বনু কুরাইজার ক্ষেত্রে প্রত্যেক নিহত পুরুষের ব্যক্তিগত অপরাধ প্রমাণিত না হলেও মৃত্যুদণ্ড কীভাবে ইসলামী ন্যায়নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 4193
Questioner: Md. Nuhan Tahery
Question Asked: 20 Aug 2026, 01:12 AM
Reviewed & Published: 20 Aug 2026, 04:37 AM
Views: 9
Tokens: 16,773
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার কয়েকটি আন্তরিক সংশয় আছে। আমি ইসলামবিরোধী যুক্তি খুঁজছি না; বরং কুরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহের আলোকে বিষয়টি বুঝতে চাই।

বনু কুরাইজার ঘটনায় বলা হয়, সা‘দ ইবনে মু‘আয (রা.) রায় দিয়েছিলেন যে তাদের যোদ্ধাদের হত্যা করা হবে এবং নারী ও শিশুদের বন্দি করা হবে। সহিহ বুখারির বর্ণনাতেও যোদ্ধাদের হত্যার কথা পাওয়া যায়।

আমার প্রশ্নগুলো হলো:

১. বনু কুরাইজার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ যদি চুক্তিভঙ্গ ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষকে সহযোগিতা করা হয়ে থাকে, তাহলে কি প্রত্যেক নিহত পুরুষ ব্যক্তিগতভাবে সেই চুক্তিভঙ্গ বা বিশ্বাসঘাতকতায় অংশ নিয়েছিল?

২. যদি প্রত্যেকের ব্যক্তিগত অপরাধ প্রমাণিত না হয়ে থাকে, তাহলে শুধু একই গোত্রের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বা যোদ্ধা হওয়ার ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার শরিয়তসম্মত ভিত্তি কী?

৩. ইসলামে তো কুরআন বলে:
'কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না' (৬:১৬৪, ১৭:১৫, ৩৫:১৮)।
তাহলে একজন ব্যক্তির অপরাধের দায় অন্য ব্যক্তির ওপর না দেওয়ার এই নীতির সঙ্গে বনু কুরাইজার রায় কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

৪. 'যোদ্ধা' বলতে কি শুধু যুদ্ধের সময় বাস্তবে অস্ত্র হাতে নিয়ে যুদ্ধ করেছে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছিল, নাকি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ/যুদ্ধক্ষম পুরুষ হওয়াই যথেষ্ট ছিল?

৫. যদি কোনো ব্যক্তি বনু কুরাইজার সদস্য হলেও চুক্তিভঙ্গের সিদ্ধান্তে অংশ না নিয়ে থাকে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও না করে থাকে, তার মৃত্যুদণ্ড কি বৈধ ছিল?

৬. বনু কুরাইজার যেসব পুরুষকে হত্যা করা হয়েছিল, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কি আলাদা করে তদন্ত বা সাক্ষ্য-প্রমাণ নেওয়া হয়েছিল? প্রাথমিক হাদিস ও সীরাহ গ্রন্থে এর কোনো বিস্তারিত রেকর্ড আছে কি?

৭. যদি ব্যক্তিগত অপরাধ প্রমাণের প্রয়োজন না থাকে, তাহলে শরিয়তের কোন নীতির অধীনে একটি গোত্রের যোদ্ধা সদস্যদের ওপর সামষ্টিকভাবে মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগ বৈধ হয়?

৮. নারী ও শিশুদের বন্দি করা হয়েছিল। তাদের ব্যক্তিগত অপরাধ কী ছিল? তারা কি গোষ্ঠীর দায়ের কারণে বন্দি হয়েছিল, নাকি সে সময়ের যুদ্ধবন্দি সংক্রান্ত আলাদা শরিয়তি বিধান ছিল?

৯. কুরআনের ব্যক্তিগত দায়ের নীতি এবং যুদ্ধের সময় enemy combatant-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নীতির মধ্যে শরিয়ত কীভাবে পার্থক্য করে?

১০. বনু কুরাইজার ঘটনায় এমন কোনো নির্ভরযোগ্য উদাহরণ আছে কি যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে তার ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাসঘাতকতা বা যুদ্ধে অংশ না নেওয়ার কারণে ক্ষমা করা হয়েছিল? থাকলে তার নাম, সূত্র এবং কেন তাকে ক্ষমা করা হয়েছিল তা উল্লেখ করুন।

১১. 'বনু কুরাইজা চুক্তিভঙ্গ করেছিল' এবং 'বনু কুরাইজার প্রত্যেক যোদ্ধা ব্যক্তিগতভাবে চুক্তিভঙ্গ করেছিল'—এই দুটি বক্তব্য কি শরিয়তের দৃষ্টিতে একই বিষয়?

