মুতাওয়াতির আমল ভুল করা, নাপাকী
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১। একদিন আমার স্বপ্ন দোষ হলে আমার নাপাকী লাগে আর আমার আম্মু আমাকে ফজরের নামাজর জন্য ডাকে আর কিভাবে তার হাত আমার হাতের সাথে লাগে এবং সে অযু অবস্থায় ছিলো তাই হাত ভিজা ছিলো। আমি লজ্জায় বলিনি আমার হাতে নাপাকী লাগাছিলো। তাই সে অই অযু দিয়ে নামাজ আদায় করে নেয়!
এখন এই ওযু দিয়ে কি তার নামাজ হবে?
২। আমি একদিন কয়েকজন ভাইয়ের অনুরোধে এশার নামাজ'র ইমামতি করি এবং আমার না জানআ থাকার কারণে আমি সূরা ফাতিহার পর আমিন বলি নি। আমি জানতাম ইমাম সাহেবের আমিন বলা লাগে না!
আবার, আমি পড়ি আবার ভুলে যাই, নামাজের ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত কিন্তু এই গুলা মনে থালে যে এই আমল উদাহরণ স্বরুপ ধীরস্থির ভাবে নামাজের রুকন আদায় করা ওয়াজিব। কিন্তু মাজে মধ্যে ভুল যাই ফরজ না ওয়াজিব তবে এই টুকু মনে থাকে এই আমল না করলে গুনাহ হবে!
এখন আমার প্রশ্ন এই যে আমিন বলা ইমামের জন্য সুন্নাত বা মাঝে মাধ্যে কোনটা ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত এইগুলা ভুলে যাই এতে কি আমার মুতাওয়াতির পরর্যায়ের আমল গুলা অস্বীকার করা হবে মানে কুফর হবে?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্ন ১: স্বপ্নদোষের পর অজু আবস্থায় মা কর্তৃক হাত স্পর্শ করা এবং পূর্বের ওযু দিয়ে নামাজ পড়া
১. আপনার আম্মুর ওযু ভেঙেছে কি না?
- শরয়ী ফয়সালা: না, আপনার হাত স্পর্শ করার কারণে আপনার আম্মুর ওযু ভাঙেনি।
- কারণ বিশ্লেষণ: হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাব 'নূরুল ঈযাহ' এবং 'ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী'-র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শরীরে বা হাতে কোনো বাহ্যিক নাপাকী (যেমন: বীর্য বা প্রস্রাব) লাগলে বা নাপাক কোনো বস্তু স্পর্শ করলে ওযু ভেঙে যায় না। ওযু ভাঙার জন্য শরীর থেকে ওযু ভঙ্গের নির্দিষ্ট কোনো কারণ (যেমন: মল-মূত্র নির্গত হওয়া, রক্ত বা পুঁজ প্রবাহিত হওয়া ইত্যাদি) প্রকাশ পাওয়া শর্ত । যেহেতু আপনার আম্মু কেবল আপনার হাত স্পর্শ করেছেন এবং তাঁর নিজের শরীর থেকে ওযু ভঙ্গের কোনো কারণ ঘটেনি, তাই তাঁর ওযু সম্পূর্ণরূপে বহাল ছিল।
২. আপনার আম্মুর হাত কি নাপাক বা অপবিত্র হয়েছিল?
- শরয়ী ফয়সালা: যদি আপনার হাতে লেগে থাকা ভিজা বীর্য (নাপাকী) মায়ের ভিজা হাতের স্পর্শে তাঁর হাতে স্থানান্তরিত বা লেগে গিয়ে থাকে, তবে কেবল তাঁর হাতটি অপবিত্র বা নাপাক হয়েছে । আর যদি নাপাকী স্থানান্তরিত না হয়ে থাকে, তবে তাঁর হাত অপবিত্র হয়নি।
৩. ঐ ওযু দিয়ে কি আপনার আম্মুর নামায হবে?
