মোজা পরার আগে ওযু করলে এবং পরে মোজা পরাবস্থায় সালাত আদায় করলে তা শুদ্ধ হবে কি? গাড়িতে জুতা পায়ে দিয়ে সালাত আদায়ের বিধান কী?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
মোজা পরার আগে ওযু করলে,পরে মোজা পরাবস্থায় স্বলাত আদায় করলে কি স্বলাত আদায় হয়ে যাবে?
গাড়িতে জুতাবস্থায় স্বলাত আদায় করলে কি স্বলাত হবে?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্ন দুটির উত্তর নিন্মে প্রদান করা হলো:
প্রশ্ন ১: মোজা পরার আগে ওযু করলে, পরে মোজা পরাবস্থায় সালাত আদায় করলে কি সালাত আদায় হবে?
হ্যাঁ, ওযু করার পর মোজা পরিধান করলে এবং সেই মোজা পরা অবস্থায় নামায আদায় করলে নামায সম্পূর্ণরূপে আদায় হয়ে যাবে এবং তা ১০০% শুদ্ধ ও সহীহ হবে।
শরয়ী নিয়ম ও বিশ্লেষণ: ইসলামি শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী, মোজা পরা অবস্থায় নামায পড়ার অথবা মোজার ওপর মাসেহ (wipe) করার মূল শর্তই হলো—পা ধুয়ে ওযু সম্পন্ন করার পর মোজা পরিধান করা । আপনি যেহেতু ওযু করার পর মোজা পরেছেন, তাই যতক্ষণ আপনার ওযু থাকবে, আপনি মোজা পরা অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই নামায আদায় করতে পারবেন ।
এমনকি ওযু ভেঙে যাওয়ার পর নতুন ওযুর সময় মোজা না খুলে তার ওপর মাসেহ করাও শরীয়তে জায়েয। মোজার ওপর মাসেহ বৈধ হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলী পূরণ হওয়া আবশ্যক:
-
মোজার ওপর মাসেহ করার ৭টি শর্ত (নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৮২) ১. ওযু পূর্ণ করার পর মোজা পরিধান করা (ওযু শেষ করার পূর্বে দুই পা ধুয়ে মোজা পরিধান করলেও সমস্যা নেই, যদি ওযু ভঙ্গের আগে ওযুটি সম্পন্ন করা হয়) । ২. মোজা দ্বারা উভয় পায়ের টাখনু (Ankle) পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে আবৃত থাকা । ৩. মোজা পরে একাধারে কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ মাইল অনায়াসে হাঁটা সম্ভব হওয়া (তাই কাঁচ, কাঠ বা লোহার মোজার ওপর মাসেহ জায়েয নয়)। ৪. মোজা দুটি পায়ের কনিষ্ঠ আঙুলের ৩ আঙুল পরিমাণ ফাটা বা ছেঁড়া থেকে মুক্ত থাকা । ৫. কোনো প্রকার ফিতা বা বাঁধন ছাড়াই মোজাটি নিজস্ব আকৃতিতে পায়ের সাথে আটকে থাকা। ৬. মোজাটি এমন পুরু হওয়া, যা পানি চুয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে বাধা দেয় । ৭. পায়ের সামনের অংশ (তালুর সামনের অন্তত ৩টি আঙুল পরিমাণ অংশ) বিদ্যমান থাকা ।
-
মাসেহ ভঙ্গের ৪টি কারণ (নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৮৮): ১. ওযু ভঙ্গকারী যেকোনো কাজ সংঘটিত হওয়া । ২. যেকোনো একটি মোজা পা থেকে খুলে যাওয়া বা আলগা হওয়া । ৩. মোজার ভেতর পায়ের অধিকাংশ স্থানে পানি পৌঁছে যাওয়া । ৪. মাসেহের শরী'আত নির্ধারিত সময়সীমা (মুকীমের জন্য ২৪ ঘণ্টা এবং মুসাফিরের জন্য ৭২ ঘণ্টা) অতিবাহিত হয়ে যাওয়া ।
-
কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর: নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৮২ (মোজার ওপর মাসেহের পরিচ্ছেদ) এবং পৃষ্ঠা: ৮৮।
২. গাড়িতে জুতাবস্থায় স্বলাত আদায় করলে কি স্বলাত হবে?
