ইস্তেখারা করার পরও কেন কষ্ট পাচ্ছি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন/ভাই,
আপনার কষ্টের কথা শুনে সত্যিই খুব মন খারাপ হয়েছে। আপনি যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা অত্যন্ত কঠিন। আপনার মনে যে প্রশ্ন ও দ্বিধা তৈরি হয়েছে, তা খুবই স্বাভাবিক। আসুন, আমরা কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিষয়টি বুঝার চেষ্টা করি।
প্রথমত: ইস্তেখারার প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্য
আপনি যে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন, সেটি হলো: "إِذَا هَمَّ أَحَدُكُمْ بِالأَمْرِ فَلْيَرْكَعْ رَكْعَتَيْنِ ... ثُمَّ لِيَدْعُ بِهَذَا الدُّعَاءِ ... اللهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الأَمْرَ خَيْرٌ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ، وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الأَمْرَ شَرٌّ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي فَاصْرِفْهُ عَنِّي وَاصْرِفْنِي عَنْهُ وَاقْدُرْ لِي الخَيْرَ حَيْثُ كَانَ ثُمَّ رَضِّنِي بِهِ" (বুখারি: ১১৬২)
অর্থ: "তোমাদের কেউ যখন কোনো কাজের সংকল্প করে, তখন সে যেন দুই রাকাত নামাজ পড়ে... এরপর এই দোয়া করে- 'হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি জানেন, এই কাজটি আমার জন্য দীন, জীবিকা ও পরিণামের দিক থেকে কল্যাণকর কি না। যদি কল্যাণকর হয়, তবে তা আমার জন্য নির্ধারিত করুন, সহজ করে দিন এবং তাতে বরকত দিন। আর যদি অকল্যাণকর হয়, তবে তা আমার থেকে সরিয়ে দিন এবং আমাকে তা থেকে সরিয়ে দিন। যেখানেই কল্যাণ আছে, তা আমার জন্য নির্ধারিত করুন এবং তাতে আমাকে সন্তুষ্ট রাখুন।'"
এই হাদিস থেকেই আমরা বুঝতে পারি:
১. ইস্তেখারা মানে "ভালো-মন্দের জ্ঞান লাভ করা" নয়, বরং আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা। অর্থাৎ, আমরা আল্লাহর কাছে এই দোয়া করি যে, "হে আল্লাহ! এই কাজটি আমার জন্য প্রকৃতপক্ষে ভালো হলে তা করুন, আর খারাপ হলে তা থেকে আমাকে রক্ষা করুন।"
২. ইস্তেখারার ফলাফল সবসময় "স্বপ্ন দেখা" বা "মনে ইতিবাচক অনুভূতি হওয়া" নয়। অনেক সময় আল্লাহ তাআলা পরিস্থিতি এমনভাবে পরিচালনা করেন যাতে কাজটি সম্পন্ন না হয়, অথবা কাজটি করতে গিয়ে বাধা আসে, অথবা কাজটি সম্পন্ন হলেও পরে বুঝা যায় যে, এটিই আমাদের জন্য ভালো ছিল। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন, "ইস্তেখারা করার পর যে কাজের জন্য কল্যাণ প্রার্থনা করা হয়েছে, যদি তা সহজ হয় এবং বাধা না আসে, তবে এটাই ইস্তেখারার ফল।" (মাজমুউল ফাতাওয়া: ১০/৫৩৯)
৩. ইস্তেখারার পর "আফসোস না করার" অর্থ এই নয় যে, জীবনে কোনো কষ্ট বা সমস্যা হবে না। বরং এর অর্থ হলো, ইস্তেখারা করার পর আল্লাহর উপর ভরসা রেখে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাতে যদি কোনো ক্ষতি বা কষ্টও হয়, তবে তাতে একটি কল্যাণ লুকানো থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন: "وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ" (সূরা বাকারা: ২১৬) অর্থ: "তোমাদের উপর এমন বিষয় ফরজ করা হয়েছে যা তোমাদের কাছে অপ্রিয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর হতে পারে। আর তোমরা যা পছন্দ কর, তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকরও হতে পারে। আল্লাহ জানেন, আর তোমরা জানো না।"
দ্বিতীয়ত: কেন আপনি কষ্ট পাচ্ছেন?
