদি আত্মীয়দের সাথে তার সম্পর্ক রাখা জায়েয আছে। ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করতে উৎসাহিত করে না। তারা তার সাথে সদয় আচরণ করতে পারবেন এবং তাকে ভালোবাসা দিতে পারবেন।
  • তবে, তাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে এসে কিছুদিন রাখা বা তাকে ইসলামী পরিবেশে রাখার চেষ্টা করা উচিত। কিন্তু মনে রাখতে হবে, যদি আদালত বা তার আইনি অভিভাবক (দাদা-দাদি) এর বিরোধিতা করেন, তাহলে জোর করে তাকে আটকে রাখা বা নিয়ে আসা আইনত ও শরিয়ততঃ উচিত হবে না, কারণ এতে পারিবারিক কলহ ও অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।

দাওয়াতের দায়িত্ব:

  • আত্মীয়দের উপর মেয়েটিকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তারা যখনই সুযোগ পাবেন, তাকে ভালোবাসা ও স্নেহের সাথে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে জানানোর চেষ্টা করবেন। তার সাথে দেখা-সাক্ষাতের সময় তাকে ইসলামের সুন্দর দিকগুলো তুলে ধরবেন। তার জন্য দোয়া করতে থাকবেন, যেন আল্লাহ তাকে হেদায়েত দান করেন।
  • মনে রাখতে হবে, হেদায়েত দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। আমাদের দায়িত্ব শুধু প্রচার করা এবং উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে ইসলামের আদর্শ তুলে ধরা। তার দাদা-দাদির সাথে সম্পর্ক ভালো রাখাও জরুরি, যাতে তারা মেয়েটিকে আত্মীয়দের সাথে দেখা করতে বাধা না দেয়।

২. মেয়েটির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিধান

আপনার প্রশ্নে উল্লেখ করেছেন, "তার মায়ের নামে তার নানা-এর সম্পত্তিতে কোনো অংশ থাকলে, মেয়েটি কি সেই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে?"

এখানে বিষয়টি দুটি পর্যায়ে বিবেচনা করতে হবে:

ক. মায়ের সম্পত্তিতে মেয়ের উত্তরাধিকার: মেয়েটির মা (যিনি মুসলিম ছিলেন) মারা গেছেন। তার মায়ের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে মেয়েটি শরিয়ত অনুযায়ী উত্তরাধিকারী হবে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আছে: ইসলামী আইনে, একজন মুসলিম উত্তরাধিকারী একজন অমুসলিমের কাছ থেকে এবং একজন অমুসলিম উত্তরাধিকারী একজন মুসলিমের কাছ থেকে উত্তরাধিকার পাবে না। (সূত্র: সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৭৬৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ২৯১০)।

যেহেতু মেয়েটি বর্তমানে হিন্দু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে (তার পিতা হিন্দু ছিলেন এবং সে হিন্দু পরিবেশে বড় হচ্ছে), তাই সে তার মুসলিম মায়ের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে না। তার মায়ের সম্পত্তি তার অন্যান্য মুসলিম আত্মীয়দের (যেমন: নানা-নানী, খালা ইত্যাদি) মধ্যে শরিয়ত অনুযায়ী বণ্টন হবে।

খ. নানা-এর সম্পত্তিতে মেয়ের অংশ: আপনি উল্লেখ করেছেন, "তার মায়ের নামে তার নানা-এর সম্পত্তিতে কোনো অংশ থাকলে"। এর অর্থ হলো, নানা-এর সম্পত্তিতে মায়ের যে অংশ প্রাপ্য ছিল, সেটি মায়ের মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে। যেহেতু মেয়েটি অমুসলিম, তাই সে তার মায়ের এই অংশের উত্তরাধিকারী হবে না। এই অংশটিও মায়ের অন্যান্য মুসলিম ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন হবে।

সারসংক্ষেপ: ইসলামী আইনে মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে পারস্পরিক উত্তরাধিকার নেই। তাই মেয়েটি তার মুসলিম মা ও নানা-এর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে না, যতক্ষণ না সে নিজে ইসলাম গ্রহণ করে। যদি সে ভবিষ্যতে ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে সে তার মায়ের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারবে, যদি মায়ের সম্পত্তি তখনও বণ্টন না হয়ে থাকে। তবে বণ্টনের পর তার আর কোনো দাবি থাকবে না।

৩. মৃত নারীর গুনাহের কাফফারা ও তার জন্য নেক আমল

ওই নারী একজন হিন্দু পুরুষকে বিয়ে করে সংসার করা ইসলামী শরিয়তে সম্পূর্ণ হারাম ও গুরুতর গুনাহের কাজ। (সূত্র: সূরা আল-বাকারা, ২:২২১; সূরা আল-মুমতাহিনা, ৬০:১০)। তিনি এ কাজ করে নিজের ঈমানের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছিলেন। তবে, যেহেতু তিনি নিজেকে মুসলিম মনে করতেন এবং হিন্দু ধর্মের আচার পালন করতেন না, তাই তাকে মুসলিম হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং তার জানাযা পড়ানো হয়েছে।

তার পক্ষ থেকে নেক আমল: হ্যাঁ, তার পরিবারের পক্ষ থেকে তার জন্য দান-সদকা, কাফফারা বা অন্য কোনো নেক আমল করা যাবে এবং এর মাধ্যমে তার গুনাহ মাফের আশা করা যেতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "যখন কোনো মানুষ মারা যায়, তখন তার আমলনামা বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি কাজের মাধ্যমে তার আমল চলতে থাকে: ১. সদকায়ে জারিয়া (এমন দান যার সওয়াব চলতে থাকে), ২. এমন জ্ঞান যা মানুষ উপকৃত হয়, এবং ৩. নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।" (সূত্র: সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৬৩১)।

তাই, তার পরিবারের উচিত:

  • তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে দোয়া করা।
  • তার পক্ষ থেকে দান-সদকা করা, বিশেষ করে সদকায়ে জারিয়া (যেমন: মসজিদ নির্মাণ, কূপ খনন, এতিমখানায় সাহায্য ইত্যাদি)।
  • তার পক্ষ থেকে হজ বা ওমরাহ করা (যদি সম্ভব হয়)।
  • তার জন্য কুরআন তিলাওয়াত করে দোয়া করা।

আল্লাহ তাআলা ইচ্ছা করলে তার এই গুনাহ মাফ করে দিতে পারেন, যদি তিনি তওবা করে থাকেন অথবা তার পরিবারের এই নেক আমলগুলো কবুল করেন। তবে, গুনাহ মাফ হবে কিনা তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না, কারণ এটি সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু। তার রহমতের আশা করা যেতে পারে।

উপসংহার: আপনার পরিবারের উচিত মৃত নারীর জন্য বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করা এবং তার পক্ষ থেকে দান-সদকা করা। জীবিত মেয়েটির জন্য দোয়া করা এবং তাকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। আল্লাহ তাআলা সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। (আমিন)

রেফারেন্স:

  • সূরা আল-বাকারা (২:২২১)
  • সূরা আল-মুমতাহিনা (৬০:১০)
  • সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৭৬৪
  • সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৬৩১
  • সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ২৯১০
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৭৬০-৭৬১ পৃষ্ঠা (উত্তরাধিকার সংক্রান্ত অধ্যায়)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.