মেয়েদের সামনে মাথার চুল খোলা রাখা কি জায়েজ?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 4563
Questioner: m
Question Asked: 28 Aug 2026, 03:11 AM
Reviewed & Published: 28 Aug 2026, 05:48 AM
Views: 8
Tokens: 4,916
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

শুধু মেয়েদের সামনে মেয়েরা মাথা চুলসহ খোলা রাখা, হাত বাহু পর্যন্ত বের করা এবং পা খোলা রেখে বিয়েতে সাজা কি উত্তম নাকি অনুত্তম বিষয়? মেয়েরা অপরিচিত মেয়ে এবং কোনো পুরুষের কাছে ছবি না যাওয়ার শর্তে এই অবস্থায় কাছের মানুষরা ছবি তোলা কি জায়েজ?

Answer

শুধু মেয়েদের সামনে মেয়েদের পর্দা ও ছবি তোলার বিধান

প্রশ্নের উত্তর

১. মেয়েদের সামনে মেয়েদের পর্দার বিধান

ইসলামী শরীয়তে পর্দার মূল উদ্দেশ্য হলো অশ্লীলতা ও ফিতনা প্রতিরোধ। মেয়েদের সামনে মেয়েদের পর্দার বিধান সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসের আলোকে নিম্নরূপ:

কুরআনের নির্দেশনা:

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا "আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে থাকে তা ছাড়া।" (সূরা আন-নূর: ৩১)

এই আয়াতে মহিলাদের জন্য অপর নারীদের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশের অনুমতির বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তাফসীরবিদগণ বলেন, "إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا" অর্থাৎ যা সাধারণত প্রকাশ থাকে—যেমন মুখমণ্ডল, হাতের তালু ইত্যাদি।

হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি:

হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (রাদ্দুল মুহতার) এ উল্লেখ আছে:

المرأة الحرة كلها عورة إلا وجهها وكفيها في الصلاة، وأما في النظر إليها فإنه يجوز النظر إلى وجهها وكفيها عند الخاطب وغيره عند عدم الشهوة "স্বাধীন নারীর সমস্ত শরীর সতর, তবে নামাযের ক্ষেত্রে মুখমণ্ডল ও দুই হাতের তালু ছাড়া। আর দেখার ক্ষেত্রে—বিবাহের পাত্রসহ অন্য কারো জন্য প্রবৃত্তির আশংকা না থাকলে মুখমণ্ডল ও হাতের তালু দেখা জায়েয।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬)

মেয়েদের সামনে মেয়েদের পর্দা:

মেয়েদের সামনে মেয়েদের পর্দার বিধান সম্পর্কে হানাফী ফিকহে উল্লেখ আছে:

ولا بأس أن تنظر المرأة إلى المرأة إذا لم تكن كتابية، لأنها تستر عنها ما تستر عن محارمها "মুসলিম নারীর জন্য অন্য মুসলিম নারীকে দেখা দোষণীয় নয়, কারণ সে তার নিকট তেমনই পর্দা করে যেমন তার মাহরাম পুরুষদের নিকট করে।" (বাদায়েউস সানায়ে, ৫/১২৩)

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মেয়েদের সামনে মেয়েরা মাথার চুল খোলা রাখা, হাত বাহু পর্যন্ত বের করা এবং পা খোলা রাখা উত্তম নয়। কারণ:

১. শরীর ঢেকে রাখা সৌন্দর্যের অংশ: ইসলাম নারীদেরকে সতর ঢেকে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এমনকি মেয়েদের সামনেও সম্পূর্ণ খোলামেলা অবস্থা শরীয়তসম্মত নয়।

২. ফিতনার আশংকা: বর্তমান যুগে নারীদের মাঝেও ফিতনা ও অশ্লীলতার বিস্তার ঘটেছে। তাই সতর্কতা হিসেবে মেয়েদের সামনেও পরিমিত পর্দা করা উচিত।

৩. ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মত: ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, মুসলিম নারীর জন্য অন্য মুসলিম নারীর সামনে নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢেকে রাখা আবশ্যক। (বাদায়েউস সানায়ে, ৫/১২৩)

ফাতাওয়া হিন্দিয়া (ফাতাওয়া আলমগীরী) তে উল্লেখ আছে:

ولا بأس بالنظر إلى شعرها وساقها إذا كانت المرأة مسلمة، هكذا في المحيط "মুসলিম নারীর চুল ও পায়ের নলা দেখতে দোষ নেই। এভাবে মহিত গ্রন্থে উল্লেখ আছে।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩২৮)

তবে এই অনুমতি শর্তসাপেক্ষ—যখন ফিতনার আশংকা না থাকে। বর্তমান যুগে যখন নারীদের মাঝেও ফ্যাশন ও প্রদর্শনীর প্রবণতা বেড়েছে, তখন সতর্কতা অবলম্বন করাই উত্তম।

২. মেয়েদের ছবি তোলার বিধান

ছবি তোলার সাধারণ বিধান:

ইসলামী শরীয়তে প্রাণবান সৃষ্টির ছবি তোলা সম্পর্কে হাদিসে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

أشد الناس عذابا يوم القيامة المصورون "কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন আযাবে থাকবে ছবি নির্মাতারা।" (সহীহ বুখারী: ৫৯৫০, সহীহ মুসলিম: ২১০৯)

তবে ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, প্রয়োজনের তাগিদে ছবি তোলার অনুমতি রয়েছে। যেমন—পাসপোর্ট, পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদির জন্য ছবি তোলা জায়েয।

মেয়েদের ছবি তোলার বিধান:

