অসিয়তের জমি হাতে না পেয়ে বিক্রি করা যাবে কিনা?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
উল্লেখ্য, অসিয়তের বিষয়টি দালিলিক ছিলো না। মৃত ব্যক্তি মৌখিকভাবে বলেছলেন। এবং এতে সকল ওয়ারিশ একমত যে অসিয়তটি সত্য। যেহেতু দালিলিক ছিলো না, ওয়ারিশ সনদের আলোকে মৃত ব্যাক্তির সকল সম্পদ এখন কাগজে কলমে সকল ওয়ারিশদের নামে নির্ধারিত হারে খারিজ হয়ে গেছে। ওয়ারিশ গণ এখন অসিয়ত আদায় করতে হলে, সবাই মিলে ঐ কন্যাকে ৩ শতাংশ দলিল দিতে হবে। তারপর সে তা বিক্রি করে ঋণ দিতে হবে।
ঘুরেফিরে একই জায়গায় বিষয়টি আসছে বিধায় অন্য সব ওয়ারিশ ও ঐ কন্যা সম্মত যে, ওয়ারিশদের মাঝে এখন যেভাবে সম্পদ বন্টিত আছে, তাই, থাক। সকল ওয়ারিশ অসিয়তের ৩ শতক জমির মূল্য অর্থাৎ টাকা ঐ কন্যাকে দিয়ে দিবে।
এখন প্রশ্ন হলোঃ
(এক) অসিয়তের ৩ শতাংশ জমি না হাতে না পেয়ে এভাবে বিক্রি করা বৈধ হবে কিনা?
(দুই) অসিয়তপ্রাপ্ত কন্যা সহ সকল ওয়ারিশ উপরে উল্লিখিত যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা বৈধ হবে কিনা?
(তিন) অসিয়তপ্রাপ্ত কন্যা যেহেতু ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না, সমস্যাটি কিভাবে সমাধা করা যেতে পারে?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রশ্নটি জটিল এবং এর সমাধানের জন্য কয়েকটি ধাপে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। নিম্নে কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো:
১. অসিয়তের ৩ শতাংশ জমি হস্তগত করার আগে বিক্রি করার বিধান
ইসলামি শরী'আতের হানাফী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্থাবর সম্পত্তি (যেমন: জমি বা ঘর) মালিকানা সাব্যস্ত হওয়ার পর তা সশরীরে হস্তগত বা কব্জা (Possession) করার আগেই বিক্রি করা জায়েয ও বৈধ।
- শরয়ী বিশ্লেষণ: আপনার পিতার মৃত্যুর পর এবং সকল ওয়ারিশের সম্মতির মাধ্যমে ঐ ৩ শতাংশ জমির মালিকানা উক্ত কন্যার ওপর অর্পিত হয়েছে। জমি যেহেতু একটি স্থাবর সম্পত্তি, তাই ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে তা সশরীরে হাতে পাওয়ার বা দখল করার আগেই বিক্রি করা যায়। সুতরাং ঋণ পরিশোধের জন্য উক্ত কন্যা তার অসিয়তকৃত জমিটি দখল পাওয়ার আগেই বিক্রি করতে পারবেন।
- কিতাব ও পৃষ্ঠা: দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা ৪৬৯ এবং পৃষ্ঠা ২৪৭।
২. জমির পরিবর্তে টাকা পরিশোধ করার সিদ্ধান্তের শরয়ী বৈধতা
আপনারা সকল ওয়ারিশ মিলে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে— "জমি কন্যাকে দলিল করে না দিয়ে বরং বর্তমান বাজারদরে জমির মূল্য (টাকা) তাকে দিয়ে দেওয়া হবে এবং বর্তমানে যেভাবে বন্টিত আছে সেভাবেই থাকবে"—এই সিদ্ধান্তটি শরী'আতের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বৈধ এবং একে 'তখরিজ' (Takharij) বা 'সুলহ' (Sulh) বলা হয়।
- শরয়ী বিশ্লেষণ: মিরাছ বন্টনের সময় কোনো ওয়ারিশ বা অসিয়তপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি তার প্রাপ্য অংশের পরিবর্তে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করে তার দাবি ছেড়ে দিতে রাজী হয়, তবে তা জায়েয। যেহেতু আপনারা সবাই অসিয়তের বিষয়ে একমত এবং কন্যাও টাকার বিনিময়ে জমি দাবি না করতে সম্মত, তাই আপনাদের এই আপস-মীমাংসা (সুলহ) শরী'আতসম্মত। এর ফলে জমির দালিলিক খারিজ বর্তমানে যেভাবে আছে সেভাবেই থাকতে পারবে এবং কন্যার হকও আদায় হয়ে যাবে।
- কিতাব ও পৃষ্ঠা: সিরাজী ফিল মিরাস (বাংলা অনূদিত), পৃষ্ঠা ১০২-১০৩।
৩. কন্যার ঋণ পরিশোধের সমস্যা সমাধানের শরয়ী পদ্ধতি
কন্যা যেহেতু তার এক ভাইয়ের নিকট থেকে ৭০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন এবং বর্তমানে তা পরিশোধে অক্ষম, তাই বিষয়টি অত্যন্ত সুন্দরভাবে নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে সমাধান করা যেতে পারে:
১. ঋণ সমন্বয় (Debt Set-off): আপনারা সকল ওয়ারিশ মিলে উক্ত ৩ শতাংশ জমির বর্তমান বাজারমূল্য নির্ধারণ করবেন। সেই বাজারমূল্য থেকে কন্যার পাওনা ৭০ হাজার টাকা সরাসরি ঐ ঋণদাতা ভাইকে দিয়ে দিবেন। এতে কন্যার ঋণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিশোধ হয়ে যাবে এবং কন্যার দায়মুক্তি ঘটবে। ২. অবশিষ্ট অর্থ প্রদান: বাজারমূল্য যদি ৭০ হাজার টাকার বেশি হয় (যেমন: জমির দাম যদি ১ লক্ষ টাকা হয়), তবে অবশিষ্ট ৩০ হাজার টাকা উক্ত কন্যাকে বুঝিয়ে দিবেন। ৩. দলিল সংশোধনের প্রয়োজন নেই: এই প্রক্রিয়ায় কোনো নতুন দলিল বা রেজিস্ট্রি ছাড়াই কন্যা তার পাওনা বুঝে পেলেন এবং অন্য ওয়ারিশদের নামে থাকা খারিজ ও বণ্টনও অপরিবর্তিত থাকল।
- কিতাব ও পৃষ্ঠা: সিরাজী ফিল মিরাস, পৃষ্ঠা ১০২-১০৩ এবং দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা ৩৩০ (ঋণ পরিশোধ ও দায়মুক্তি পরিচ্ছেদ)।
চূড়ান্ত পরামর্শ: আপনারা আপস-মীমাংসার মাধ্যমে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, তা শরী'আতের আলোকে অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং সহীহ পদ্ধতি। এতে ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে আত্মীয়তার বন্ধনও রক্ষা পাবে। আপনারা দ্রুত জমির বাজারমূল্য নির্ধারণ করে টাকা বন্টনের মাধ্যমে অসিয়তটি পূর্ণ করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।