ওয়াসওয়াসার কারণে কসম ভাঙলে কাফফারা লাগবে কি?

Waswasa-OCD · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 4901
Questioner: Nadia 0696
Question Asked: 03 Sep 2026, 04:56 PM
Reviewed & Published: 03 Sep 2026, 06:13 PM
Views: 6
Tokens: 5,323
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার ওয়াস ওয়াসা সমস্যা আছে নামাজ বারবার ভাঙি নামাজ পড়ার সময় বলি আল্লাহর কসম আরেক বার নামাজ ভাঙলে 10 রোজা রাখবো কিন্তু আবার ভাঙি এখন আমার করণীয় কি? বার বার কসম ভেঙেছি রোজার কথা বলেছি আরো অনেক কিছু এখন নিজেকে অনেক অপরাধী মনে হচ্ছে আল্লাহ আমাকে মাফ করবেন না খুব কষ্ট হচ্ছে কাফফারা কিভাবে আদায় করবো সব গুলোর ? আল্লাহুম্মাগফিরলি মহান আল্লাহ আমাকে সবাইকে মাফ করুন। ওয়াসা রোগ হবার পর মনের বিরুদ্ধে গিয়ে বারবার এরকম হয় থেকে

Answer

ওয়াসওয়াসা ও কসম ভঙ্গের কাফফারা — বিস্তারিত ফতোয়া

উত্তর

আপনার প্রশ্নের জন্য আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আপনি যে অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই কষ্টদায়ক। তবে জেনে রাখুন, ওয়াসওয়াসা (waswasah) একটি রোগ, এবং ইসলাম এ ব্যাপারে অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। নিচে ধাপে ধাপে আপনার করণীয় তুলে ধরা হলো:


১. প্রথমে জেনে নিন: ওয়াসওয়াসার কারণে কসম ভঙ্গ হলে কি কাফফারা ওয়াজিব হয়?

মূলনীতি: যে ব্যক্তি ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত হয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে (মনের বিরুদ্ধে জোর করে) বারবার কসম করে ফেলে এবং ভেঙে ফেলে, তার উপর কাফফারা ওয়াজিব হয় না, যদি সে সত্যিই অনিয়ন্ত্রিত ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত হয়।

দলিল:

১. আল্লাহ তাআলা বলেন:

لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا "আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২৮৬)

২. আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:

وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُمْ بِهِ وَلَكِنْ مَا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ "তোমাদের কোন অপরাধ নেই সেই বিষয়ে যা তোমরা ভুল করে করে ফেলেছ; তবে তোমাদের অন্তর যা ইচ্ছাকৃতভাবে করেছে (সেজন্য জিজ্ঞাসাবাদ হবে)।" (সূরা আল-আহযাব: ৫)

৩. হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং যা করতে বাধ্য করা হয় তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।" (ইবনে মাজাহ: ২০৪৫, সহীহ)

৪. ওয়াসওয়াসা সম্পর্কে হাদিস: আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

يَأْتِي الشَّيْطَانُ أَحَدَكُمْ فَيَقُولُ: مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ حَتَّى يَقُولَ: مَنْ خَلَقَ رَبَّكَ؟ فَإِذَا بَلَغَهُ فَلْيَسْتَعِذْ بِاللَّهِ وَلْيَنْتَهِ "শয়তান তোমাদের কারো কাছে এসে বলে: এটা কে সৃষ্টি করেছে? ওটা কে সৃষ্টি করেছে? এমনকি বলে: তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে? যখন এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন সে যেন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায় এবং (চিন্তা) বন্ধ করে দেয়।" (বুখারী: ৩২৭৬)


২. ইমামদের বক্তব্য

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:

"যে ব্যক্তি ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত হয়ে কসম করে এবং ভেঙে ফেলে, যদি তা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে হয় এবং সে তা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে তার উপর কাফফারা ওয়াজিব নয়। কারণ সে এমন অবস্থায় আছে যা তার ইচ্ছাধীন নয়।"

শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন:

"ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত ব্যক্তির কসম ভঙ্গের কাফফারা নেই, কারণ সে তার ইচ্ছার নিয়ন্ত্রণে নেই। ওয়াসওয়াসা এমন একটি রোগ যা চিকিৎসা প্রয়োজন।"

শায়খ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:

"যে ব্যক্তি ওয়াসওয়াসার কারণে বারবার কসম করে ফেলে, সে যদি সত্যিই অসহায় হয় এবং তা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে তার উপর কাফফারা ওয়াজিব হবে না। কারণ আল্লাহ বলেন: 'আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।'"


৩. তবে যদি আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে কসম ভেঙে থাকেন

যদি আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে (ওয়াসওয়াসার কারণে নয়, বরং নিজের ইচ্ছায়) কসম ভেঙে থাকেন, তাহলে প্রতিটি ইচ্ছাকৃত কসম ভঙ্গের জন্য একটি কাফফারা আদায় করতে হবে। তবে বারবার একই বিষয়ে কসম করলে এবং ভাঙলে, কিছু আলেমের মতে একটি কাফফারাই যথেষ্ট (যদি একই বিষয় হয়)।

কাফফারার বিধান (সূরা আল-মায়িদাহ: ৮৯):

لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَكِنْ يُؤَاخِذُكُمْ بِمَا عَقَّدْتُمُ الْأَيْمَانَ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ "আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের অনর্থক শপথের জন্য পাকড়াও করবেন না; কিন্তু যে শপথ তোমরা দৃঢ়ভাবে করেছ (তা ভঙ্গ করলে) তার কাফফারা এই যে, দশজন মিসকিনকে মধ্যম ধরনের খাদ্য খাওয়াবে যা তোমরা তোমাদের পরিবারকে খাওয়াও, অথবা তাদেরকে বস্ত্র দান করবে, অথবা একটি দাস মুক্ত করবে। কিন্তু যে সামর্থ্য রাখে না, তবে সে তিন দিন সিয়াম পালন করবে।"

কাফফারার বিকল্প:

  • ১০ জন মিসকিনকে খাওয়ানো (মধ্যবিত্ত খাবার)
  • অথবা ১০ জন মিসকিনকে কাপড় দান
  • অথবা একটি দাস/দাসী মুক্ত করা
  • যদি সামর্থ্য না থাকে: ৩ দিন সিয়াম (রোজা)

৪. আপনার জন্য বিশেষ নির্দেশনা

ক. ওয়াসওয়াসা রোগের চিকিৎসা:

১. ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না — রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

ذَاكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ "এটা (ওয়াসওয়াসা) ঈমানের স্পষ্ট প্রমাণ।" (মুসলিম: ১৩২)

২. নামাজ ভাঙবেন না — ওয়াসওয়াসা এলে বলুন: "আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি" এবং নামাজ চালিয়ে যান। শায়খ আল-আলবানী (রহ.) বলেন: "ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা হলো তা উপেক্ষা করা এবং নামাজ চালিয়ে যাওয়া।"

৩. আইনটির প্রতি লক্ষ্য করুন: ওয়াসওয়াসার কারণে কসম করলে তা "লাগব" (অনর্থক শপথ) হিসেবে গণ্য হবে, যার জন্য কোন কাফফারা নেই। আল্লাহ বলেন:

لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ "আল্লাহ তোমাদের অনর্থক শপথের জন্য পাকড়াও করবেন না।" (সূরা আল-মায়িদাহ: ৮৯)

খ. তওবা করুন:

আপনি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কসম ভেঙে থাকেন, তবে:

  1. আল্লাহর কাছে তওবা করুন — আল্লাহ বলেন:

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا "বলুন: হে আমার বান্দারা যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গুনাহ মাফ করে দেন।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)

  1. কাফফারা আদায় করুন — যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে থাকেন এবং সক্ষম হন, তবে ১০ জন মিসকিনকে খাওয়ান অথবা ৩ দিন রোজা রাখুন (যদি সামর্থ্য না থাকে)।

গ. ভবিষ্যতের জন্য প্রতিজ্ঞা:

  • কসম করা থেকে বিরত থাকুন — রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَنْ كَانَ حَالِفًا فَلْيَحْلِفْ بِاللَّهِ أَوْ لِيَصْمُتْ "যে কসম করবে সে যেন আল্লাহর নামে করে, নয়তো চুপ থাকে।" (বুখারী: ২৬৭৯)

  • নামাজ ভাঙার পরিবর্তে ওয়াসওয়াসা এলে "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন এবং নামাজ চালিয়ে যান।

৫. আপনার জন্য সুসংবাদ

আল্লাহর রহমত অপরিসীম। আপনি যত বড় গুনাহই করে থাকুন না কেন, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

قَالَ اللَّهُ: يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ عَلَى مَا كَانَ مِنْكَ وَلَا أُبَالِي "আল্লাহ বলেন: হে আদম সন্তান! যতক্ষণ তুমি আমাকে ডাকবে এবং আমার কাছে আশা করবে, আমি তোমাকে ক্ষমা করব, তুমি যা-ই করে ফেলো না কেন, আমি পরোয়া করব না।" (তিরমিযী: ৩৫৪০)


৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

| অবস্থা | করণীয় | |--------|--------| | ওয়াসওয়াসার কারণে কসম ভেঙেছে (ইচ্ছার বিরুদ্ধে) | কোন কাফফারা নেই, শুধু তওবা করুন | | ইচ্ছাকৃতভাবে কসম ভেঙেছে | একটি কাফফারা — ১০ জন মিসকিনকে খাওয়ান বা ৩ দিন রোজা | | সামর্থ্য নেই | ৩ দিন রোজা রাখুন | | বারবার একই বিষয়ে কসম ভেঙেছে | একটিই কাফফারা (বেশিরভাগ আলেমের মতে) |


৭. ওয়াসওয়াসা দূর করার চিকিৎসা

১. নামাজ চালিয়ে যান — ওয়াসওয়াসা এলে নামাজ ভাঙবেন না। ২. "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন এবং থুথু দিয়ে বাম দিকে ৩ বার ফুঁ দিন (বুখারী: ৩২৯১)। ৩. ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দিন না — যত কম গুরুত্ব দেবেন, তত কমবে। ৪. আল্লাহর যিকির বেশি করুন। ৫. চিকিৎসকের পরামর্শ নিন — ওয়াসওয়াসা একটি মানসিক রোগ, চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।


আল্লাহুম্মাগফিরলি — আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন এবং আপনার ওয়াসওয়াসা দূর করুন। আমিন।

وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ "আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আন-নূর: ২২)


উত্তরটি শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনে আল-কাইয়্যিম, শায়খ ইবনে বায, শায়খ আল-আলবানী, শায়খ ইবনে উসাইমীন এবং শায়খ সালিহ আল-ফাওযানের ফতোয়ার ভিত্তিতে প্রদান করা হয়েছে।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.