আপনার কষ্ট পাওয়ার কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
১. ইস্তেখারার ভুল ধারণা: অনেকেই মনে করেন, ইস্তেখারা করার অর্থ হলো, আল্লাহ আমাকে সরাসরি জানিয়ে দেবেন কোনটা ভালো। কিন্তু বাস্তবে ইস্তেখারা হলো আল্লাহর কাছে সিদ্ধান্তের দায়িত্ব অর্পণ করা। এরপর নিজের বিবেক, পরামর্শ ও জ্ঞান দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং আল্লাহর উপর ভরসা করা। আপনি যদি মনে করেন, ইস্তেখারা করার পর কোনো কষ্টই আসবে না, তাহলে সেটি ভুল ধারণা।
২. পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে না পারা: আপনি যে প্রতিষ্ঠানে পড়ছেন, সেখানকার পরিবেশকে আপনি "টক্সিক" বলেছেন। এটি আপনার মানসিক চাপের প্রধান কারণ। ইস্তেখারা করার কারণে নয়, বরং এই প্রতিকূল পরিবেশের কারণেই আপনি কষ্ট পাচ্ছেন।
৩. হতাশা ও নিরাশা: শয়তান মানুষকে হতাশ করে এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: "لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ" (সূরা যুমার: ৫৩) অর্থ: "তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।"
তৃতীয়ত: এখন আপনার করণীয়
১. ইস্তেখারাকে দোষারোপ করবেন না: ইস্তেখারা একটি মহান ইবাদত। এটি কখনোই আপনার ক্ষতির কারণ নয়। বরং এটি আপনার জন্য কল্যাণ কামনা করে। আপনি যদি ইস্তেখারা না করতেন, তাহলে সম্ভবত আরও খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তে পারতেন। আল্লাহ তাআলা আপনার অজান্তে অনেক বড় ক্ষতি থেকে আপনাকে রক্ষা করেছেন।
২. বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করুন: যেহেতু আপনি এখন যে প্রতিষ্ঠানে আছেন, সেখানে পড়াশোনা করছেন, তাই সেখানে থাকা অবস্থায় নিজের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে শিক্ষক, অভিভাবক বা কাউন্সেলরের সাহায্য নিন। মনে রাখবেন, প্রতিটি পরিস্থিতিই সাময়িক। আল্লাহ তাআলা বলেন: "فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا" (সূরা ইনশিরাহ: ৫-৬) অর্থ: "নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।"
৩. ইবাদত থেকে দূরে সরে যাবেন না: আপনি বলেছেন, ইবাদত করতে পারছেন না। এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা। ইবাদতই আপনার মানসিক শান্তির উৎস। নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার通过这些 আপনি মানসিক প্রশান্তি পাবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: "أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ" (সূরা রাদ: ২৮) অর্থ: "জেনে রাখো, আল্লাহর জিকিরেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।"
৪. বিয়ের সিদ্ধান্তে: আপনি উল্লেখ করেছেন, বিয়ের সিদ্ধান্তেও ইস্তেখারা করে কষ্ট পেয়েছেন। যদি বিয়ে হয়ে থাকে এবং সেখানে সমস্যা থাকে, তাহলে ধৈর্য ধরুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন। প্রয়োজনে পরিবারের সদস্য বা বিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নিন। আর যদি বিয়ে না হয়ে থাকে এবং সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়ে থাকে, তাহলে মনে করুন, আল্লাহই আপনাকে রক্ষা করেছেন।
৫. আত্মহত্যার চিন্তা সম্পূর্ণ হারাম: আপনি লিখেছেন, "মনে হয় আমি মরে যাই" - এটি শয়তানের প্ররোচনা। আত্মহত্যা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম এবং কবিরা গুনাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন: "وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا" (সূরা নিসা: ২৯) অর্থ: "তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।"
চতুর্থত: একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
আপনি বলেছেন, "আমি অন্য সিদ্ধান্ত নিলে অন্তত এত খারাপ তো থাকতাম না।" এটি একটি অনুমান মাত্র। বাস্তবে অন্য সিদ্ধান্ত নিলে আপনার অবস্থা আরও খারাপ হতে পারত। আমরা অতীত নিয়ে আফসোস না করে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবব। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "وَاعْلَمْ أَنَّ النَّصْرَ مَعَ الصَّبْرِ، وَأَنَّ الْفَرَجَ مَعَ الْكَرْبِ، وَأَنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا" (মুসনাদ আহমাদ: ২৮০৩) অর্থ: "জেনে রাখো, ধৈর্যের সাথে বিজয় আছে, কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে এবং কঠিন পরিস্থিতির সাথে সহজতা আছে।"
পঞ্চমত: করণীয় সংক্ষেপে
১. তওবা ও ইস্তিগফার করুন: নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। ২. নিয়মিত নামাজ পড়ুন: নামাজই আপনার মানসিক প্রশান্তির উৎস। ৩. কুরআন তিলাওয়াত করুন: বিশেষ করে সূরা বাকারা, সূরা ইনশিরাহ, সূরা দুহা ইত্যাদি। ৪. ধৈর্য ধরুন: মনে রাখবেন, ধৈর্যের পরেই সাফল্য। ৫. পরামর্শ নিন: পরিবারের বড়দের বা বিজ্ঞ আলেমের সাথে আপনার সমস্যা শেয়ার করুন। ৬. ইস্তেখারা চালিয়ে যান: ইস্তেখারা থেকে ভয় পাবেন না। এটি একটি মহান ইবাদত। প্রয়োজনে নতুন করে ইস্তেখারা করুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
দোয়া
আল্লাহ তাআলা আপনার কষ্ট দূর করুন, আপনার মনকে প্রশান্তি দিন এবং আপনার জন্য সেই পথই নির্ধারণ করুন, যাতে আপনার দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ রয়েছে। আমিন।