১২. আধুনিক individual criminal responsibility-এর ধারণার সঙ্গে এই ঘটনার পার্থক্য কী? একজন ব্যক্তি শুধু কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য হলেই কি তার ব্যক্তিগত অপরাধ প্রমাণ ছাড়াই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ইসলামী আইনে বৈধ হতে পারে?

দয়া করে উত্তর দেওয়ার সময়:

• কুরআনের আয়াত দিন
• সহিহ বুখারি/মুসলিমের মূল হাদিস দিন
• হাদিসের আরবি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ, বিশেষ করে 'আল-মুকাতিলা' বা যোদ্ধা বলতে কী বোঝানো হয়েছে তা ব্যাখ্যা করুন
• আবু দাউদে আতিয়্যাহ আল-কুরাজির হাদিসটি ব্যাখ্যা করুন
• ইবনে ইসহাক/ইবনে হিশাম এবং অন্যান্য সীরাহর বর্ণনা আলাদা করে দেখান
• কোন তথ্য সহিহ হাদিস, কোনটি সীরাহ এবং কোনটি পরবর্তী ফিকহি ব্যাখ্যা তা স্পষ্ট করুন
• যেখানে ঐতিহাসিক মতভেদ আছে, সেটা উল্লেখ করুন
• শুধু 'নবী (সা.) করেছেন তাই বৈধ' এই উত্তর না দিয়ে শরিয়তের নীতিগত ব্যাখ্যা দিন
• আমার প্রশ্নের মূল বিষয়, অর্থাৎ ব্যক্তিগত অপরাধ প্রমাণ ছাড়া একটি গোষ্ঠীর যোদ্ধাদের মৃত্যুদণ্ড কীভাবে 'একজনের দায় অন্যজন নেবে না' নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটার সরাসরি উত্তর দিন।

শেষে খুব পরিষ্কারভাবে বলুন:

ক) প্রত্যেক নিহত ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিশ্বাসঘাতকতা প্রমাণিত ছিল কি না

খ) মৃত্যুদণ্ডের প্রকৃত শরিয়তি criterion কী ছিল

গ) এটি individual punishment নাকি combatant/group status-এর ভিত্তিতে যুদ্ধকালীন শাস্তি

ঘ) নারী ও শিশুদের বন্দিত্বের শরিয়তি ভিত্তি কী

ঙ) এই ঘটনায় 'collective responsibility' শব্দটি ব্যবহার করা ইসলামী ফিকহের দৃষ্টিতে সঠিক কি না

Answer

বনু কুরাইজার ঘটনা: ব্যক্তিগত অপরাধ বনাম যুদ্ধকালীন শাস্তি — একটি বিস্তারিত ফিকহি বিশ্লেষণ

ভূমিকা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং চিন্তা-উদ্দীপক। আপনি ইসলামবিরোধী যুক্তি খুঁজছেন না, বরং কুরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহের আলোকে বিষয়টি বুঝতে চান — এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আমি চেষ্টা করব প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর কুরআন, সহিহ হাদিস, সীরাহ গ্রন্থ এবং হানাফি ফিকহের আলোকে পরিষ্কারভাবে দিতে।


১. বনু কুরাইজার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ এবং ব্যক্তিগত অংশগ্রহণ

বনু কুরাইজার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল চুক্তিভঙ্গ (নকদুল-আহদ) এবং শত্রুপক্ষকে সহযোগিতা। এই অভিযোগটি গোত্রীয় পর্যায়ে প্রমাণিত হয়েছিল।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:

মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন গোত্রের সাথে চুক্তি করেছিলেন। বনু কুরাইজার সাথেও একটি চুক্তি হয়েছিল যে, তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে শত্রুদের সাহায্য করবে না এবং মদিনার প্রতিরক্ষায় অংশ নেবে। কিন্তু আহযাব (খন্দক) যুদ্ধের সময় বনু কুরাইজা এই চুক্তি ভঙ্গ করে কুরাইশ ও তাদের মিত্রদের সাথে গোপন চুক্তি করে। তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষকে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দেয়।

ইবনে ইসহাকের সীরাহতে বর্ণিত আছে:

"বনু কুরাইজা চুক্তিভঙ্গ করল এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিরুদ্ধে কুরাইশ ও গাতফানের সাথে মৈত্রী স্থাপন করল।" (ইবনে হিশাম, সীরাহ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২২৫)