যদি আপনার আম্মুর হাতে নাপাকী স্থানান্তরিত হয়ে থাকে এবং তিনি হাত না ধুয়েই সালাত আদায় করে থাকেন, তবে সালাত সহীহ হওয়ার বিধান নাপাকীর পরিমাণের ওপর নির্ভর করবে:
- ক. নাপাকীর পরিমাণ দিরহামের সমান বা কম হলে (নামায হয়ে গেছে): যদি আপনার হাত থেকে স্থানান্তরিত নাপাকীর পরিমাণ হাতের তালুর গভীর অংশ বা একটি পাঁচ টাকার কয়েনের সমান (এক দিরহাম) বা তার চেয়ে কম হয়, তবে তাঁর সালাত আদায় হয়ে গেছে। তবে না ধুয়ে নামায পড়া মাকরূহে তানযীহী (অনুচিত) হয়েছে।
- খ. নাপাকীর পরিমাণ দিরহামের চেয়ে বেশি হলে (নামায পুনরায় পড়তে হবে): যদি মায়ের হাতে স্থানান্তরিত নাপাকীর পরিমাণ এক দিরহামের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে এবং তিনি তা না ধুয়ে নামায পড়ে থাকেন, তবে তাঁর নামায সহীহ হয়নি । এমতাবস্থায় সতর্কতা ও শরী'আতের হুকুম অনুযায়ী তাঁর জন্য উক্ত ফজরের নামাযটি কাযা (পুনরায় আদায়) করা ওয়াজিব।
- গ. নাপাকী আদৌ লেগে না থাকলে (নামায সম্পূর্ণ সহীহ): যদি স্পর্শের সময় আপনার হাতের শুকনো অংশ স্পর্শ হয়ে থাকে এবং মায়ের হাতে কোনো নাপাকী স্থানান্তরিত না হয়, তবে তাঁর নামায ১০০% সহীহ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. নূরুল ঈযাহ:
- পৃষ্ঠা ৩১ (ওযু ভঙ্গের কারণসমূহ অনুচ্ছেদ)।
- পৃষ্ঠা ৫০ (সালাতের শর্তাবলী - শরীর পবিত্র হওয়ার বিবরণ) ২. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা ৫৫ (পঞ্চম অনুচ্ছেদ: ওযু ভঙ্গের কারণসমূহ)।
- পৃষ্ঠা ১০৬-১০৭ (সপ্তম পরিচ্ছেদ: নাপাকী হতে পবিত্রকরণ - দিরহামের পরিমাপ)।
- পৃষ্ঠা ১৩০-১৩১ (নাপাক বস্তু ও তার বিধান পরিচ্ছেদ)।
আপনার জন্য বিশেষ পরামর্শ:
দ্বীনি বিষয়ে সঠিক হুকুম মানার ক্ষেত্রে লজ্জা করা উচিত নয়। আপনি আপনার আম্মুকে অত্যন্ত নরম ভাষায় ও আদর করে বুঝিয়ে বলুন যে— "আম্মু, সেদিন অসাবধানতাবশত আমার হাত অপবিত্র ছিল। আপনার ভিজা হাত লাগার কারণে যদি তাতে এক দিরহামের (পাঁচ টাকার কয়েন সমপরিমাণ) বেশি নাপাকী লেগে থাকে, তবে হানাফী ফিকহের সতর্কতা অনুযায়ী সেই ফজরের নামাযটি পুনরায় কাযা পড়ে নেওয়া আপনার জন্য নিরাপদ হবে।"
প্রশ্ন ২: ইমামের জন্য আমিন বলা এবং মুতাওয়াতির আমল অস্বীকারের প্রসঙ্গ
উত্তর: আপনার প্রশ্নটি কয়েকটি অংশে বিভক্ত:
(ক) ইমামের জন্য আমিন বলা:
হানাফী মাযহাব মতে, ইমামের জন্য আমিন বলা সুন্নাত (মুয়াক্কাদা), ওয়াজিব নয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ইমাম সূরা ফাতিহা শেষ করে আমিন বলবেন, তবে তা নীরবে বলবেন, উচ্চস্বরে নয়। (আল-হিদায়া, ১/৪৬; বাদায়েউস সানায়ে, ১/৫০৮)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
إِذَا قَالَ الْإِمَامُ وَلَا الضَّالِّينَ فَقُولُوا آمِينَ "যখন ইমাম 'ওয়ালাদ্দাল্লীন' বলেন, তখন তোমরা আমিন বলো।" (সহীহ বুখারী: ৭৮০; সহীহ মুসলিম: ৪১০)
