মেয়েদের গোফ বড় হলে উপড়ে ফেলা যাবে কি না?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমার মেয়ে কাজিনের গোফের জায়গায় অনেক পশম এবং তা বড় বড়।হরমোনের সমস্যার কারণে সম্ভবত।দেখতে কিছুটা খারাপ দেখায়।ও সেগুলো লেজার ট্রিটমেন্ট এর মাধ্যমে উপড়ে ফেলতে চাচ্ছে। এটা কি জায়েজ হবে?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার মেয়ের মুখমণ্ডলে (গোফের জায়গায়) অতিরিক্ত লোম হওয়া এবং তা লেজার ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে অপসারণের বিধান সম্পর্কে ইসলামী শরিয়তের আলোকে নিম্নে বর্ণনা করা হলো।
শরিয়তের মূলনীতি:
ইসলামী শরিয়তে নারীদের জন্য মুখমণ্ডলের লোম (গোফ, দাড়ি) অপসারণ করা জায়েয। বরং নারীদের জন্য মুখের লোম উঠানো মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) বলে অভিমত দেওয়া হয়েছে। কারণ, নারীর সৌন্দর্য তার স্বামীর জন্য; আর মুখে গোফ-দাড়ি থাকা নারীর সৌন্দর্য নষ্ট করে।
হাদিসের দলিল:
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "لَعَنَ اللَّهُ الْوَاشِمَاتِ وَالْمُسْتَوْشِمَاتِ وَالنَّامِصَاتِ وَالْمُتَنَمِّصَاتِ" "আল্লাহ তাআলা অভিশাপ দিয়েছেন সেই নারীদেরকে যারা (অন্যের শরীরে) উল্কি আঁকে এবং যারা (নিজের শরীরে) উল্কি আঁকায়, যারা (অন্যের) ভ্রু-লোম উপড়ে ফেলে এবং যারা (নিজের) ভ্রু-লোম উপড়ে ফেলে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১২৫)
এই হাদিসে নারীদের জন্য ভ্রু এর লোম উপড়ে ফেলা (নামাস) নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু মুখমণ্ডলের অন্যান্য লোম (গোফ, দাড়ি) অপসারণ করা নিষিদ্ধ নয়। বরং ফুকাহায়ে কেরামগণ বলেছেন, নারীর জন্য গোফ-দাড়ি উঠানো জায়েয, কারণ এটি নারীর জন্য বিকৃতির কারণ। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭৩)
হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের বক্তব্য:
১. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) -এ উল্লেখ আছে: "নারীদের জন্য মুখমণ্ডলের লোম (গোফ-দাড়ি) উঠানো জায়েয, কারণ এটি তাদের জন্য শোভনীয় নয়। তবে ভ্রু-লোম উঠানো জায়েয নয়, কারণ এটি পরিবর্তন করার নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭৩)
২. ফাতাওয়া আলমগীরি (ফাতাওয়া হিন্দিয়া) -এ বলা হয়েছে: "নারীদের জন্য গোফ ও দাড়ির লোম উঠানো জায়েয।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৮)
৩. আল-হিদায়া -এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, নারীর জন্য মুখের লোম অপসারণ করা জায়েয, কারণ এটি নারীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং স্বামীর আকর্ষণ বাড়ায়।
লেজার ট্রিটমেন্টের বিধান:
লেজার ট্রিটমেন্ট মূলত লোমের গোড়া (ফলিকল) ধ্বংস করে স্থায়ীভাবে লোম অপসারণের একটি আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি। যেহেতু শরিয়তে নারীর জন্য মুখমণ্ডলের লোম (গোফ-দাড়ি) অপসারণ করা জায়েয, তাই লেজার ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে তা অপসারণ করাও জায়েয হবে। কারণ, পদ্ধতিটি বৈধ হলে তার আধুনিক মাধ্যমও বৈধ হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত তাতে শরিয়তের কোনো নিষেধাজ্ঞা (যেমন: সতর খোলা, গুনাহের কাজ) জড়িত না থাকে।
তবে কয়েকটি শর্ত মাথায় রাখতে হবে:
১. সতর ঢেকে রাখা: লেজার ট্রিটমেন্টের সময় যদি মুখমণ্ডল ছাড়া অন্য কোনো স্থানে (যেমন: পা, হাত) লেজার করাতে হয়, তবে অবশ্যই অমুসলিম বা পুরুষ ডাক্তারের কাছে নয়, বরং মুসলিম মহিলা ডাক্তার বা বিশেষজ্ঞের কাছে করাতে হবে। আর মুখমণ্ডলের ক্ষেত্রে সতরের বিষয়টি ততটা কঠিন নয়, কারণ মুখমণ্ডল সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়।
২. স্বামীর অনুমতি: বিবাহিত নারীর জন্য স্বামীর অনুমতি নেওয়া উত্তম, যদিও এটি ফরজ নয়। তবে স্বামীর সন্তুষ্টি বজায় রাখা ভালো।
৩. ক্ষতির আশঙ্কা না থাকা: যদি কোনো ডাক্তার জানান যে, লেজার ট্রিটমেন্টে আপনার মেয়ের ত্বকের ক্ষতি হতে পারে বা অন্য কোনো শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা আছে, তবে তা করা থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ, শরিয়তে নিজের ক্ষতি করা নিষিদ্ধ।
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) -এর ফতোয়া: মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর ফতোয়ায় বলেছেন, নারীদের জন্য মুখমণ্ডলের লোম উঠানো জায়েয, তবে ভ্রু-লোম উঠানো জায়েয নয়। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২১৭)
মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) -এর মত: তিনিও বলেছেন, নারীদের জন্য মুখমণ্ডলের অতিরিক্ত লোম (গোফ-দাড়ি) অপসারণ করা জায়েয, কারণ এটি নারীর সৌন্দর্যের জন্য ক্ষতিকর। তবে ভ্রু-লোম অপসারণ করা জায়েয নয়। (ফিকহুল বুয়ূত, ২/৪৫৬)
সারসংক্ষেপ:
আপনার মেয়ের ক্ষেত্রে, যেহেতু হরমোনের সমস্যার কারণে তার মুখে (গোফের জায়গায়) অতিরিক্ত লোম হয়েছে এবং এটি দেখতে খারাপ দেখায়, তাই লেজার ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে তা অপসারণ করা জায়েয হবে। এটি কোনো গুনাহের কাজ নয়। তবে নিশ্চিত করুন যে, চিকিৎসাটি কোনো বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে হচ্ছে এবং তাতে কোনো শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা নেই।
আল্লাহ তাআলাই সর্বজ্ঞ।