সহিহ বুখারির হাদিস:

সহিহ বুখারিতে বনু কুরাইজার ঘটনা সম্পর্কে দীর্ঘ হাদিস রয়েছে। উরওয়া ইবনে যুবায়র (রা.) থেকে বর্ণিত:

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: لَمَّا رَجَعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الْخَنْدَقِ وَوَضَعَ السِّلَاحَ فَاغْتَسَلَ، فَأَتَاهُ جِبْرِيلُ وَقَدْ عَصَبَ رَأْسَهُ الْغُبَارُ فَقَالَ: قَدْ وَضَعْتَ السِّلَاحَ وَاللَّهِ مَا وَضَعْنَاهُ، اخْرُجْ إِلَيْهِمْ. قَالَ: إِلَى مَنْ؟ قَالَ: إِلَى بَنِي قُرَيْظَةَ. فَأَتَاهُمْ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَنَزَلُوا عَلَى حُكْمِهِ، فَرَدَّ الْحُكْمَ إِلَى سَعْدٍ، قَالُوا: إِنَّا نَرْضَى بِحُكْمِ سَعْدِ بْنِ مُعَاذٍ، فَبَعَثَ إِلَى سَعْدٍ فَأَتَى، فَقَالَ: اشْهَدُوا أَنِّي قَضَيْتُ فِيهِمْ أَنْ تُقْتَلَ الْمُقَاتِلَةُ وَتُسْبَى الذُّرِّيَّةُ وَالنِّسَاءُ وَتُقْسَمَ أَمْوَالُهُمْ

"আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী (সা.) যখন খন্দক থেকে ফিরলেন এবং অস্ত্র রেখে গোসল করলেন, তখন জিবরাঈল (আ.) তাঁর কাছে এলেন — তাঁর মাথায় ধুলো বাঁধা ছিল — এবং বললেন: আপনি অস্ত্র রেখে দিয়েছেন? আল্লাহর কসম, আমরা অস্ত্র রাখিনি। তাদের দিকে বের হোন। তিনি বললেন: কার দিকে? তিনি বললেন: বনু কুরাইজার দিকে। নবী (সা.) তাদের কাছে গেলেন, তখন তারা তাঁর আদেশের কাছে আত্মসমর্পণ করল। তিনি আদেশ সা'দ ইবনে মু'আযের কাছে ফিরিয়ে দিলেন। তারা বলল: আমরা সা'দ ইবনে মু'আযের আদেশে সন্তুষ্ট। তখন তিনি সা'দের কাছে লোক পাঠালেন। সা'দ এলেন এবং বললেন: তোমরা সাক্ষী থাক যে, আমি তাদের সম্পর্কে এই আদেশ দিচ্ছি — যোদ্ধাদের (মুকাতিলা) হত্যা করা হবে, সন্তান-সন্ততি ও নারীদের বন্দি করা হবে এবং তাদের সম্পদ বণ্টন করা হবে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৪১২১)

এখন আপনার প্রশ্ন: প্রত্যেক নিহত পুরুষ কি ব্যক্তিগতভাবে চুক্তিভঙ্গে অংশ নিয়েছিল?

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসলামী যুদ্ধবিধিতে যুদ্ধরত গোত্র বা সম্প্রদায়ের সামগ্রিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যখন একটি গোত্র বা সম্প্রদায় যুদ্ধ ঘোষণা করে বা চুক্তি ভঙ্গ করে, তখন সেই গোত্রের যুদ্ধক্ষম (মুকাতিলা) সদস্যরা সামগ্রিকভাবে শত্রুপক্ষ হিসেবে গণ্য হয়। প্রত্যেক ব্যক্তির আলাদা আলাদা অপরাধ প্রমাণের প্রয়োজন হয় না, কারণ:

১. যুদ্ধ ঘোষণা একটি সামষ্টিক সিদ্ধান্ত — যখন একটি গোত্র যুদ্ধ ঘোষণা করে, তখন সেই গোত্রের প্রতিটি যুদ্ধক্ষম সদস্য সম্ভাব্য যোদ্ধা। ২. যুদ্ধে অংশগ্রহণ প্রমাণ করা কঠিন — যুদ্ধের সময় কে অস্ত্র হাতে নিয়েছে তা প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব। ৩. যুদ্ধকালীন শাস্তি — এটি অপরাধমূলক বিচার নয়, বরং যুদ্ধকালীন কৌশলগত সিদ্ধান্ত।

