মাজারে যাওয়া তাবিজ কবজ করা এমন ব্যক্তি কি মুসলিম থাকে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
কেও যদি মাজারে সিজদা করে ( এখনও করে কি না জানি না) তার বিধান কি?
Answer
মাজারে যাওয়া, তাবিজ কবজ করা এবং মাজারে সিজদার বিধান
প্রশ্নের উত্তর
আপনার প্রশ্নটি কয়েকটি অংশে বিভক্ত। আমি প্রতিটি অংশের উত্তর কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে দিচ্ছি:
১. মাজারে যাওয়া এবং তাবিজ কবজ করা ব্যক্তি কি মুসলিম থাকে?
মাজারে যাওয়া নিজে নিজে কুফরি নয়। অনেক সাহাবী ও তাবেয়ীগণ কবর যিয়ারত করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যিয়ারত করা আমি তোমাদের নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা কবর যিয়ারত করো।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৭৭)
তবে মাজারে গিয়ে মৃত ব্যক্তির কাছে দোয়া চাওয়া, সাহায্য প্রার্থনা করা, সিজদা করা ইত্যাদি শিরকি কাজ। কিন্তু শিরক করলেই কি ব্যক্তি মুসলিম থাকবে না?
হানাফি ফিকহের নীতি: কোনো ব্যক্তি শিরক বা কুফরি করলে তাকে মুসলিম বলা যাবে না, তবে তাকফির (কাফির বলার) ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর নীতি হলো, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তির উপর কুফরির প্রমাণ স্পষ্ট না হয় এবং তার কাছে দলিল পৌঁছে না যায়, ততক্ষণ তাকে কাফির বলা যাবে না।
রদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেছেন:
"কোনো মুসলিমকে কাফির বলার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যদি কোনো ব্যক্তি এমন কাজ করে যা কুফরি হিসেবে গণ্য, কিন্তু সে জানে না যে এটি কুফরি, অথবা তার কাছে দলিল পৌঁছেনি, তবে তাকে কাফির বলা যাবে না।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৫)
তাই: মাজারে যাওয়া বা তাবিজ কবজ করা ব্যক্তি যদি বিশ্বাস করে যে, মাজারের পীর বা ওলি নিজে থেকে কিছু দিতে পারেন, আল্লাহর পরিবর্তে তাকে সাহায্যকারী মনে করে, তবে তা শিরক। কিন্তু যদি সে জানে যে, আল্লাহই সবকিছু করেন এবং পীর শুধু মাধ্যম (ওসিলা), তবে সে মুসলিম থাকবে, যদিও তার আমল ভুল।
তাবিজ কবজ করা সম্পর্কে হাদিসে এসেছে:
"যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলিয়ে রাখল, সে শিরক করল।" (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ১৭৪৪৪)
তবে এটি শিরকে আসগর (ছোট শিরক), যা কবিরা গুনাহ। এর কারণে ব্যক্তি মুসলিম থেকে বের হয়ে যায় না, যদি না সে তাবিজকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করে।
২. এমন মা-বাবার জন্য দোয়া করার বিধান
যদি আপনার মা-বাবা মাজারে যান, তাবিজ কবজ করেন, এমনকি শিরকি কাজেও লিপ্ত হন, তবুও তাদের জন্য দোয়া করা আপনার কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে।" (সূরা আল-ইসরা: ২৩)
মা-বাবার জন্য দোয়া করা সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যখন আদম সন্তান মৃত্যুবরণ করে, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমল ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, এমন ইলম যা দ্বারা উপকৃত হয়, এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)
সুতরাং: আপনার মা-বাবা শিরকি কাজে লিপ্ত হলেও তাদের জন্য দোয়া করা বন্ধ করবেন না। বরং তাদের হেদায়েতের জন্য বেশি বেশি দোয়া করুন। আল্লাহ তাদের হেদায়েত দান করুন।
৩. সম্পর্ক ভালো না হলে সম্পর্ক ভালো হওয়ার দোয়া
হ্যাঁ, সম্পর্ক ভালো হওয়ার দোয়া করা যাবে। ইসলাম সম্পর্ক উন্নয়নকে উৎসাহিত করে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তোমরা পরস্পরে সম্পর্ক ছিন্ন করো না।" (সূরা আল-আনফাল: ১)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।" (সহীহ বুখারি, হাদিস: ৬১৩৮)
দোয়া করার নিয়ম: আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করতে পারেন:
"اللَّهُمَّ أَلِّفْ بَيْنَ قُلُوبِنَا وَأَصْلِحْ ذَاتَ بَيْنِنَا"
"হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরসমূহকে একত্রিত করুন এবং আমাদের মধ্যে সম্পর্ক উন্নত করুন।"
৪. মাজারে সিজদা করার বিধান