মেয়েদের ছবি তোলার ক্ষেত্রে মূল শর্ত হলো—ছবি যেন কোনো বেগানা পুরুষের কাছে না পৌঁছায়। যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে ছবি কোনো পুরুষের কাছে যাবে না এবং শুধুমাত্র মেয়েদের কাছেই থাকবে, তবে সেক্ষেত্রে কিছু শর্তে ছবি তোলা জায়েয হতে পারে।

মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:

اگر تصویر صرف عورتوں کے پاس رہے اور کسی مرد کے پاس نہ جائے تو بعض علماء نے اس کی گنجائش دی ہے، لیکن بہتر یہی ہے کہ اس سے بھی احتراز کیا جائے "যদি ছবি শুধুমাত্র মহিলাদের কাছেই থাকে এবং কোনো পুরুষের কাছে না যায়, তবে কিছু আলেম এতে অনুমতি দিয়েছেন। তবে উত্তম হলো এ থেকেও বিরত থাকা।"

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) তাঁর ফতোয়ায় উল্লেখ করেছেন:

عورتوں کا عورتوں کے لیے تصویر کھینچنا اگر کسی مرد کے پاس جانے کا اندیشہ نہ ہو تو جائز ہے، لیکن احتیاط اس میں ہے کہ نہ کھینچی جائے "মহিলাদের জন্য মহিলাদের ছবি তোলা—যদি কোনো পুরুষের কাছে যাওয়ার আশংকা না থাকে তবে জায়েয, কিন্তু এতে সতর্কতা হলো ছবি না তোলা।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৯৩)

৩. বর্তমান প্রেক্ষাপটে করণীয়

১. বিয়ের অনুষ্ঠানে মেয়েদের সাজসজ্জা: বিয়ের অনুষ্ঠানে মেয়েরা মাথার চুল খোলা রেখে, হাত বাহু পর্যন্ত বের করে এবং পা খোলা রেখে সাজা উত্তম নয়। এমনকি মেয়েদের সামনেও নয়। কারণ:

  • এটি ইসলামী সংস্কৃতি নয়, বরং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুকরণ
  • এতে শরীরের সৌন্দর্য প্রদর্শনের প্রবণতা থাকে
  • বর্তমান যুগে ছবি ও ভিডিও সহজেই ছড়িয়ে পড়ে

২. ছবি তোলার ক্ষেত্রে: এমনকি যদি শর্ত থাকে যে ছবি কোনো পুরুষের কাছে যাবে না, তবুও উত্তম হলো ছবি তোলা থেকে বিরত থাকা। কারণ:

  • ছবি তোলার পর নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন
  • সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে
  • হাদিসে ছবি সম্পর্কে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে

৩. বিয়ের অনুষ্ঠানে সঙ্গীত ও অন্যান্য বিষয়: বিয়ের অনুষ্ঠানে ইসলামী বিধান মেনে চলা উচিত। অশ্লীল গান-বাজনা, নাচ ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

সংক্ষিপ্ত ফতোয়া

প্রশ্ন ১: শুধু মেয়েদের সামনে মেয়েরা মাথা চুলসহ খোলা রাখা, হাত বাহু পর্যন্ত বের করা এবং পা খোলা রেখে বিয়েতে সাজা কি উত্তম?

উত্তর: না, এটি উত্তম নয়। যদিও হানাফী ফিকহে মুসলিম নারীর জন্য অন্য মুসলিম নারীর সামনে চুল ও পা খোলা রাখার অনুমতি রয়েছে (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩২৮), তবে বর্তমান যুগে ফিতনার আশংকা এবং ইসলামী সংস্কৃতি রক্ষার স্বার্থে এবং এসব অনুষ্ঠানে অনেকে অজান্তেও ছবি তোলে,তাই মেয়েদের সামনেও পরিমিত পর্দা করা উচিত। শরীরের সতর অংশ (নাভি থেকে হাঁটু) ঢেকে রাখা এবং অন্যান্য অংশও যথাসম্ভব ঢেকে রাখা উত্তম।

প্রশ্ন ২: মেয়েরা অপরিচিত মেয়ে এবং কোনো পুরুষের কাছে ছবি না যাওয়ার শর্তে এই অবস্থায় কাছের মানুষরা ছবি তোলা কি জায়েজ?

উত্তর: যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে ছবি কোনো বেগানা পুরুষের কাছে পৌঁছাবে না এবং শুধুমাত্র মেয়েদের কাছেই থাকবে, তবে কিছু আলেমের মতে সীমিত পরিসরে অনুমতি রয়েছে। তবে উত্তম হলো ছবি তোলা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা। কারণ ছবি তোলার পর তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং হাদিসে ছবি সম্পর্কে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৯৩)

তাই সতর্কতামূলক ছবি তোলা থেকে বেঁচে থাকা উচিত।

মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:

بہتر یہ ہے کہ ان صورتوں سے بھی احتراز کیا جائے، کیونکہ تصویر کا استعمال آج کل بہت عام ہے اور اس کے بگڑنے کا اندیشہ ہے "উত্তম হলো এসব ক্ষেত্রেও বিরত থাকা, কারণ বর্তমানে ছবির ব্যবহার খুবই সাধারণ এবং এর বিকৃত হওয়ার আশংকা রয়েছে।"

দলিলসমূহ

কুরআন:

  1. সূরা আন-নূর: ৩১
  2. সূরা আল-আহযাব: ৫৯

হাদিস:

  1. সহীহ বুখারী: ৫৯৫০
  2. সহীহ মুসলিম: ২১০৯
  3. সুনানে আবু দাউদ: ৪১৭৪

হানাফী ফিকহের কিতাব:

  1. রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬
  2. বাদায়েউস সানায়ে, ৫/১২৩
  3. ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩২৮
  4. ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৯৩
  5. ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫৬

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.