ঈসালে সাওয়াব করার নিয়ম কি?

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 4713
Questioner: Mou Sumi
Question Asked: 01 Sep 2026, 08:01 AM
Reviewed & Published: 01 Sep 2026, 09:01 AM
Views: 35
Tokens: 5,606
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

একই সাথে একাধিক মৃত ব্যক্তি ও জীবিত ব্যক্তির জন্য ঈসালে সাওয়াবের নিয়ত এ কোরান তেলাওয়াত /নফল জিকির/নফল নামাজ আদায় করা যাবে কি?

১.নিয়ত আমলের আগে করতে হবে নাকি পরে করলেও হবে?
২.সবার নাম নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করে নিয়ত করতে হবে কি?
৩.ঈসালে সাওয়াব পাঠানোর পদ্ধতি কি?

Answer

ঈসালে সাওয়াব: নিয়ত, পদ্ধতি ও বিধান

ভূমিকা

ঈসালে সাওয়াব অর্থাৎ মৃত বা জীবিত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দান-সদকা বা নফল ইবাদতের সাওয়াব পৌঁছে দেওয়া ইসলামি শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হানাফি মাযহাবের আলোকে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা নিম্নে প্রদান করা হলো।


১. একাধিক মৃত ও জীবিত ব্যক্তির জন্য একই সাথে ঈসালে সাওয়াব করা যাবে কি?

উত্তর: হ্যাঁ, একই সাথে একাধিক মৃত ও জীবিত ব্যক্তির জন্য ঈসালে সাওয়াবের নিয়তে কুরআন তিলাওয়াত, নফল জিকির বা নফল নামাজ আদায় করা জায়েয। হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মতানুসারে, ইবাদতের সাওয়াব অন্যকে পৌঁছানো জায়েয এবং তা পৌঁছেও থাকে।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন তিলাওয়াতের সাওয়াব পৌঁছানো জায়েয এবং তা মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছেও থাকে। (রদ্দুল মুহতার, ২/২৪৩)

قال الإمام أبو حنيفة: يصل إليه (أي الثواب) ويجوز أن يقرأ على القبر

অর্থ: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন: সাওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে এবং কবরের পাশে কুরআন তিলাওয়াত করা জায়েয। (রদ্দুল মুহতার, ২/২৪৩)

একাধিক ব্যক্তির জন্য একই আমলের সাওয়াব নিয়ত করলে প্রত্যেকের জন্যই সাওয়াব পৌঁছাবে। তবে মনে রাখতে হবে, ঈসালে সাওয়াবের ক্ষেত্রে আমলটি নিজে করা উত্তম; অন্যকে দিয়ে করানোর চেয়ে নিজে করলে সাওয়াব বেশি।


২. নিয়ত কি আমলের আগে করতে হবে নাকি পরে করলেও হবে?

উত্তর: ইসলামি শরিয়তের মূলনীতি অনুযায়ী, প্রতিটি ইবাদতের জন্য নিয়ত অপরিহার্য। নিয়ত হলো ইবাদতের মূল চালিকাশক্তি। হাদিসে এসেছে:

إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى

অর্থ: "নিশ্চয়ই সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যা নিয়ত করে তা-ই পাবে।" (সহিহ বুখারি: ১; সহিহ মুসলিম: ১৯০৭)

নিয়তের সময়: নিয়ত আমলের শুরুতে করতে হবে। তবে ঈসালে সাওয়াবের ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম হলো—আমল শুরুর সময় নিয়ত করা উত্তম, কিন্তু কেউ যদি আমল শেষ করে পরে নিয়ত করে যে, এই সাওয়াব অমুক ব্যক্তির জন্য পৌঁছে দিলাম, তবুও তা জায়েয হবে। কারণ, ঈসালে সাওয়াবের নিয়ত আমলের সাওয়াবকে নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতি পাঠানোর মাধ্যম, যা আমল শেষ হওয়ার পরেও করা যেতে পারে।

তবে সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো—আমল শুরুর আগেই নিয়ত করা। যেমন: "আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ২ রাকাত নফল নামাজ আদায় করছি এবং এর সাওয়াব অমুক ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিচ্ছি।"

وفي الخلاصة: إذا قرأ القرآن وأهدى ثوابه إلى الميت جاز

অর্থ: খুলাসায় বর্ণিত: কেউ যদি কুরআন তিলাওয়াত করে তার সাওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেয়, তা জায়েয। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, ৫/৩০৯)


৩. সবার নাম নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করে নিয়ত করতে হবে কি?