গাড়িতে জুতা পরা অবস্থায় নামায আদায়ের ক্ষেত্রে জুতার পবিত্রতা এবং নামাযের ধরণের ওপর ভিত্তি করে শরী'আতের হুকুম নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
-
জুতা পবিত্র (পাক) হওয়া বাধ্যতামূলক শর্ত: জুতা পরে নামায আদায়ের মূল শর্ত হলো জুতাটি এবং যেখানে দাঁড়ানো হবে সেই স্থানটি রক্ত, পেশাব বা যেকোনো ধরণের নাপাকি (অপবিত্রতা) থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র বা পাক হতে হবে । যদি জুতায় কোনো অপবিত্রতা লেগে থাকে, তবে সেই জুতা পরে নামায আদায় করা কোনোভাবেই জায়েয হবে না।
-
নফল নামাযের ক্ষেত্রে চলন্ত গাড়িতে নামায: বাস, ট্রেন, কার বা যেকোনো চলন্ত যানবাহনে জুতা পবিত্র থাকা সাপেক্ষে বসে ইশারার মাধ্যমে নফল নামায আদায় করা সম্পূর্ণরূপে জায়েয ও সহীহ ।
-
ফরয নামাযের ক্ষেত্রে চলন্ত গাড়িতে নামাযের হুকুম: ১. গাড়ি থামানো সম্ভব হলে: ফরয নামাযের জন্য দাঁড়ানো (কিয়াম), কিবলামুখী হওয়া এবং মাটিতে রুকু ও সেজদা করা নামাযের রোকন ও ফরয কাজ । তাই গাড়ি যদি থামানো সম্ভব হয়, তবে যানবাহন থামিয়ে কিবলামুখী হয়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিকভাবে ফরয নামায আদায় করা আবশ্যক । গাড়ি থামানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও চলন্ত গাড়িতে বসে ইশারায় ফরয নামায আদায় করলে নামায একেবারেই হবে না এবং তা পুনরায় আদায় করা ওয়াজিব। ২. ওযরের কারণে গাড়ি থেকে নামা অসম্ভব হলে: যদি প্রচণ্ড বৃষ্টি বা বন্যার কাদার কারণে বাইরে নামায পড়ার মতো কোনো শুকনো জায়গা না থাকে, অথবা বন্য পশু, চোর-ডাকাত বা শত্রুর আক্রমণের নিশ্চিত ভয় থাকে, তবে সেটিকে শরী'আত 'ওযর' হিসেবে গণ্য করে। এমতাবস্থায় গাড়িতে বসেই ইশারার মাধ্যমে ফরয নামায আদায় করা জায়েয । জুতা পবিত্র থাকলে জুতা পরা অবস্থাতেই নামায আদায় হবে । ৩. বিমান বা ট্রেনের ক্ষেত্রে: যেহেতু এগুলো নিজের ইচ্ছায় থামানো যায় না, তাই নামাযের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে জুতা পবিত্র রাখা সাপেক্ষে দাঁড়িয়ে (সম্ভব হলে কিবলামুখী হয়ে) নামায আদায় করতে হবে । দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব না হলে বসেই ইশারার মাধ্যমে নামায আদায় করে নিবেন।
-
কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৮৫-৮৬ (চেয়ারে বসে নামায ও সওয়ারির ওপর নামাযের বিবরণ)
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৮৭-৮৮ (পবিত্র জুতা পরিধানের বিবরণ)।
- নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ১২৬এবং পৃষ্ঠা: ১২৮ ।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (খণ্ড: ১ম), পৃষ্ঠা: ৪৪-৪৫ এবং পৃষ্ঠা: ৫৪-৫৫।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।