তবে হানাফী মাযহাবে ইমামের জন্য আমিন বলা সুন্নাত, ছুটে গেলে নামাজ ভঙ্গ হবে না এবং সিজদা সাহুও ওয়াজিব হবে না। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৭৫; রদ্দুল মুহতার, ১/৫৪৩)
আপনি ইমামতি করেছেন এবং আমিন বলেননি—এতে আপনার নামাজ এবং মুক্তাদীদের নামাজ উভয়ই শুদ্ধ হয়েছে, ইনশাআল্লাহ। কারণ আমিন বলা সুন্নাত, ওয়াজিব বা ফরজ নয়।
(খ) ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত ভুলে যাওয়া:
আপনি বলেছেন যে নামাজের ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত সম্পর্কে আপনার মনে থাকে, কিন্তু মাঝে মাঝে ভুলে যান কোনটি ফরজ, কোনটি ওয়াজিব, কোনটি সুন্নাত। তবে আপনি এতটুকু মনে রাখেন যে, এই আমল না করলে গুনাহ হবে।
এটি কোনো সমস্যা নয়। প্রতিটি মুসলিমের পক্ষে সব সময় প্রতিটি আমলের বিধান মনে রাখা সম্ভব নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো:
- ফরজ আমলগুলো জানা এবং পালন করা
- ওয়াজিব আমলগুলো জানা এবং পালন করা
- সুন্নাত আমলগুলো জানা এবং পালন করা
(গ) মুতাওয়াতির আমল অস্বীকার করা কি কুফর হবে?
মুতাওয়াতির আমল বলতে সেসব আমলকে বোঝায় যা প্রমাণিত এবং সর্বসম্মতভাবে উম্মতের মধ্যে প্রচলিত, যেমন: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রোজা, হজ ইত্যাদি। এই আমলগুলো অস্বীকার করা কুফর।
কিন্তু আপনি তো মুতাওয়াতির আমল অস্বীকার করেননি! আপনি শুধু ভুলে গেছেন বা জানতেন না যে ইমামের জন্য আমিন বলা সুন্নাত। এটি কোনো কুফর নয়। কুফর তখনই হবে যদি কেউ জেনে-শুনে ইচ্ছাকৃতভাবে মুতাওয়াতির আমলকে অস্বীকার করে বা মিথ্যা বলে।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
لَا يَكْفُرُ بِإِنْكَارِ مَا لَمْ يَثْبُتْ كَوْنُهُ مِنْ الضَّرُورِيَّاتِ "যে বিষয়টি ضروریات (অপরিহার্য বিষয়) হিসেবে প্রমাণিত নয়, তা অস্বীকার করলে কুফর হবে না।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৮৫)
আমিন বলা ইমামের জন্য সুন্নাত—এটি মুতাওয়াতির আমল নয়, বরং এটি একটি সুন্নাত আমল। তাই এটি না জানা বা ভুলে যাওয়া কোনোভাবেই কুফর নয়।
ইমাম তাহাবী (রহ.) বলেন:
لَا نُكَفِّرُ أَحَدًا مِنْ أَهْلِ الْقِبْلَةِ بِذَنْبٍ مَا لَمْ يَسْتَحِلَّهُ "আমরা কিবলাবাসী কাউকে কোনো গুনাহের কারণে কুফরী ফতোয়া দিই না, যতক্ষণ না সে তা হালাল মনে করে।" (আল-আকীদাতুত তাহাবিয়্যাহ)
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
১. আপনার মায়ের নামাজ শুদ্ধ হয়েছে, কারণ তিনি অজান্তে নাপাকীসহ নামাজ পড়েছেন। তবে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকবেন।
২. ইমামের জন্য আমিন বলা সুন্নাত, ওয়াজিব নয়। তাই আমিন না বলায় আপনার নামাজ শুদ্ধ হয়েছে।
৩. ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত ভুলে যাওয়া বা না জানা কোনো কুফর নয়। কুফর তখনই হবে যখন কেউ জেনে-শুনে মুতাওয়াতির আমল অস্বীকার করবে। আপনি তো মুতাওয়াতির আমল অস্বীকার করেননি, তাই আপনার কোনো সমস্যা নেই।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমীন।