যিনা ব্যভিচারে লিপ্ত ব্যক্তির জন্য করণীয় কি?
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
ঘটনাটির শুরু হয় ১ বছর আগে। আমার পরিবার নানা জায়গা থেকে আমার জন্য ছেলে দেখা শুরু করে। কিন্ত আমি সুন্দরী হওয়ার পরেও ছেলে পক্ষের নানান চাহিদার কারণে ছেলেপক্ষ বিয়ের জন্য অগ্রসর হত না। এরকমই একজন ছেলে আমাকে দেখতে আসে যাকে আমার অনেক পছন্দ হয় এবং ছেলেটিও আমাকে খুব পছন্দ করে কিন্ত ছেলের মায়ের অমত থাকায় প্রস্তাবটি সরে যায়। কিন্ত সেই ছেলে আজ অব্দি আমাকে ভুলতে পারে নি এবং আমিও পারি নি। যেহেতু দুইজনেরই দুজনের প্রতি দুর্বলতা ছিল তাই একটা পর্যায়ে দুইজনই শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পরি। যদিও এটা সবসময় না। ৩/৪ মাস পর পর একবার দেখা হয়।
গত ১ বছরে দুইজনই দুইজনের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি যাতে এই পথ থেকে বের হতে পারি বা বিয়ে করতে পারি অন্যত্র। কিন্ত সবসময় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। আমি আল্লাহর কাছে অনেক কেদেকেটে দোয়া করতাম যাতে আমার বিয়ের ব্যবস্থা করে দেয় এবং আমাকে পর পুরুষদের আড়ালে রাখে। কিন্ত কেন যেন এই ছেলেটির সাথে কোনো না কোনো ভাবে দেখা হয়ে যায় এবং বিষয় টা শারীরিক সম্পর্কে চলে যায়।
আগে বিয়ে না হওয়ার কারনে প্রচুর মন খারাপ হত কিন্ত এখন মনে হয় বিয়ে না করেই ভালো আছি। কারণ বিবাহিতদের তাদের বিবাহিত জীবন নিয়ে অভিযোগ এর শেষ নেই। আশেপাশের স্বামী স্ত্রীর অত্যাচার নির্যাতন এইসব নিউজ দেখে মনে হয় আল্লাহই হয়ত চাননি আমি বিয়ে করি। কারণ অবিবাহিত অবস্থায় ভালোই তো আছি আমি। এবং এটাও মনে হয় যে যৌন চাহিদা মিটানো তো আমার অধিকার কারণ স্বয়ং আল্লাহই আমাকে এই চাহিদা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং যেখানে আমি নিজে ২০/২৫ টা পাত্র দেখে ফেলেছি বিয়ের জন্য কিন্ত সব সময়ই ছেলে পক্ষের অধিক চাহিদা থাকার কারনে বিয়ে হয় নি আমার। আমি সব সময়ই নিজের সাথে কুফু মিলিয়ে ছেলে দেখতাম বা আমার চাইতেও নিম্নবিত্ত ছেলে দেখেছি। কোথাও ই কাজ হয় নি। বিয়ে করার জন্য আমি যথেষ্ট চেষ্টা করেছি, তাই এখানে আমার কোনো দোষ নেই। বরং আল্লাহ যিনার রাস্তাটাই আমার জন্য সহজ করে দিয়েছেন বিয়ের চাইতে। মাঝে মধ্যে আমার খুব ক্ষোভ হয় আল্লাহর প্রতি কারণ আমি এমন জীবন চাইনি। আমি চাইতাম রবের সন্তুষ্টি অর্জন করতে কিন্ত আমি ব্যর্থ। এইযে আমার এরকম ধারনা আসছে যে বিয়ে না করেই ভালো আছি এবং যিনা করাটা মানুষ হিসেবে আমার অধিকার, এই ধারণা গুলো তো সঠিক না তবে এমন ধারণা কেন আসছে?
Answer
যিনায় লিপ্ত হওয়া সম্পর্কে ফতোয়া
ভূমিকা
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আমি ইসলামী শরীয়াহ মোতাবেক এবং সালাফি/আহলে হাদীস পদ্ধতি অনুসারে উত্তর দিচ্ছি।
যিনার গুরুতর পাপ
যিনা (ব্যভিচার) ইসলামের সবচেয়ে গুরুতর পাপগুলোর মধ্যে একটি। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا "আর ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পথ।" (সূরা আল-ইসরা: ৩২)
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: "যিনা是所有 পাপের মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য পাপগুলোর একটি, যা আল্লাহর ক্রোধ ও শাস্তির কারণ।"
আপনার ধারণাগুলোর খণ্ডন
১. "যিনা করা আমার অধিকার" - এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল
আপনি বলেছেন যে যৌন চাহিদা মেটানো আপনার অধিকার। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। আল্লাহ মানুষকে যৌন চাহিদা দিয়েছেন, কিন্তু তা পূরণের বৈধ পথ হলো বিয়ে। আল্লাহ বলেন:
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً "আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই জাতি থেকে স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা আর-রুম: ২১)
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: "যৌন চাহিদা পূরণের একমাত্র বৈধ পথ হলো বিবাহ। যিনা এই চাহিদা পূরণের অবৈধ পথ, যা আল্লাহর ক্রোধ ও শাস্তি ডেকে আনে।"
২. "বিয়ে না করেই ভালো আছি" - এই ধারণাও ভুল
বিয়ে ইসলামে একটি সুন্নাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ "হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহের সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিবাহ করে। কারণ বিবাহ দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানের পবিত্রতা রক্ষা করে।" (সহীহ বুখারী: ৫০৬৬, সহীহ মুসলিম: ১৪০০)
শায়খ আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: "বিয়ে হলো চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। যারা বিবাহ করতে সক্ষম কিন্তু বিবাহ করে না, তারা নিজেদেরকে ফিতনার মধ্যে নিক্ষেপ করে।"
৩. "বিয়ে না হওয়ায় আমার দোষ নেই" - দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা
বিয়ে না হওয়া আপনার যিনা করার অজুহাত হতে পারে না। আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَكْسِبُ كُلُّ نَفْسٍ إِلَّا عَلَيْهَا وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ "প্রত্যেকে নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী এবং কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না।" (সূরা আল-আনআম: ১৬৪)
শায়খ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেছেন: "বিয়ে না হওয়া বা বিবাহে বিলম্ব হওয়া কখনোই যিনা করার বৈধ অজুহাত হতে পারে না। প্রতিটি মানুষ তার নিজের আমলের জন্য দায়ী।"
৪. "আল্লাহ যিনার পথ সহজ করে দিয়েছেন" - এটি শয়তানের প্ররোচনা
এই ধারণা সম্পূর্ণ শয়তানের কুমন্ত্রণা। আল্লাহ কখনো পাপের পথ সহজ করেন না। বরং আল্লাহ বলেন:
الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِالْفَحْشَاءِ "শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীল কাজের আদেশ দেয়।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২৬৮)
ইবনে কাইয়্যিম (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: "শয়তান মানুষের কাছে পাপকে সুন্দর করে উপস্থাপন করে এবং তাকে ধোঁকা দেয় যে এটি তার জন্য সহজ ও প্রয়োজনীয়।"
তওবার পথ
আপনার জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তরিক তওবা। আল্লাহ বলেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا "বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছে, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেন।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
তওবার শর্তসমূহ:
১. পাপ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকা ২. কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া ৩. ভবিষ্যতে পাপে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প ৪. যদি কারো হক নষ্ট হয়ে থাকে, তা ফিরিয়ে দেওয়া
শায়খ ইবনে বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: "আন্তরিক তওবা হলো এমন তওবা যা পাপ পরিত্যাগ, অনুতাপ এবং ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্পের সাথে হয়। যদি তওবা এভাবে হয়, তবে আল্লাহ তা কবুল করেন।"
ব্যবহারিক পরামর্শ
১. সেই পুরুষের সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করুন - তাকে সব যোগাযোগের মাধ্যম থেকে ব্লক করুন, নম্বর পরিবর্তন করুন ২. বিয়ে করার আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যান - তবে ধৈর্য সহকারে এবং আল্লাহর উপর ভরসা রেখে ৩. রোজা রাখুন - রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: "যে ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে, কারণ রোজা তার জন্য ঢাল স্বরূপ।" (সহীহ বুখারী: ৫০৬৬) ৪. আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করুন - তবে এই দোয়া করুন যেন আল্লাহ আপনাকে পাপ থেকে রক্ষা করেন এবং ভালো স্বামী দান করেন ৫. সৎ মহিলাদের সাহচর্য গ্রহণ করুন - যারা আপনাকে দ্বীনের উপর অটল থাকতে সাহায্য করবে ৬. আল্লাহর প্রতি আপনার ক্ষোভের কথা ভুলে যান - আল্লাহ কখনো বান্দার ক্ষতি চান না। বরং তিনি চান আপনার কল্যাণ
উপসংহার
আপনার উচিত:
- অবিলম্বে এই পাপ থেকে তওবা করা
- সেই পুরুষের সাথে সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করা
- আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া
- বিবাহের জন্য ধৈর্য সহকারে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া
- আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখা
মনে রাখবেন, আল্লাহ ক্ষমাশীল এবং দয়ালু। তিনি বান্দার তওবা কবুল করতে ভালোবাসেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ عَلَى مَا كَانَ فِيكَ وَلَا أُبَالِي "আল্লাহ তাআলা বলেন: হে আদম সন্তান! তুমি যতক্ষণ আমাকে ডাকবে এবং আমার কাছে আশা করবে, ততক্ষণ আমি তোমাকে ক্ষমা করব, তোমার মধ্যে যা-ই থাকুক না কেন।" (তিরমিযী: ৩৫৪০)
আল্লাহ আপনাকে তওবার তাওফীক দান করুন এবং পাপ থেকে হেফাজত করুন। আমীন।