তবে, যারা স্পষ্টতই যুদ্ধে অংশ নেয়নি বা চুক্তিভঙ্গের বিরোধিতা করেছিল, তাদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিল। নিম্নে তা আলোচনা করা হবে।


২. শুধু গোত্রের সদস্য হওয়ার ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ডের শরিয়তসম্মত ভিত্তি

মৃত্যুদণ্ডের প্রকৃত criterion ছিল 'মুকাতিলা' (যোদ্ধা) হওয়া, শুধু গোত্রের সদস্য হওয়া নয়। সা'দ ইবনে মু'আয (রা.)-এর রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:

أَنْ تُقْتَلَ الْمُقَاتِلَةُ وَتُسْبَى الذُّرِّيَّةُ وَالنِّسَاءُ

"যোদ্ধাদের (মুকাতিলা) হত্যা করা হবে এবং সন্তান-সন্ততি ও নারীদের বন্দি করা হবে।"

'মুকাতিলা' শব্দের অর্থ:

আরবি ভাষায় 'মুকাতিলা' (المقاتلة) শব্দটি 'কিতাল' (قتال) থেকে এসেছে, যার অর্থ যুদ্ধ করা। মুকাতিলা বলতে সেই সকল ব্যক্তিকে বোঝানো হয় যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম — অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্ক, শারীরিকভাবে সক্ষম পুরুষ। এটি শুধু "যে বাস্তবে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে" এমন ব্যক্তিকে বোঝায় না, বরং যুদ্ধক্ষম ব্যক্তিদের বোঝায়।

হানাফি ফিকহের ব্যাখ্যা:

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং অন্যান্য ফকিহগণ বলেছেন:

المقاتلة هم الرجال البالغون القادرون على القتال

"মুকাতিলা হলো সেই সকল প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ যারা যুদ্ধ করতে সক্ষম।"

(আল-মাবসুত, সারাখসী, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ২৩)

কেন শুধু গোত্রের সদস্য হওয়াই যথেষ্ট ছিল?

যুদ্ধের সময় যখন একটি গোত্র যুদ্ধ ঘোষণা করে, তখন সেই গোত্রের প্রতিটি যুদ্ধক্ষম পুরুষকে সম্ভাব্য যোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ:

১. যুদ্ধে অংশগ্রহণ লুকানো সম্ভব — একজন ব্যক্তি যুদ্ধে অংশ নিয়ে থাকতে পারে কিন্তু তা প্রমাণ করা কঠিন। ২. যুদ্ধক্ষম ব্যক্তিরা সবাই হুমকি — যুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষের যুদ্ধক্ষম প্রতিটি পুরুষই মুসলিমদের জন্য হুমকি। ৩. যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা — শত্রুপক্ষের যুদ্ধক্ষম পুরুষদের জীবিত রাখা ভবিষ্যতে আবার যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করে।

তবে, যারা স্পষ্টতই যুদ্ধে অংশ নেয়নি বা চুক্তিভঙ্গের বিরোধিতা করেছিল, তাদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিল। নিম্নে তা আলোচনা করা হবে।


৩. 'কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না' নীতির সাথে সামঞ্জস্য

আপনি কুরআনের আয়াত উল্লেখ করেছেন:

وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ

"কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।" (সূরা আনআম: ১৬৪, সূরা বনী ইসরাইল: ১৫, সূরা ফাতির: ১৮)

এই আয়াতের প্রকৃত অর্থ:

এই আয়াতটি আখিরাতের বিচার এবং পাপের দায় সম্পর্কে। অর্থাৎ, কিয়ামতের দিন কেউ অন্যের পাপের দায় বহন করবে না। প্রত্যেকে নিজের আমলের জন্য দায়ী হবে। এটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব সম্পর্কিত।

কিন্তু যুদ্ধকালীন শাস্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নীতি ভিন্ন:

যুদ্ধকালীন শাস্তি অপরাধমূলক শাস্তি (হুদুদ/তাযীর) নয়, বরং যুদ্ধবিধি (আহকামুল হারব)। যুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষের যুদ্ধক্ষম সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় তাদের সম্ভাব্য হুমকি দূর করার জন্য, তাদের ব্যক্তিগত অপরাধ প্রমাণের জন্য নয়।

উদাহরণ: যদি একটি দেশ আগ্রাসন চালায়, তখন সেই দেশের সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে হত্যা করা বৈধ — যদিও প্রত্যেক সেনা সদস্য ব্যক্তিগতভাবে আগ্রাসনের সিদ্ধান্ত নেয়নি। কারণ, তারা যুদ্ধরত বাহিনীর সদস্য হিসেবে শত্রুপক্ষ।

ইমাম সারাখসী (রহ.) বলেছেন:

إنما أبيح قتل المقاتلة لأنهم أهل الحرب، وهم الذين يقاتلوننا أو يظاهرون علينا

"যোদ্ধাদের হত্যা বৈধ করা হয়েছে কারণ তারা যুদ্ধরত পক্ষের অন্তর্ভুক্ত — তারা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বা শত্রুদের সাহায্য করে।" (আল-মাবসুত, খণ্ড ১০, পৃষ্ঠা ৫)

তাহলে 'একজনের দায় অন্যজন নেবে না' নীতির সাথে কীভাবে সামঞ্জস্য?

