মায়ের সাথে সদাচরণ করার পরও মা অভিমান করে বসে থাকলে কি সন্তানের গোনাহ হবে?

Family Life · Hanafi

Question No: 4858
Questioner: Al Aisha
Question Asked: 03 Sep 2026, 05:05 AM
Reviewed & Published: 03 Sep 2026, 05:52 AM
Views: 21
Tokens: 4,685
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার মা এমন আমার কথা বলেছিল যে আমাকে মানসিকভাবে অত্যাচার করা হয়েছিল তাই অনেক অভিমান করি কিন্তু উনি অনেক কাজে চিৎকার করেছিল কিন্তু আমি একটা উত্তর দেইনি কিন্তু অনেক মন খারাপ হয়েছিল আমি অন্ল্ব কাজ করে দিয়ে সবকিছু করবে তাও আমার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করে আমার কষ্ট হচ্ছে আমি যদি অভিমান করি কিন্তু ওনার কথা সবকিছু শুনে উনি কোন কিছু বললে কোন কাজ থেকে তা করে কিন্তু অভিমান মনে রয়ে যায় গুনা হবে এবং আমি দেখেছি উনার সঙ্গে যখন আমার অভিমান হয় তখন ওয়াসা চলে আসে
এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই অভিমানে কি আমার গুনাহ হবে এবং অভিমানটা সাধারণ কারো মন গুনাহ ছাড়া না তাই বলবো রাগ করছে সেটা কি আমার জন্য গুনাহ হবে আমি আবারো বলছি উনি কিছু বললে আমি সব করে দেই কিন্তু আমি এক্সট্রা কোন কথা বলি না আমার সঙ্গে অভিমান করে

Answer

অভিমান ও পিতা-মাতার সাথে সম্পর্ক সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর

প্রশ্ন: আমার মা আমার সাথে এমন ব্যবহার করেছেন যা মানসিকভাবে কষ্টদায়ক ছিল। আমি অনেক অভিমান করি, কিন্তু তার কথা সব শুনি এবং কাজও করে দেই। তবুও মনে অভিমান থেকে যায়। এই অভিমানের কারণে কি আমার গুনাহ হবে?


উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم

প্রিয় বোন/ভাই,

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। পিতা-মাতার সাথে সম্পর্ক ইসলামে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদার। তবে এর অর্থ এই নয় যে, পিতা-মাতার কোনো আচরণে সন্তানের মনে কষ্ট বা অভিমান হবে না—এটা স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি।

১. অভিমান বা রাগের স্বাভাবিকতা

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:

وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْنًا "আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি।" (সূরা আল-আনকাবুত: ৮)

পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের অর্থ এই নয় যে, তাদের কোনো আচরণে আপনার মন খারাপ হবে না। মন খারাপ হওয়া, অভিমান হওয়া—এগুলো মানবিক স্বভাব। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি তা প্রকাশ না করেন বা এমন কোনো কাজ না করেন যা পিতা-মাতার অবাধ্যতা হিসেবে গণ্য হয়, ততক্ষণ শুধু মনের ভেতরের অনুভূতির জন্য আপনি গুনাহগার হবেন না।

২. হাদীসের আলোকে

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের মনের কথা ক্ষমা করে দেবেন, যতক্ষণ না সে তা কাজে পরিণত করে বা মুখে উচ্চারণ করে।" (সহীহ বুখারী: ৫২৬৯, সহীহ মুসলিম: ১২৭)

এই হাদীস অনুযায়ী, আপনার মনে অভিমান বা রাগ থাকলেও যতক্ষণ আপনি তা কাজে বা কথায় প্রকাশ না করছেন, ততক্ষণ তা গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে না।

৩. অভিমান পোষণ করা সম্পর্কে সতর্কতা

তবে মনে রাখবেন, দীর্ঘদিন অভিমান পোষণ করা, সম্পর্ক ছিন্ন করা বা পিতা-মাতার সাথে কথা বন্ধ করে দেওয়া—এগুলো মারাত্মক গুনাহ। হাদীসে এসেছে:

لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلَاثٍ "কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ নয় যে সে তার ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশি কথা বন্ধ রাখবে।" (সহীহ বুখারী: ৬০৭৭)

যদিও এই হাদীস সাধারণ মুসলিম ভাইয়ের সম্পর্কে, পিতা-মাতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা আরও গুরুতর অপরাধ।

৪. পিতা-মাতার অবাধ্যতা (উকূকুল ওয়ালিদাইন)

আপনি বলেছেন যে, আপনার মা যা বলেন আপনি তা করেন এবং কোনো উত্তম উত্তর দেন না—এটা খুবই প্রশংসনীয়। আপনি পিতা-মাতার অবাধ্যতা করছেন না, বরং তাদের সেবা করছেন। শুধু মনে অভিমান থাকার কারণে আপনি 'উকূকুল ওয়ালিদাইন'-এর গুনাহগার হবেন না।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, পিতা-মাতার অবাধ্যতা (উকূক) বলতে তাদের কষ্ট দেওয়া, তাদের আদেশ অমান্য করা, তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করা—এসব কাজকে বোঝায়। শুধু মনের ভেতর অসন্তুষ্টি থাকা অবাধ্যতা নয়।

৫. ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা) সম্পর্কে

আপনি উল্লেখ করেছেন যে, অভিমান হলে ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) চলে আসে। এটি খুবই স্বাভাবিক। শয়তান পিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্ক নষ্ট করতে চায়। শয়তান চায় আপনি আপনার মায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ পোষণ করুন এবং সম্পর্ক নষ্ট করুন। তাই শয়তানের এই কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচতে হলে:

  • বেশি বেশি আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম পড়ুন
  • দরূদ শরীফ পড়ুন
  • মায়ের জন্য দোয়া করুন

৬. করণীয় ও পরামর্শ

১. মায়ের জন্য দোয়া করুন—যখনই মনে অভিমান আসবে, তখনই মায়ের জন্য দোয়া করুন। এতে আপনার মন প্রশান্ত হবে এবং অভিমান কমবে।

২. মনের কথা খুলে বলুন—সম্ভব হলে সুযোগ মতো মাকে বিনয়ের সাথে বলুন যে, তার কিছু কথায় আপনার কষ্ট হয়। তবে এমনভাবে বলবেন না যাতে তিনি রাগ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلًا كَرِيمًا "আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)

৩. ক্ষমা করার চেষ্টা করুন—মা যা কিছু বলেন, তা হয়তো আপনার মঙ্গলের জন্যই বলেন। অনেক সময় মায়ের রাগ বা চিৎকারের পেছনে তার নিজের কষ্ট, অসুস্থতা বা চাপ থাকে। তাকে ক্ষমা করার চেষ্টা করুন।

৪. সবর করুন—আল্লাহ তাআলা সবরকারীদের সাথে আছেন। পিতা-মাতার সাথে ধৈর্য ধরার অনেক ফজিলত রয়েছে।

৫. অভিমান দূর করার উপায়—অভিমান দূর করতে মায়ের ভালো গুণগুলো স্মরণ করুন, তার আপনার জন্য করা কুরবানী ও ত্যাগের কথা মনে করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

الْجَنَّةُ تَحْتَ أَقْدَامِ الأُمَّهَاتِ "জান্নাত মায়ের পায়ের নিচে।" (সুনানে নাসাঈ: ৩১০৪)

৭. সংক্ষিপ্ত উত্তর

আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর: আপনার মনের অভিমান বা রাগ থাকার কারণে আপনি গুনাহগার হবেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি তা কাজে বা কথায় প্রকাশ না করেন এবং মায়ের অবাধ্যতা না করেন। আপনি তো মায়ের কথা শোনেন এবং কাজও করেন—এটা খুবই উত্তম। শুধু মনের ভেতরের অনুভূতির জন্য আপনি গুনাহগার হবেন না, ইনশাআল্লাহ।

তবে দীর্ঘদিন অভিমান পোষণ না করে তা দূর করার চেষ্টা করা উচিত, কারণ দীর্ঘস্থায়ী অভিমান সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে এবং শয়তান এর সুযোগ নিতে পারে।


আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পিতা-মাতার সেবা করার এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.