হাত তুলে মুনাজাত করার বিধান

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 4512
Questioner: Asif
Question Asked: 26 Aug 2026, 03:06 PM
Reviewed & Published: 26 Aug 2026, 03:44 PM
Views: 33
Tokens: 3,884
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আ'লাইকুম,
১.জানতে চেয়েছিলাম যে পস্রাবএর বেগ থাকা অবস্থায় হাত তুলে দোয়া করা যাবে।
২.হাত তুলে মুনাজাতে অযু কি অবশ্যক?
৩.শুয়ে শুয়ে কি হাত না তুলে মুনাজাত করা যায়?
৪.কোনো গুনাহ হয়ে গেলে কিভাবে তাওবা করবো হাত না তুলে?

Answer

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তব জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। নিচে কুরআন, হাদিস এবং প্রামাণ্য হানাফি কিতাবের আলোকে প্রতিটি প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।


১. পেশাবের বেগ থাকা অবস্থায় হাত তুলে দোয়া করা যাবে কি?

উত্তর: পেশাবের বেগ (তাগড়া) থাকা অবস্থায় হাত তুলে দোয়া করা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) এবং অনুচিত।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

"পেশাবের বেগ নিয়ে (চাপা দিয়ে) নামাজ পড়া যাবে না, এবং পায়খানার বেগ নিয়েও নামাজ পড়া যাবে না।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৮৮; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৬১৭)

এই হাদিসটি নামাজের প্রসঙ্গে বলা হলেও, দোয়া বা মুনাজাতও একটি ইবাদত। দোয়ার সময় অন্তরের একাগ্রতা (খুশু) এবং মনোযোগ (হুজুরি) অপরিহার্য। পেশাবের বেগ থাকা অবস্থায় অন্তরে শান্তি থাকে না এবং মনোযোগ বিনষ্ট হয়। তাই এই অবস্থায় হাত তুলে দোয়া করা মাকরূহ।

হানাফি ফিকহের নির্দেশনা: ফিকহের কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে যে, পায়খানা-পেশাবের বেগ নিয়ে ইবাদতে দাঁড়ানো বা দোয়া করা মাকরূহ। কারণ, এতে ইবাদতের আদব (শিষ্টাচার) লঙ্ঘিত হয়। (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৬৫০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১০৬)

সারকথা: পেশাবের বেগ থাকা অবস্থায় প্রথমে পেশাব সেরে নেওয়া উচিত, অতঃপর পবিত্র অবস্থায় হাত তুলে দোয়া করা উচিত। বেগ নিয়ন্ত্রণ করে দোয়া করা অন্তরের একাগ্রতার পরিপন্থী।


২. হাত তুলে মুনাজাতে অযু কি অবশ্যক?

উত্তর: না, হাত তুলে মুনাজাত বা দোয়া করার জন্য অযু করা অবশ্যক (ফরজ) নয়। তবে অযু করা অত্যন্ত উত্তম এবং মুস্তাহাব

দোয়া একটি মহান ইবাদত। পবিত্রতা (তাহারাত) হলো ইবাদতের জন্য উত্তম পদ্ধতি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেও পবিত্র অবস্থায় দোয়া করতেন।

তবে যদি কেউ অযু ছাড়াই দোয়া করে, তবে তার দোয়া শুদ্ধ হবে এবং আল্লাহ তায়ালা তা কবুল করতে পারেন। কারণ, দোয়ার জন্য পবিত্রতা শর্ত নয়, বরং তা আদবের অংশ।

হানাফি ফিকহের নির্দেশনা: ফিকহের কিতাবে উল্লেখ আছে, দোয়া ও যিকিরের জন্য পবিত্রতা (অযু) শর্ত নয়, তবে উত্তম। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩২১; রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৯৩)

সারকথা: অযু না থাকলে দোয়া করা যাবে, তবে অযু করে দোয়া করা বেশি ফজিলতপূর্ণ এবং আদবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।


৩. শুয়ে শুয়ে কি হাত না তুলে মুনাজাত করা যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, শুয়ে শুয়ে হাত না তুলে মুনাজাত বা দোয়া করা জায়েয (বৈধ)

