ওয়াওয়াসার কারণে আল্লাহর কসম আরেকবার নামাজ ভাঙলে এক টানা 10 রোজা রাখবো বললে করণীয় কি?

Waswasa-OCD · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 4892
Questioner: Nadia 0696
Question Asked: 03 Sep 2026, 04:13 PM
Reviewed & Published: 03 Sep 2026, 06:00 PM
Views: 38
Tokens: 4,161
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহু।
আমার ওয়াস ওয়াসা সমস্যা আছে নামাজ বারবার ভাঙি নামাজ পড়ার সময় বলি আল্লাহর কসম আরেক বার নামাজ ভাঙলে এক টানা 10 রোজা রাখবো কিন্তু আবার ভাঙি এখন আমার করণীয় কি? আমাকে ক্লান্ত করে দিয়েছে ওয়াস ওয়াসা ইবাদতে মন বসেনা গুনাগার মনে হয় ।আমার করণীয়? নামাজ বার বার ভাঙি মনে হয় তাকবীর বলিনি বললেও অজুতেও ওয়াস ওয়াসা আসে।আল্লাহুম্মাগফিরলি।

Answer

ওয়াসওয়াসা (Waswasa) সমস্যা ও নামাজ ভাঙার ব্যাপারে ইসলামী নির্দেশনা

উত্তর:

ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রিয় বোন, আপনার সমস্যা সম্পর্কে জানতে পেরে আমরা সত্যিই দুঃখিত। এটি একটি পরিচিত সমস্যা—ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) যা অনেক মুমিনকে কষ্ট দেয়। আশা করি নিচের উত্তরটি আপনার জন্য উপকারী হবে।


১. ওয়াসওয়াসা কী এবং এর উৎস

ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের পক্ষ থেকে আসা সন্দেহ ও কুমন্ত্রণা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"শয়তান মানুষের কাছে আসে এবং বলে—'এটা কে সৃষ্টি করেছে? ওটা কে সৃষ্টি করেছে?' এমনকি বলে—'আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে?' যখন কেউ এরূপ অনুভব করে, সে যেন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায় এবং এই চিন্তা ছেড়ে দেয়।" — সহীহ বুখারী: ৩২৭৬; সহীহ মুসলিম: ১৩৪

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, যখনই শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো কুমন্ত্রণা তাদেরকে স্পর্শ করে, তখনই তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং সাথে সাথে তাদের অন্তর্দৃষ্টি খুলে যায়।" — সূরা আল-আ'রাফ: ২০১


২. নামাজ বারবার ভাঙা ও কসমের ব্যাপারে করণীয়

ক. নামাজ ভাঙার ক্ষেত্রে:

১. নামাজ ভাঙা জায়েয নয়—বিনা কারণে নামাজ ভাঙা হারামের কাছাকাছি একটি কাজ। তবে ওয়াসওয়াসার কারণে যদি কেউ বারবার নামাজ ভাঙে, তবে এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা, এবং এর জন্য তাকে ক্ষমা চাইতে হবে এবং শয়তানের বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকতে হবে।

২. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের পক্ষ থেকে, আর এটা ঈমানের দুর্বলতা থেকে নয় বরং কখনো কখনো ঈমানের শক্তির কারণেও হয়, কারণ শয়তান তখনই বেশি কুমন্ত্রণা দেয় যখন সে দেখে যে বান্দা আল্লাহর ইবাদতে আগ্রহী।"

৩. আপনার করণীয়: নামাজ শুরু করার পর দৃঢ় সংকল্প করুন যে আপনি নামাজ শেষ করবেনই। তাকবীর বলেছেন কিনা সন্দেহ হলে—যদি আপনি নিশ্চিত না হন যে তাকবীর বলেননি, তবে ধরে নেবেন আপনি বলেছেন। সন্দেহকে গুরুত্ব দেবেন না—এটাই ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা।

খ. কসমের ব্যাপারে:

আপনি বলেছেন: "আল্লাহর কসম, আরেকবার নামাজ ভাঙলে একটানা ১০ রোজা রাখবো"—এটি একটি শর্তযুক্ত কসম (যদি...তাহলে...)।

  • যেহেতু আপনি আবার নামাজ ভেঙে ফেলেছেন, তাই আপনার উপর সেই কসম পূর্ণ করা ওয়াজিব—অর্থাৎ আপনাকে একটানা ১০টি রোজা রাখতে হবে।
  • শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "যদি কেউ শর্তযুক্ত কসম করে এবং শর্ত পূরণ হয়, তবে তার উপর কসম পূর্ণ করা ওয়াজিব।"

তবে যদি আপনি মনে করেন যে ১০টি রোজা রাখা আপনার পক্ষে সম্ভব নয়, তাহলে কসম ভঙ্গের কাফফারা দিতে হবে:

কসম ভঙ্গের কাফফারা: ১০ জন মিসকীনকে খাবার দেওয়া অথবা তাদেরকে কাপড় দেওয়া, অথবা একটি দাস/দাসী মুক্ত করা। আর যদি এগুলো সামর্থ্য না থাকে, তাহলে ৩ দিন রোজা রাখা। — সূরা আল-মায়িদা: ৮৯

