জ্বীন-সিহর থেকে মুক্তির পর মা-বাবাকে ক্ষমা করার জন্য কসম ভঙ্গের কাফফারা ও হানাফি ফিকহের নির্দেশনা।

Family Life · Hanafi

Question No: 435
Questioner: Zareen Ibnaat
Question Asked: 20 May 2026, 09:24 PM
Reviewed & Published: 20 May 2026, 09:28 PM
Views: 21
Tokens: 4,741
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ।
আমি প্র‍্যাক্টিসিং মুসলিমাহ, আলহামদুলিল্লাহ। ইসলামের সব নিয়ম-কানুন মেনে চলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। আমি জ্বীন-সিহরের ভিক্টিম ছিলাম। খুব বাজে ভাবে এটার প্রভাব আমার উপর ছিল। আলহামদুলিল্লাহ চার বছর+ যাবত রুকইয়াহ কন্টিনিউ করছি।
আমার মাঝে অল্পতেই রেগে যাওয়ার খুব প্রবণতা ছিল। এখন এটা কমেছে, আলহামদুলিল্লাহ।
আমার 'মা' একটু বেশি চিল্লাফাল্লা করা মানুষ। অল্পতে অভিশাপ দিতেই থাকে, আমাকে ঠিকমতো খাবার দিত না ইত্যাদি ইত্যাদি কারণে আমি খুব বেশি ডিস্টার্বড ছিলাম আর মায়ের উপর। আরো পারিবারিক অনেক কিছু। আমার 'মা' যখনই কারণে অকারণে বকা-ঝকা করত, আমি চুপ থাকতাম আর বার বার মনে মনে আল্লহর সাথে ওয়াদা করতাম, আমার মা'কে আমি এই জন্য ক্ষমা করব না। কত কত বার যে আল্লাহর সাথে ওয়াদা করে বলেছি, "আমি জীবনেও আমার মা'কে ক্ষমা করব না" এটার হিসাব নেই আসলে। ইভেন আরো ২ জনের নিকটও বেশ কয়েকবার আল্লাহর কসম করে বলেছি আমি আমার বাবা-মা'কে ক্ষমা করব না। আমি এটাও আল্লাহর সাথে ওয়াদা করেছি, আমি আমার এই ওয়াদাও ভঙ্গ করব না। আগে তো আমি জ্বীন-সিহরের ভিক্টিম ছিলাম, এসব কিছু (পারিবারিক কলহ) ওই প্রভাবের কারণেই কিনা জানা নেই।

তবে আমি এখন তাদের উভয়জনকেই আল্লাহর জন্য ক্ষমা করে দিতে চাই। আমার বাবা মারা গেছেন। এখন আমার করণীয় কি? ক্ষমা করে দেওয়ার পর কাফফারা কিভাবে দিতে হবে? প্রতিবার কসমের জন্যেই কি আলাদা আলাদাভাবে কাফফারা প্রযোজ্য নাকি কাফফারা একবারই যথেষ্ট?

Answer

উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আলহামদুলিল্লাহ, আপনি জ্বীন-সিহরের প্রভাব থেকে মুক্তি পেয়েছেন এবং রুকইয়াহ চালিয়ে যাচ্ছেন। আপনার মা-বাবাকে আল্লাহর জন্য ক্ষমা করার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এটি আপনার ঈমানের পরিপক্কতা এবং আল্লাহর রহমতের নিদর্শন। এখন আপনার কসম (শপথ) ভঙ্গের কাফফারা এবং করণীয় সম্পর্কে হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত জানানো হলো।

১. কসম ভঙ্গের বিধান

আপনি বারবার মনে মনে এবং দু’জনের সামনে আল্লাহর নামে কসম করে বলেছেন, “আমি আমার বাবা-মাকে ক্ষমা করব না।” এই কসমগুলো শরঈ কসম হিসেবে গণ্য। এখন আপনি তাদের ক্ষমা করে দেওয়ার মাধ্যমে কসম ভঙ্গ করেছেন। প্রতিটি কসম ভঙ্গের জন্য কাফফারা দেওয়া ওয়াজিব।

হানাফি ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী:

  • যদি একই বিষয়ে একাধিক কসম করা হয় (যেমন: বারবার বলা “আমি মাকে ক্ষমা করব না”) এবং সেই কসমগুলো একই কাজ (ক্ষমা করা) দ্বারা ভঙ্গ হয়, তবে একটি কাফফারাই যথেষ্ট। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৭৩০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ২/৫১)
  • তবে যদি কসমগুলো ভিন্ন সময়ে ভিন্ন কারণে করা হয়, অথবা একটি কসম অন্য কসমকে শক্তিশালী করার জন্য করা হয় (যেমন: “আমি এই কসম ভঙ্গ করব না” বলে আলাদা কসম), তবে সেটি পৃথক কসম হিসেবে গণ্য হবে এবং পৃথক কাফফারা দিতে হবে।

আপনার ক্ষেত্রে:

  • আপনি “মাকে ক্ষমা করব না” বলে বারবার কসম করেছেন – এটি একই বিষয়। তাই এসব কসমের জন্য একটি কাফফারা দিলেই চলবে।
  • আপনি আরও বলেছেন, “আমি এই ওয়াদা (ভঙ্গ না করার)ও পালন করব” – এটি যদি আলাদা কসম হয়, তবে সেটির জন্যও পৃথক কাফফারা প্রয়োজন হতে পারে। তবে হানাফি বিশ্লেষণে, যদি দ্বিতীয় কসমটি প্রথম কসমেরই পুনরাবৃত্তি বা শক্তিকরণ হয়, তবে একটিই কাফফারা যথেষ্ট। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪২৬; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪৮০)

২. কাফফারার পদ্ধতি

হানাফি মতে, কসম ভঙ্গের কাফফারা হলো:

  • দশজন মিসকিনকে দু’বেলা পেট ভরে খাওয়ানো (গড়ে মধ্য মানের খাবার), অথবা
  • দশজন মিসকিনকে কাপড় দেওয়া (প্রত্যেককে এক জোড়া কাপড়: যেমন লুঙ্গি-গামছা বা শার্ট-প্যান্ট), অথবা
  • একজন দাস বা দাসী মুক্ত করা (বর্তমানে সম্ভব নয়)।
  • যদি এসব সামর্থ্য না থাকে, তাহলে পরপর তিন দিন রোজা রাখতে হবে। সুবিধাজনক হলে, তিনটি পৃথক দিনে রোজা রাখাও জায়েজ, তবে পরপর রাখাই উত্তম। (সূরা মায়েদা: ৮৯; আল-হিদায়া, ২/৩৪৪; বেহেশতি জেওর, ২/২৩)

আপনার করণীয়:

  • আপনি যেহেতু একাধিক কসম করেছেন, তাই ইহতিয়াত (সতর্কতা) হিসেবে দুটি কাফফারা দেওয়া উত্তম: একটি “মা-বাবাকে ক্ষমা না করার” কসমের জন্য, অপরটি “এই কসম ভঙ্গ না করার” কসমের জন্য। তবে যদি আপনি একটি কাফফারা দেন এবং আল্লাহর কাছে তওবা করেন, তাতেও ইনশাআল্লাহ যথেষ্ট হবে।
  • কাফফারা দেওয়ার সময় নিম্নমানের নয় বরং মধ্যম মানের খাবার বা কাপড় দেওয়া উত্তম। খাবার দিলে তা দু’বেলা দিতে হবে অথবা একসঙ্গে ১০ জনকে পেট ভরে খাওয়াতে হবে।
  • যদি আপনি নিজে দরিদ্র হন, তাহলে তিন দিন রোজা রাখবেন।

৩. অতিরিক্ত করণীয়

  • ক্ষমার ঘোষণা: আপনার বাবা মারা গেছেন, তাই তার জন্য দোয়া করুন এবং মাকে সরাসরি ক্ষমা করে দেওয়ার কথা জানিয়ে দিন (প্রয়োজনে মৌখিকভাবে বা চিঠির মাধ্যমে)।
  • তওবা ও ইস্তিগফার: আল্লাহর কাছে বারবার তওবা করুন এবং কসম ভঙ্গের গুনাহ মাফ চান। নিশ্চিত থাকুন, আল্লাহ তাআলা তওবা কবুল করেন।
  • পিতার জন্য দোয়া: যেহেতু বাবা জীবিত নেই, তাই তার জন্য মাগফিরাতের দোয়া করুন এবং সদকা করুন।
  • জ্বীন-সিহরের প্রভাব: আপনার পূর্বের অবস্থা কসম করার সময় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আপনি যদি মনে করেন, কসমগুলো সম্পূর্ণ সুস্থ মস্তিষ্কে করেননি (যেমন জ্বীন আক্রান্ত অবস্থায়), তবে সেগুলো হয়তো বৈধ না-ও হতে পারে। কিন্তু সতর্কতা হিসেবে কাফফারা দেওয়াই উত্তম। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ২/৪৭)

৪. মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব

ইসলামে মা-বাবার আনুগত্য এবং তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার ফরজ। আপনার মা যদি চিৎকার-চেঁচামেচি করেন, তারপরও আপনাকে ধৈর্য ধরে তাঁর সেবা করতে হবে। এখন আপনি ক্ষমা করে দেওয়ায় আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবেন। তবে মনে রাখবেন, কোনো অবস্থাতেই মাকে অভিশাপ দেওয়া বা তার অবাধ্য হওয়া জায়েজ নয়। (সূরা বনি ইসরাইল: ২৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৭)

সারসংক্ষেপ

  • একাধিক কসম ভঙ্গের জন্য ইহতিয়াত অনুসারে দুটি কাফফারা দিন, অথবা একটি কাফফারা দিয়ে তওবা করুন।
  • কাফফারার পদ্ধতি: ১০ জন মিসকিনকে খাওয়ান বা কাপড় দিন; অসমর্থ হলে ৩ দিন রোজা।
  • মা-বাবাকে ক্ষমা করে দেওয়ায় আপনার কোনো পাপ নেই, বরং এটি সওয়াবের কাজ।
  • ভবিষ্যতে কসম করার সময় সতর্ক থাকুন, এবং রাগ বা আবেগের বশে কসম না করার অভ্যাস করুন।

আল্লাহ তাআলা আপনার তওবা কবুল করুন এবং আপনাকে ধৈর্য ও শক্তি দিন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.