দোয়ার জন্য হাত তোলা বা নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে বসা শর্ত নয়। দোয়া হলো অন্তরের সাথে আল্লাহর সম্পর্ক স্থাপন করা। যে অবস্থাতেই মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করবে এবং দোয়া করবে, তা জায়েয।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

"তোমাদের কেউ যখন তার রবের কাছে দোয়া করে, তখন সে যেন তার প্রয়োজন পূরণের জন্য দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে দোয়া করে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩৩৮)

এই হাদিসে দোয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ভঙ্গি বা অবস্থানের কথা বলা হয়নি। বরং অন্তরের দৃঢ়তা ও একাগ্রতার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

হানাফি ফিকহের নির্দেশনা: ফিকহের কিতাবে উল্লেখ আছে, দোয়া করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো অবস্থান (দাঁড়ানো, বসা, শোয়া) শর্ত নয়। অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে শুয়ে থেকেও দোয়া করা জায়েয। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩১৯; রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৪৫)

সারকথা: শুয়ে শুয়ে হাত না তুলে দোয়া করা সম্পূর্ণ জায়েয। তবে হাত তুলে, কিবলামুখী হয়ে, পবিত্র অবস্থায় দোয়া করা বেশি ফজিলতপূর্ণ।


৪. কোনো গুনাহ হয়ে গেলে কিভাবে তাওবা করবো হাত না তুলে?

উত্তর: গুনাহ হয়ে গেলে তাওবা করার জন্য হাত তোলা জরুরি নয়। তাওবা করার জন্য হাত তোলা বা না তোলা শর্ত নয়। বরং তাওবার মূল শর্ত হলো অন্তরের আন্তরিক অনুতাপ

তাওবা কবুল হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ করা অপরিহার্য:

১. গুনাহটি সাথে সাথে বন্ধ করা। ২. গুনাহের জন্য অন্তরে অনুতপ্ত হওয়া এবং লজ্জিত হওয়া। ৩. ভবিষ্যতে এই গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করা। ৪. যদি গুনাহটি আল্লাহর হকের সাথে সম্পর্কিত হয় (যেমন: নামাজ না পড়া, রোজা না রাখা), তবে তা কাজা করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। ৫. যদি গুনাহটি বান্দার হকের সাথে সম্পর্কিত হয় (যেমন: কাউকে গালি দেওয়া, কারো সম্পদ আত্মসাৎ করা), তবে প্রথমে সেই বান্দার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া বা তার হক আদায় করা।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

"তাওবা হলো: গুনাহ থেকে ফিরে আসা, অনুতপ্ত হওয়া এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।" (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ১৮৩৭৬)

হানাফি ফিকহের নির্দেশনা: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং অন্যান্য ফুকাহায়ে কেরামের মতে, তাওবার জন্য হাত তোলা বা নির্দিষ্ট কোনো আমল জরুরি নয়। তাওবা হলো অন্তরের কাজ। হাত তোলা বা না তোলা তাওবার শুদ্ধতার উপর কোনো প্রভাব ফেলে না। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩৫০; রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৪২২)

সারকথা: গুনাহ হয়ে গেলে হাত না তুলে, অন্তরে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে তাওবা হবে। তবে হাত তুলে দোয়া করলে তা অতিরিক্ত ফজিলতের কারণ হবে, কিন্তু তা তাওবার জন্য শর্ত নয়।


সংক্ষিপ্ত উত্তর:

| প্রশ্ন | উত্তর | | :--- | :--- | | ১. পেশাবের বেগ থাকা অবস্থায় হাত তুলে দোয়া | ** মাকরূহ। প্রথমে পেশাব সেরে নেওয়া উচিত। | | ২. হাত তুলে মুনাজাতে অযু | অবশ্যক নয়, তবে অযু করা উত্তম ও মুস্তাহাব। | | ৩. শুয়ে শুয়ে হাত না তুলে মুনাজাত | জায়েয, দোয়ার জন্য নির্দিষ্ট ভঙ্গি শর্ত নয়। | | ৪. গুনাহ হয়ে গেলে তাওবা | হাত তোলা জরুরি নয়, অন্তরে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাইলে তাওবা হবে। |

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে ইবাদত করার এবং গুনাহ থেকে তাওবা করার তাওফিক দান করুন। (আমিন)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.