এখানে মূল বিষয় হলো, বনু কুরাইজার যোদ্ধাদের হত্যা করা হয়েছিল তাদের ব্যক্তিগত অপরাধের শাস্তি হিসেবে নয়, বরং যুদ্ধরত শত্রুপক্ষের সদস্য হিসেবে। যখন একটি গোত্র যুদ্ধ ঘোষণা করে, তখন সেই গোত্রের যুদ্ধক্ষম সদস্যরা সম্মিলিতভাবে শত্রুপক্ষ হয়ে যায়। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ব্যক্তিগত অপরাধের শাস্তি নয়, বরং যুদ্ধবিধির অংশ

তবে, যারা স্পষ্টতই যুদ্ধে অংশ নেয়নি, তাদের ক্ষেত্রে ইসলামী আইনে ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে। নিম্নে তা আলোচনা করা হবে।


৪. 'যোদ্ধা' (মুকাতিলা) বলতে কী বোঝানো হয়েছে

'মুকাতিলা' শব্দের আভিধানিক অর্থ:

'মুকাতিলা' (المقاتلة) শব্দটি 'কিতাল' (قتال) মূল থেকে এসেছে, যার অর্থ যুদ্ধ করা। এটি এমন ব্যক্তিদের বোঝায় যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বা অংশগ্রহণ করতে সক্ষম

হাদিসে 'মুকাতিলা' শব্দের ব্যবহার:

সহিহ বুখারির হাদিসে সা'দ ইবনে মু'আয (রা.) বলেছেন:

أَنْ تُقْتَلَ الْمُقَاتِلَةُ

"যোদ্ধাদের হত্যা করা হবে।"

এখানে 'মুকাতিলা' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

ফিকহের পরিভাষায় 'মুকাতিলা' বলতে বোঝানো হয় যুদ্ধক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ — যারা যুদ্ধ করতে সক্ষম। এটি শুধু "যে বাস্তবে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে" এমন ব্যক্তিকে বোঝায় না, বরং যুদ্ধে অংশগ্রহণের সক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের বোঝায়।

ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) ফাতহুল বারীতে বলেছেন:

المقاتلة هم الرجال الذين يبلغون سن القتال

"মুকাতিলা হলো সেই সকল পুরুষ যারা যুদ্ধের বয়সে পৌঁছেছে।" (ফাতহুল বারী, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৪১২)

তবে, এটি কি শুধু বয়সের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতো?

না, শুধু বয়স নয়, শারীরিক সক্ষমতা এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হতো। যারা স্পষ্টতই যুদ্ধে অক্ষম — যেমন বৃদ্ধ, অসুস্থ, অন্ধ — তারা 'মুকাতিলা' এর অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

ইবনে হিশামের সীরাহতে বর্ণিত আছে:

فَأَمَرَ بِهِمْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكَانُوا يُخْرَجُونَ إِلَى الْمَدِينَةِ فَيُضْرَبُ فِيهَا أَعْنَاقُهُمْ، وَكَانَ فِيهِمْ حُيَيُّ بْنُ أَخْطَبَ وَكَعْبُ بْنُ أَسَدٍ وَهُمْ سِتُّمِائَةٍ أَوْ سَبْعُمِائَةٍ

"রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের সম্পর্কে আদেশ দিলেন, তাদের মদিনায় আনা হলো এবং সেখানে তাদের ঘাড়ে আঘাত করা হলো। তাদের মধ্যে হুয়াই ইবনে আখতাব এবং কা'ব ইবনে আসাদ ছিলেন। তারা ছিল ছয়শত বা সাতশত।" (ইবনে হিশাম, সীরাহ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৪০)

তবে, সবাইকে হত্যা করা হয়নি। যারা যুদ্ধে অংশ নেয়নি বা চুক্তিভঙ্গের বিরোধিতা করেছিল, তাদের ক্ষমা করা হয়েছিল। ন


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.