গুরুত্বপূর্ণ: শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"যে ব্যক্তি ওয়াসওয়াসার কারণে বারবার কসম করে, সে যদি কসম ভঙ্গ করে ফেলে, তবে তার কর্তব্য হলো কাফফারা দেওয়া এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কসম না করা। কারণ এ ধরনের কসম শয়তানের পক্ষ থেকে আসে, যা মানুষকে ক্লান্ত করে দেয়।"


৩. ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা

ক. ওয়াসওয়াসা উপেক্ষা করা:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"তোমাদের কেউ যদি নামাজে (ওয়াসওয়াসা অনুভব করে) এবং সন্দেহ করে যে তার ওযু নষ্ট হয়েছে, তবে সে যেন ততক্ষণ পর্যন্ত (নামাজ ছাড়ে না) যতক্ষণ না শব্দ শুনতে পায় বা গন্ধ পায়।" — সহীহ বুখারী: ১৩৭; সহীহ মুসলিম: ৩৬১

শাইখ আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা হলো—একে গুরুত্ব না দেওয়া এবং উপেক্ষা করা। যত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে, তত বেশি বাড়বে।"

খ. আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া:

"বলুন: আমি আশ্রয় চাইছি মানুষের রবের নিকট, মানুষের অধিপতির নিকট, মানুষের ইলাহের নিকট—কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে, যে (আল্লাহর নামে) গোপন কুমন্ত্রণা দেয়, যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা সৃষ্টি করে।" — সূরা আন-নাস: ১-৫

গ. আযান ও ইকামতের সময় শয়তান থেকে বাঁচার দোয়া:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"যখন আযান দেওয়া হয়, শয়তান পিছু হটে... আর যখন ইকামত দেওয়া হয়, তখনও পিছু হটে।" — সহীহ বুখারী: ৬০৮; সহীহ মুসলিম: ৩৮৯

ঘ. নামাজে ওযু ও তাকবীরের সন্দেহ দূর করার নিয়ম:

শাইখ ইবনে বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:

"যদি কেউ ওযু করার পর সন্দেহ করে যে তার ওযু নষ্ট হয়েছে, তবে সে যেন এ সন্দেহকে গুরুত্ব না দেয়, যতক্ষণ না নিশ্চিত হয় যে ওযু নষ্ট হয়েছে। কারণ মূলনীতি হলো—ওযু থাকা অবস্থায় আছে, যতক্ষণ না নিশ্চিতভাবে নষ্ট হওয়া প্রমাণিত হয়।"


৪. আপনার করণীয় সংক্ষেপে:

১. ১০টি রোজা রাখুন—যেহেতু আপনি কসম করেছেন এবং শর্ত পূরণ হয়েছে। যদি সম্ভব না হয়, তাহলে কসমের কাফফারা দিন (১০ জন মিসকীনকে খাওয়ানো বা কাপড় দেওয়া, অথবা ৩ দিন রোজা)।

২. ভবিষ্যতে এ ধরনের কসম করবেন না—ওয়াসওয়াসার কারণে কসম করা শয়তানের কাজ।

৩. নামাজ ভাঙবেন না—নামাজ শুরু করলে দৃঢ়ভাবে শেষ করুন। তাকবীর বলেছেন কিনা সন্দেহ হলে ধরে নিন বলেছেন।

৪. ওযু নষ্ট হয়েছে কিনা সন্দেহ হলে—ধরে নিন ওযু নষ্ট হয়নি, যতক্ষণ না নিশ্চিত হন।

৫. আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করুন এবং শয়তান থেকে আশ্রয় চান।

৬. ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না—এটাই সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা।


৫. সান্ত্বনাদায়ক হাদীস

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের ভুল-ভ্রান্তি, ভুলে যাওয়া এবং যা করতে বাধ্য করা হয় তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।" — সহীহ ইবনে মাজাহ: ২০৪৩; সহীহ আল-জামি': ২০৬

আরও বলেছেন:

"ওয়াসওয়াসা থেকে যে ব্যক্তি আশ্রয় চায় এবং তা ছেড়ে দেয়, সে মুক্তি পায়।" — সহীহ মুসলিম: ১৩৪


আল্লাহুম্মাগফিরলি — আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন এবং আপনার ওয়াসওয়াসা দূর করুন। আপনি গুনাহগার নন, বরং আপনি শয়তানের কুমন্ত্রণার শিকার। আল্লাহ আপনার ধৈর্যের প্রতিদান দেবেন ইনশাআল্লাহ।

"আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।" — সূরা আল-বাকারাহ: ২৮৬

আল্লাহই সর্বজ্ঞ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী।


উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত সূত্রসমূহ:

  • সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম
  • সূরা আল-আ'রাফ, সূরা আল-মায়িদা, সূরা আন-নাস, সূরা আল-বাকারাহ
  • শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ, শাইখ ইবনে বায, শাইখ আল-আলবানী, শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুমুল্লাহ)-এর ফতোয়া

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.