উত্তর: ঈসালে সাওয়াবের ক্ষেত্রে নাম নির্দিষ্ট করে নিয়ত করা উত্তম, তবে বাধ্যতামূলক নয়। কেউ যদি সাধারণভাবে নিয়ত করে যে, "আমার সকল মৃত আত্মীয়-স্বজন ও মুমিন-মুসলমানের জন্য এই সাওয়াব পৌঁছে দিলাম," তবুও তা জায়েয এবং সাওয়াব পৌঁছাবে।

তবে নাম নির্দিষ্ট করে নিয়ত করলে তা আরও ভালো, কারণ এতে নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতি সাওয়াব পৌঁছানোর বিষয়টি স্পষ্ট হয়। হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে এসেছে:

لو قرأ القرآن وأهدى ثوابه إلى الميت جاز ووصله ثوابه

অর্থ: কেউ কুরআন তিলাওয়াত করে মৃত ব্যক্তির কাছে সাওয়াব পৌঁছে দিলে তা জায়েয এবং সাওয়াব তার কাছে পৌঁছায়। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, ৫/৩০৯)

মনে রাখতে হবে: ঈসালে সাওয়াবের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা শর্ত নয়। সাধারণ নিয়ত করলেই সাওয়াব পৌঁছাবে। তবে নাম উল্লেখ করলে তা অধিক পছন্দনীয়।


৪. ঈসালে সাওয়াব পাঠানোর পদ্ধতি

ঈসালে সাওয়াবের পদ্ধতি নিম্নরূপ:

ক. কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে ঈসালে সাওয়াব

১. অজু করে পবিত্র অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত শুরু করবেন। ২. তিলাওয়াত শুরুর আগে নিয়ত করবেন: "আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরআন তিলাওয়াত করছি এবং এর সাওয়াব অমুক ব্যক্তির (বা সকল মুমিন-মুসলমানের) কাছে পৌঁছে দিচ্ছি।" ৩. কুরআন তিলাওয়াত শেষে দুআ করবেন: "اللَّهُمَّ أَوْصِلْ ثَوَابَ مَا قَرَأْنَاهُ إِلَى فُلَانٍ" (হে আল্লাহ! আমরা যা তিলাওয়াত করলাম তার সাওয়াব অমুকের কাছে পৌঁছে দাও।)

খ. নফল নামাজের মাধ্যমে ঈসালে সাওয়াব

১. নফল নামাজ (যেমন: ২ রাকাত বা ৪ রাকাত) আদায়ের নিয়ত করবেন। ২. নামাজ শেষে দুআ করে সাওয়াব নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়ার নিয়ত করবেন। ৩. নামাজের সাওয়াব মৃত বা জীবিত ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো জায়েয।

গ. জিকির ও দরুদ পাঠের মাধ্যমে ঈসালে সাওয়াব

১. তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ), তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবির (আল্লাহু আকবার), দরুদ শরিফ ইত্যাদি পাঠ করবেন। ২. পাঠ শেষে দুআ করে সাওয়াব নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেবেন।

ঘ. দান-সদকার মাধ্যমে ঈসালে সাওয়াব

১. গরিব-মিসকিনকে দান-সদকা করবেন। ২. দান করার সময় নিয়ত করবেন যে, এর সাওয়াব অমুক ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিচ্ছি।


ঈসালে সাওয়াব সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা

১. মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন তিলাওয়াতের সাওয়াব পৌঁছায় কি?

হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দরুদ ইত্যাদির সাওয়াব পৌঁছায়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং ইমাম আহমদ (রহ.)-এর মতে তা পৌঁছায়। (রদ্দুল মুহতার, ২/২৪৩)

قال صاحب الدر المختار: والأصح أن ثواب القراءة يصل إلى الميت

অর্থ: দুররুল মুখতারের লেখক বলেছেন: সর্বাধিক সঠিক মত হলো, কুরআন তিলাওয়াতের সাওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছায়। (দুররুল মুখতার, ২/২৪৩)

২. জীবিত ব্যক্তির জন্য ঈসালে সাওয়াব করা যাবে কি?

হ্যাঁ, জীবিত ব্যক্তির জন্যও ঈসালে সাওয়াব করা জায়েয। অনেক আলেমের মতে, জীবিত ব্যক্তির জন্য ঈসালে সাওয়াব করা মৃত ব্যক্তির চেয়েও বেশি কার্যকর, কারণ জীবিত ব্যক্তি নিজেও দুআ করতে পারে এবং সাওয়াব পেতে পারে। তবে মৃত ব্যক্তির জন্য ঈসালে সাওয়াবের গুরুত্ব বেশি, কারণ মৃত ব্যক্তি নিজে আর আমল করতে পারে না।

৩. একই আমলের সাওয়াব একাধিক ব্যক্তিকে পৌঁছানো যাবে কি?

হ্যাঁ, একই আমলের সাওয়াব একাধিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছানো যাবে। যেমন: কেউ ১০০ বার দরুদ শরিফ পড়ে ১০ জন মৃত ব্যক্তির নামে সাওয়াব পৌঁছে দিলে প্রত্যেকের জন্যই সাওয়াব পৌঁছাবে। তবে মনে রাখতে হবে, সাওয়াবের পরিমাণ কমে যায় না; আল্লাহ তাআলা প্রত্যেককে পূর্ণ সাওয়াব দান করেন।

وفي التاتارخانية: لو قرأ القرآن وأهدى ثوابه إلى جماعة جاز

অর্থ: তাতারখানিয়ায় বর্ণিত: কেউ কুরআন তিলাওয়াত করে একাধিক ব্যক্তির কাছে সাওয়াব পৌঁছে দিলে তা জায়েয। (তাতারখানিয়া, ৫/১২৩)

৪. ঈসালে সাওয়াবের জন্য কি নির্দিষ্ট কোনো আমল নির্ধারিত?

ঈসালে সাওয়াবের জন্য নির্দিষ্ট কোনো আমল নির্ধারিত নেই। কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দরুদ, নফল নামাজ, দান-সদকা, রোজা ইত্যাদি যেকোনো নফল ইবাদতের সাওয়াব ঈসালে সাওয়াব হিসেবে পৌঁছানো যাবে। তবে কুরআন তিলাওয়াত এবং দান-সদকা সর্বোত্তম পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত।


ঈসালে সাওয়াবের নিয়তের নমুনা

কুরআন তিলাওয়াতের নিয়ত:

"আমি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য কুরআন তিলাওয়াত করছি। এর সাওয়াব আমার মৃত পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন এবং সকল মুমিন-মুসলমানের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি।"

নফল নামাজের নিয়ত:

"আমি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য ২ রাকাত নফল নামাজ আদায় করছি। এর সাওয়াব অমুক ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিচ্ছি।"

দান-সদকার নিয়ত:

"আমি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য এই দান করছি। এর সাওয়াব আমার মৃত পিতার কাছে পৌঁছে দিচ্ছি।"


ঈসালে সাওয়াবের দুআ

ঈসালে সাওয়াবের সময় নিম্নোক্ত দুআ পড়া উত্তম:

اللَّهُمَّ أَوْصِلْ ثَوَابَ مَا قَرَأْنَاهُ / مَا صَلَّيْنَاهُ / مَا ذَكَرْنَاهُ إِلَى فُلَانٍ

উচ্চারণ: "আল্লাহুম্মা আওসিল সাওয়াবা মা ক্বারানাহু / মা সাল্লাইনাহু / মা যাকারনাহু ইলা ফুলানিন।"

অর্থ: "হে আল্লাহ! আমরা যা তিলাওয়াত করলাম / যা নামাজ আদায় করলাম / যা জিকির করলাম, তার সাওয়াব অমুকের কাছে পৌঁছে দাও।"


গুরুত্বপূর্ণ নোট

১. নিয়তের গুরুত্ব: ঈসালে সাওয়াবের ক্ষেত্রে নিয়ত অপরিহার্য। নিয়ত ছাড়া সাওয়াব নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছানোর বিষয়টি স্পষ্ট হয় না।

২. আমলের পূর্বে নিয়ত: সর্বোত্তম হলো আমল শুরুর আগেই নিয়ত করা। তবে আমল শেষে নিয়ত করলেও তা জায়েয।

৩. নাম উল্লেখ: নাম নির্দিষ্ট করে নিয়ত করা উত্তম, তবে বাধ্যতামূলক নয়। সাধারণ নিয়ত করলেও সাওয়াব পৌঁছাবে।

৪. একাধিক ব্যক্তির জন্য: একই আমলের সাওয়াব একাধিক ব্যক্তির জন্য পৌঁছানো জায়েয।

৫. জীবিত ও মৃত: জীবিত ও মৃত উভয়ের জন্যই ঈসালে সাওয়াব করা জায়েয।


উপসংহার

ঈসালে সাওয়াব ইসলামি শরিয়তের একটি বৈধ ও প্রশংসিত আমল। হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, মৃত ও জীবিত ব্যক্তির জন্য কুরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ, জিকির ইত্যাদির সাওয়াব পৌঁছানো জায়েয এবং তা পৌঁছেও থাকে। একই আমলের সাওয়াব একাধিক ব্যক্তির জন্য পৌঁছানোও জায়েয। নিয়ত আমলের আগে করা উত্তম, তবে পরে করলেও তা জায়েয। নাম নির্দিষ্ট করে নিয়ত করা উত্তম, তবে বাধ্যতামূলক নয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিকভাবে ঈসালে সাওয়াব করার তাওফিক দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.