অন্যর সওয়াব নেওয়া
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রিয় বোন, আপনার দীর্ঘ প্রশ্নটি মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। আপনার স্বামীর আচরণ এবং আপনার মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে সত্যিই দুঃখিত। আল্লাহর রহমতে আপনি IOM-এর ছাত্রী এবং দ্বীনি ইলম অর্জন করছেন—এটি একটি বড় নেয়ামত। আসুন, আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে দিচ্ছি।
১. স্বামীর খারাপ আচরণ ও নৈতিক অবক্ষয় সম্পর্কে ইসলামি নির্দেশনা
আপনার স্বামীর আচরণ (অন্যের সাথে প্রেম, চাচাতো বোনের সাথে আসক্তি, মিথ্যা বলা, জিনিসপত্র ভাঙা, শরীরে আঘাত করা) সম্পূর্ণরূপে ইসলামবিরোধী ও গুনাহের কাজ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম আচরণ করে।" (তিরমিজি, হাদিস: ১১৬২)
আরেকটি হাদিসে এসেছে:
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের উপর ঈমান রাখে, সে যেন প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।" (বুখারি, হাদিস: ৬০১৮)
মহিলাদের সাথে প্রেম করা, বেগানা নারীর দিকে তাকানো, তাদের সাথে কথা বলা—সবই হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমরা জিনার কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং নিকৃষ্ট পথ।" (সূরা বনী ইসরাইল: ৩২)
২. আপনার স্বামীর শপথের বিধান
আপনি তাকে বলেছেন: "যদি তুমি আবার এরকম করো, তাহলে তোমার সমস্ত সওয়াব আমি নিয়ে নেব, আর তোমার গুনাহ আমার উপর চাপিয়ে দেবে।" — এটি একটি শর্তসাপেক্ষ শপথ (শর্তযুক্ত কসম)।
এই শপথের শরয়ি বিধান:
প্রথমত: ইসলামি দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তি তার নেক আমলের সওয়াব অন্যকে দিতে পারে (ইসালে সওয়াব), কিন্তু গুনাহ অন্য কারো উপর চাপানো বা সওয়াব কেড়ে নেওয়া—এমনটি ইসলামে নেই। এটি একটি কুসংস্কার বা ভুল ধারণা।
দ্বিতীয়ত: এই ধরনের শপথ করা উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর নামে শপথ করে, সে শিরক করেছে।" (আবু দাউদ, হাদিস: ৩২৫১)
তবে আপনার শপথটি আল্লাহর নামে হয়েছে, তাই এটি একটি শপথ হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু শর্ত পূরণ হলে (অর্থাৎ স্বামী আবার খারাপ কাজ করলে) তার উপর কাফফারায়ে ইয়ামিন (শপথ ভঙ্গের কাফফারা) ওয়াজিব হবে।
কাফফারায়ে ইয়ামিন কী?
- ১০ জন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো, অথবা
- ১০ জন মিসকিনকে কাপড় দেওয়া, অথবা
- একজন গোলাম/দাস মুক্ত করা
- আর যদি সামর্থ্য না থাকে, তাহলে ৩ দিন রোজা রাখা। (সূরা মায়িদা: ৮৯)
তবে আপনার এই শপথের মাধ্যমে স্বামীর সওয়াব আপনার কাছে চলে আসবে না, আর তার গুনাহ আপনার উপর বর্তাবে না। এটি ইসলামি আকিদা অনুযায়ী সঠিক নয়।
৩. আপনার ঈমান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা
আপনি বলেছেন যে এই শপথের কারণে আপনার ঈমান দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল এবং গুনাহর দিকে ঝুঁকে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
আপনার এই অনুভূতি স্বাভাবিক, কিন্তু জেনে রাখুন:
- আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আল্লাহ কারো উপর এমন বোঝা চাপান না যা সে বহন করতে পারে না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)
-
আপনি যদি এই শপথের কারণে মনে মনে বিশ্বাস করেন যে স্বামীর গুনাহ আপনার উপর আসবে, তাহলে এটি ভুল আকিদা। এই ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসুন। আল্লাহর রহমত অপরিসীম।
-
তওবা করুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"প্রত্যেক আদম সন্তান গুনাহগার, আর গুনাহগারদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো তওবাকারীরা।" (তিরমিজি, হাদিস: ২৪৯৯)
৪. স্বামীর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে করণীয়
ক. ধৈর্য ধারণ করুন
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা বাকারা: ১৫৩)
খ. স্বামীকে নসীহত করুন
তাকে দ্বীনের পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করুন। কুরআন ও হাদিসের আলোকে তাকে বুঝান। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।" (বুখারি, হাদিস: ৮৯৩)
গ. পরিবার ও গার্জিয়ানদের সাহায্য নিন
আপনি ইতিমধ্যে গার্জিয়ানদের মাধ্যমে মীমাংসা করেছেন। প্রয়োজনে আবারও তাদের সহায়তা নিন।
ঘ. তালাক/ডিভোর্সের বিধান
ইসলামে তালাক অপছন্দনীয় কিন্তু জায়েজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"আল্লাহর নিকট বৈধ কাজগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা ঘৃণিত হলো তালাক।" (আবু দাউদ, হাদিস: ২১৭৮)
তবে তালাক দেওয়া বা নেওয়ার আগে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করুন:
- সন্তানদের ভবিষ্যৎ
- স্বামীর আচরণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা
- পারিবারিক কল্যাণ
ঙ. আত্মহত্যা সম্পূর্ণ হারাম
আপনি বলেছেন আত্মহত্যা করবেন না—এটি সঠিক সিদ্ধান্ত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি নিজেকে হত্যা করল, সে জাহান্নামের আগুনে আত্মহত্যা করবে।" (বুখারি, হাদিস: ৫৭৭৮)
৫. আপনার করণীয় সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরামর্শ
১. সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য নিন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।" (সূরা বাকারা: ১৫৩)
২. আল্লাহর কাছে দুআ করুন। স্বামীর হেদায়াতের জন্য দুআ করুন।
৩. স্বামীর সাথে কথা বলুন। তাকে জানান যে তার আচরণ আপনার ও সন্তানদের উপর কতটা প্রভাব ফেলছে।
৪. পারিবারিক সালিশের ব্যবস্থা করুন। প্রয়োজনে উভয় পরিবারের প্রবীণদের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুন।
৫. যদি স্বামী সত্যিই পরিবর্তিত না হয় এবং আপনার জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, তাহলে ইসলামি পদ্ধতিতে তালাক বা খুলা নেওয়ার কথা ভাবতে পারেন। তবে এটি শেষ বিকল্প হওয়া উচিত।
৬. আপনার শপথের কাফফারা
যেহেতু আপনি এই শপথ করেছেন এবং স্বামী আবারও খারাপ কাজ করেছে (চাচাতো বোনের সাথে আসক্তি), তাই এই শপথ ভঙ্গ হয়েছে। এখন আপনাকে কাফফারায়ে ইয়ামিন দিতে হবে:
- ১০ জন মিসকিনকে দুই বেলা পেট ভরে খাওয়ানো, অথবা
- ১০ জন মিসকিনকে কাপড় দেওয়া, অথবা
- ১ জন গোলাম/দাস মুক্ত করা
- সামর্থ্য না থাকলে ৩ দিন রোজা রাখা
তবে মনে রাখবেন: এই কাফফারা দেওয়ার পর আপনার উপর আর কোনো গুনাহ থাকবে না ইনশাআল্লাহ। আর স্বামীর সওয়াব আপনার কাছে আসবে না—এটি ভুল ধারণা।
৭. সন্তানদের ভবিষ্যৎ
আপনার সন্তানদের কথা চিন্তা করে আপনি терпение করছেন—এটি প্রশংসনীয়। সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা দিন এবং তাদের জন্য দুআ করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আমার রব! আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন।" (সূরা সাফফাত: ১০০)
উপসংহার
প্রিয় বোন, আপনার সমস্যা জটিল, তবে আল্লাহর রহমত অপরিসীম। আপনি দ্বীনি ইলম অর্জন করছেন—এটি আপনার জন্য বড় সৌভাগ্য। ধৈর্য ধারণ করুন, আল্লাহর উপর ভরসা করুন এবং স্বামীর হেদায়াতের জন্য দুআ করতে থাকুন।
মনে রাখবেন: আল্লাহ তাআলা বলেন:
"নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে।" (সূরা ইনশিরাহ: ৫-৬)
আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও সাহস দান করুন এবং আপনার সমস্যার সমাধান করুন। আমিন।
দলিলসমূহ:
- সূরা বনী ইসরাইল: ৩২
- সূরা বাকারা: ১৫৩, ২৮৬
- সূরা মায়িদা: ৮৯
- সূরা ইনশিরাহ: ৫-৬
- বুখারি: ৮৯৩, ৫৭৭৮, ৬০১৮
- তিরমিজি: ১১৬২, ২৪৯৯
- আবু দাউদ: ২১৭৮, ৩২৫১
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): কিতাবুল ঈমান ও তালাক সম্পর্কিত অধ্যায়
- ফাতাওয়া উসমানি: শপথ ও কাফফারা সম্পর্কিত অধ্যায়