মাজারে সিজদা করা সম্পূর্ণ হারাম এবং শিরক। সিজদা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"সিজদা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৭২৯)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য সিজদা করা হারাম এবং এটি কবিরা গুনাহ। তবে যদি কেউ অজ্ঞতাবশত বা ভুলে এমন করে থাকে, তবে তাকে বুঝাতে হবে এবং তওবা করতে বলতে হবে।
ফতোয়ায় আলমগীরি-তে বলা হয়েছে:
"আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য সিজদা করা হারাম। যে ব্যক্তি তা করবে সে গুনাহগার হবে।" (ফতোয়ায় আলমগীরি, ৫/৩২১)
তবে: যদি কেউ মাজারে সিজদা করে এবং বিশ্বাস করে যে, মাজারের পীর আল্লাহর মতো ইবাদতের যোগ্য, তবে তা শিরকে আকবর (বড় শিরক) এবং সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। কিন্তু যদি সে জানে না বা ভুলে করে থাকে, তবে তাকে তওবা করতে হবে এবং ইসলামের সঠিক শিক্ষা বুঝাতে হবে।
এই সর্বময় ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। কোনো মাখলুকের তাতে বিন্দুমাত্র অংশীদারিত্ব নেই। তদ্রূপ উপায়-উপকরণ ছাড়া কাজ করার ক্ষমতা আল্লাহ তাআলা অন্য কাউকে দান করেননি।
মাজার বা মাজারে শায়িত ব্যক্তি সম্পর্কে অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস করা সম্পূর্ণ শিরক। ফিকহের কিতাবে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, ‘কোনো মৃত ব্যক্তিকে তাসাররুফ ক্ষমতার অধিকারী (অর্থাৎ গায়বী ক্ষমতা-বলে কার্যসম্পাদনে সক্ষম) মনে করা কুফরী।-আলবাহরুর রায়েক ২/২৯৮
কেউ যদি গায়রুল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য সেজদা করে, গায়রুল্লাহর নামে কোরবানী করে, গায়রুল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য তার নাম জপতপ করে, মানবীয় ক্ষমতার উর্ধ্বের কোনো বিষয় গায়রুল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে, কোনো মাযার বা দরগাহ এর উদ্দেশ্যে বাইতুল্লাহর মতো তীর্থযাত্রা করে, হারাম শরীফের মতো দরগাহ ও তার চারপাশের অঞ্চলকে তীর্থস্থান মনে করে, মাযার-দরগাহর তওয়াফ করে এবং দরগাহর দেয়ালে ভক্তিভরে চুম্বন করে, মোটকথা, যেসব কাজ আল্লাহ তাআলা তাঁর উপাসনার জন্য নির্ধারণ করেছেন তা গায়রুল্লাহর জন্য করে তাহলে তা হবে সম্পূর্ণ শিরক। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন : তাসাওউফ : তত্ত্ব ও বিশ্লেষণ, পৃষ্ঠা : ২১২-২২৯
শরীয়তের বিধান হলো কেউ যদি গায়রুল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য সেজদা করে, গায়রুল্লাহর নামে কোরবানী করে, গায়রুল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য তার নাম জপতপ করে, মানবীয় ক্ষমতার উর্ধ্বের কোনো বিষয় গায়রুল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে, মাযার-দরগাহর তওয়াফ করে, মোটকথা, যেসব কাজ আল্লাহ তাআলা তাঁর উপাসনার জন্য নির্ধারণ করেছেন তা গায়রুল্লাহর জন্য করে তাহলে তা হবে সম্পূর্ণ শিরক।
এবং যে ব্যাক্তি মাযার বা মাযারে শায়িত ব্যক্তি সম্পর্কে অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস করে,সে শিরক করলো। , সুতরাং কেহ যদি সত্যিকার অর্থেই এহেন আকিদা, বিশ্বাস মনে প্রানে পোষন করে মাজারে সেজদাহ ইত্যাদি করে,তাহলে সে কুফরী করলো। তাকে নতুন করে কালেমা পড়ে ঈমান আনতে হবে। খালেছ দিলে তওবা করতে হবে।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |-------|--------| | মাজারে যাওয়া | জায়েয (যদি শিরকি কাজ না করে) | | কুফরী তাবিজ কবজ করা | হারাম/শিরকে আসগর (ছোট শিরক) | | মাজারে সিজদা করা | হারাম/শিরকে আকবর (যদি বিশ্বাসসহ হয়) | | এমন মা-বাবার জন্য দোয়া | ওয়াজিব/কর্তব্য | | সম্পর্ক উন্নয়নের দোয়া | জায়েয এবং উৎসাহিত |
মা-বাবার জন্য দোয়া করা বন্ধ করবেন না। তাদের হেদায়েতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করুন এবং নম্রভাবে ইসলামের সঠিক শিক্ষা বোঝানোর চেষ্টা করুন। সম্পর্ক ভালো করার জন্য দোয়া করা উত্তম।
"رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا"
"হে আমার রব! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।" (সূরা আল-ইসরা: ২৪)
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।